জাতিসংঘে ইমরান খানের ভাষণ

জাতিসংঘে ইমরান খানের ভাষণ

জাতিসংঘে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ভাষণের চুম্বক অংশটি উপস্থাপন করা হল-

১। রাসূল সা. আমাদের হৃদয়ে সমাসীন। যখন তাকে অবমাননা করা হয়, তখন আমাদের হৃদয়ে আঘাত লাগে। আর প্রত্যেক ব্যক্তিই জানেন হৃদয়ের আঘাত খুবই ভয়ানক। তাই যখন রাসূল সা.-কে অবমাননা করা হয় তখন মুসলিমরা প্রতিক্রিয়া দেখায়, কিন্তু পশ্চিমারা এটা বুঝতে পারে না।

২। অনেক নেতা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কথা বলেছেন, কিন্তু আমি তাদের মধ্যে সিরিয়াসনেসের অভাব অনুভব করেছি। আমাদের অনেক আইডিয়া আছে। কিন্তু বলা হয়ে থাকে, অর্থায়ন ছাড়া আইডিয়া কেবলি হেলুসিনেশন (অবাস্তব কল্পনা)।

৩। আমার আশাবাদের উৎপত্তি হলো আল্লাহ তায়ালা মানুষকে কল্যাণের অপরিমেয় ক্ষমতা দান করেছেন। আমরা মানুষরা যেকোনো কিছু করতে পারি।

৪। মি.প্রেসিডেন্ট, প্রত্যেক বছর বিলিয়ন বিলিয়ন টাকা দরিদ্র দেশগুলো থেকে ধনী দেশগুলোতে প্রাচার হয়ে যাচ্ছে। মি. প্রেসিডেন্ট, উন্নয়নশীল দেশসমূহের জন্য এটা ধ্বংসাত্মক। এর ফলে দারিদ্র বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মৃত্যু ঘটছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলো দিন দিন দরিদ্র হচ্ছে আর ধনী দেশসমূহ ক্রমে ধনী হচ্ছে। ধনী এবং দরিদ্র দেশসমূহের মাঝে ব্যবধান বৃদ্ধি পাচ্ছে।

৫। ক্ষমতাশীল এলিটদের বিদেশী ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অর্থ প্রাচার করতে সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। আমি বুঝতে পারি না, কেন ট্যাক্স হেভেন অনুমোদিত। (ট্যাক্স হেভেন হলো এমন দেশে যারা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের খুবই কম ট্যাক্সে বিনিয়োগের সুযোগ প্রদান করে)। মি. প্রেসিডেন্ট, কেন এই ট্যাক্স হেভেন? কেন এটা অনুমোদিত? কেন ধনীরা ট্যাক্স দিতে হবে না?আজ হোক বা কাল হোক, পরিবর্তনশীল বিশ্বে এটা বড় সংকট তৈরি করবে। দরিদ্ররা আরও দরিদ্র হচ্ছে আর ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে।৬। বর্তমান বিশ্বে ১৩০ কোটি মুসলমানের বসবাস। লাখ লাখ মুসলিম বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশে ও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছে। ৯/১১ এর পর ইসলাম ফোবিয়া (ইসলাম ভীতি) তৃণমূলে যেভাবে বেড়েছে তা বিপজ্জনক। হিউম্যান কমিউনিটি একসাথে বসবাস করছে। তাদের পারস্পরিক বোঝাপড়া দরকার, কিন্তু ইসলাম ফোবিয়া বিভক্তি সৃষ্টি করছে।

মুসলিম মহিলাদের হিজাব পরিধান করা একটা ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। হিজাবের প্রতি তাদের অভিব্যক্তি এমন যেন এটা কোন অস্ত্র। সেসব দেশে নারীরা হিজাব পরিত্যাগ করতে পারবে, কিন্তু হিজাব পরিধান করতে পারবে না।

এটা কী ঘটছে? ইসলাম ফোবিয়ার কারণে এমনটা ঘটছে। এটা কখন শুরু হয়েছে? ৯/১১ এর পর ইসলাম ফোবিয়া শুরু হয়েছে। কেন? কারণ, কিছু পশ্চিমা লিডার সন্ত্রাসবাদকে ইসলামের সাথে সমীকরণ করে উপস্থাপন করেছে। যেমন : ইসলামি সন্ত্রাসবাদ, র‌্যাডিকাল ইসলাম (মৌলবাদী ইসলাম)। র‌্যাডিকাল ইসলাম কী? ইসলাম তো কেবল একটাই। আমরা তো কেবল হযরত মুহাম্মদ সা.-এর ইসলামের অনুসরণ করি। এ ছাড়া আর কোন ইসলাম নেই। ইসলামি সন্ত্রাসবাদ ও র‌্যাডিকাল বলে তারা মানু্ষের কাছে কী মেসেজ দিতে চায়? সন্ত্রাসের সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই।৭। আমাদের অবশ্যই এই ইস্যুটি স্পষ্ট করতে হবে। ইসলাম র‌্যাডিকাল নয়, তেমনি ইহুদি, খ্রিস্টান ও হিন্দু ধর্মও র‌্যাডিকাল নয়। কোনো ধর্মই র‌্যাডিকালিজম (মৌলবাদ) প্রচার করে না। সকল ধর্মের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ন্যায়পরায়ণতা, যা মানুষকে পশুর থেকে আলাদা করে।৮। দুঃখজনকভাবে মুসলিম নেতারা র‌্যাডিকালিজম নিয়ে কথা বলতে ভয় পান, তারা মডারেট হতে চান। মডারেট হওয়ার জন্য অনেকে পশ্চিমা স্যুট পরেন এবং এমনকি যারা ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন না তারাও মডারেট হওয়ার জন্য ইংরেজিতে কথা বলেন।৯। সুইসাইড এট্যাককে ইসলামের সাথে সমীকরণ করা হয়, অথচ ৯/১১ এর আগে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সুইসাইড এট্যাক করেছিল তামিল টাইগাররা। তারা হিন্দু। কিন্তু কেউ হিন্দু ধর্মকে এর জন্য দোষারোপ করে না। হিন্দু ধর্মের সাথে সুইসাইড এট্যাকের সমীকরণ মিলায় না।১০। মুসলিম লিডাররা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন যে, হযরত মুহাম্মদ সা. আমাদের কী বার্তা দিয়েছেন? রাসূল সা. কুরআনের সাক্ষ্যদাতা। তিনি ছিলেন কুরআনের জীবন্ত উদাহরণ। হযরত মুহাম্মদ সা. মদিনায় আদর্শ কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই রাষ্ট্রের প্রকৃতি কেমন ছিল? ইসলামের একটি বিষয় আমাকে খুব আন্দোলিত করে। অভিযোগ করা হয় ইসলাম নারী ও সংখ্যালঘু বিরোধী, কিন্তু ইসলামি রাষ্ট্রের সূচনার প্রথম দিনই কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ইসলামি রাষ্ট্র দুর্বল, বিধবা, এতিম, দরিদ্র, প্রতিবন্ধীদের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল, দরিদ্রদের জন্য ট্যাক্স সংরক্ষণ করেছিল।ক. রাষ্ট্র ঘোষণা করেচিল সকল আদম সন্তান সমান। তাদের গায়ের রং যাই হোক না কেন।

মুহাম্মাদ সা. ঘোষণা করেছিলেন দাসদের সাথে পরিবারের সদস্যদের মতো আচরণ করতে। ফলে মুসলিম বিশ্বে এমন কিছু ঘটেছিল, যা অন্যান্য সভ্যতায় ঘটেনি। মুসলিম বিশ্বে দাস রাজ বংশের আবির্ভাব ঘটেছিল। দাসরা রাজা হয়েছিলেন। মামলুক দাসরা মিশর শাসন করেছিল।

১১। ১৯৮০‘র দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের স্বাধীনতার পক্ষে পাকিস্তান পশ্চিমাদের সাথে কাজ করে। মুজাহিদ গ্রুপকে গেরিলা যোদ্ধা বলা হতো। তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী আর অর্থায়ন করেছিল পশ্চিমা দেশসমূহ বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র। সোভিয়েত তাদেরকে সন্ত্রাসী বলত, আমরা তাদের বলতাম মুক্তিযোদ্ধা।১৯৮৯ সালে সোভিয়েত আফগানিস্তান থেকে পলায়ন করে। আমেরিকা আফগানিস্তান ত্যাগ করে আর পাকিস্তানও মুজাহিদ গ্রুপকে ত্যাগ করে।অতঃপর ৯/১১ আসলো। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাকিস্তান যক্তরাষ্ট্রের সাথে সংযুক্ত হলো। কিন্তু আমরা এই যুদ্ধের জড়িত হইনি। কেন? কারণ পশ্চিমারা ও আমরা তাদের বিদেশী দখলদারদের বিরুদ্ধে জিহাদে তথা স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছিলাম। কিন্তু এবার আমেরিকা আফগান দখল করে বসে আর প্রত্যাশা করে, আমরা মুজাহিদদের বলব, তোমারা সন্ত্রাসী, তোমরা স্বাধীনতা সংগ্রামী না। এটা হাস্যকর। তাই পাকিস্তান নিরপেক্ষ থাকতে চেয়েছে, ধ্বংসলীলায় জড়ায়নি।১২। আমার দল যখন ক্ষমতায় আসে, তখন আমি মোদিকে কল করি। আমি তাকে বলি আমাদের সমস্যাবলি একই রকম : জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র। চলুন আমরা আমাদের সমস্যাবলি সমাধান করি ও সম্পর্ক উন্নয়ন করি। মোদি বলেন, পাকিস্তান থেকে সন্ত্রাসী আক্রমণ চালানো হয়েছে। আমি বলি, আমাদের সমস্যা একই। ঠিক একইভাবে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে ভারতীয় গুপ্তচর কলভূষণ যাদভ ধৃত হয়েছেন। সে স্বীকারও করেছে যে, সে ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর হয়ে কাজ করছিল।

১৩। মোদি নির্বাচনে প্রচারণা চালিয়েছেন যে, তিনি পাকিস্তানকে উচিত শিক্ষা দিয়েছেন : দুটি জেট বিমান দিয়ে ১৫ জন পাকিস্তানি হত্যা করেছেন। এটা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা। মোদি কেবল পাকিস্তানের ১০টি গাছ হত্যা করেছেন। অধিকন্তু তাদের একটি জেট ভূপাতিত হয় এবং একজন পাইলট পাকিস্তানের কাছে বন্দী হয়, আমরা তাকে মুক্ত করে দিয়েছি।

অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *