নিলয় দাস স্মরণে

নিলয় দাস স্মরণে

।। ফজলে এলাহী মোখলেছুর রহমান সজল ।।

নিলয় দাস স্মৃতিময় এই শহরের উঠোনে বেড়ে উঠা একজন নাবিক। হাজারো মানুষের ভিড়ে এক প্রাণের মানুষ। এক গানের মানুষ। মিডিয়ার রমরমা হৃদ্যতাকে দুহাতে সরিয়ে দিয়ে চেয়েছেন ভালোবাসা। ক্ষণস্থায়ী এই পৃথিবীর মেলাতে তিনি ছিলেন ভালোবাসার ফেরিওয়ালা। তীক্ষ্ণ আবেগ-অনুভূতির অখণ্ড ভালোবাসা বিলিয়ে দিয়েছেন স্বমহিমায়। আর সেই ভালোবাসার কোমল স্পর্শে বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনে কিছু প্রস্ফুটিত ফুল আজও তাদের সুরভী ছড়াচ্ছে নিজ নিজ স্বকীয়তায়। তিনি কোন লাগামহীন খ্যাতি চাননি, মিডিয়ার বাড়তি কাটতি চাননি। সদা প্রাঞ্জল সেই মানুষটি সবকিছুর বিনিময়ে চেয়েছেন মানুষের ভালোবাসা। ভুল মানুষের বেশে হারিয়ে যেতে চাননি। আর তাইতো আমরা যখনই অবহেলায় ভুলে যাই ভালোবাসার প্রিয় সেই মানুষটিকে, তখনই এই শহর কেঁদে উঠে অভিমানে। অবহেলায় মিশে যেতে চাই রাত্রির মায়ায়। নিয়াজ আহমেদ অংশুর লেখা এবং আইয়ুব বাচ্চুর সুর ও সঙ্গীতায়োজনে এভাবেই গেয়ে উঠেন প্রিয় নিলয় দা। গানের কথামালা সেই যাদুকরী কণ্ঠের সম্মোহনে এভাবেই বন্দী হয় ১৯৯৭ সালে আইয়ুব বাচ্চুর সুর ও সঙ্গীতায়োজনে ‘তুমিহীনা সারাবেলা’ অ্যালবামে।

আইয়ুব বাচ্চুর সুর ও সঙ্গীতায়োজনে ‘তুমিহীনা সারাবেলা’ অ্যালবামে নিলয় দা’র দুটি গান স্থান পায়। একটি হল ‘এই শহর ডুবে যায়’ আর অন্য গানটি হল

“সেই রাত না যাওয়া ভোরে

আমি খোলা আকাশের নিচে

আলো আর আধারিতে কষ্ট গিয়েছি ভুলে

সেই রাত না যাওয়া ভোরে

পৃথিবীর যত যন্ত্রণা আছে

একদম যাই ভুলে, বেমালুম যাই ভুলে”

অসম্ভব চমৎকার এই গান দুটি মাধ্যমেই নিলয় দা’কে প্রথম চিনি আমি। নিলয় দাশ, মানহীন সস্তা গানের সাথে আপোষহীন এক মেধাবী নাম। আসুন পরিচিত হই বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রের সাথে।

বরেণ্য নজরুল সঙ্গীত শিল্পী ও গবেষক সুধীন দাস এবং বিশিষ্ট নজরুল সঙ্গীত শিল্পী ও শিক্ষক নীলিমা দাশের ঘর আলো করে ১৯৬১ সালের ৩০-শে সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন নীলয় কুমার দাশ।

নিলয় কুমার দাশ, অনেক পরিচয়ের মাঝে একটি হলো তিনি ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম সেরা গীটারিস্টদের একজন। নিলয় ছিলেন একাধারে গায়ক, সুরকার, সঙ্গীতপরিচালক ও শিক্ষক। আমাদের এই বাংলাদেশে তিনিই প্রথম নিউক্ল্যাসিক্যাল, ব্লুজ, স্পীডমেটাল ও জ্যাজ মিউজিক চর্চা শুরু করেন। অর্থহীনের সুমন, কমল (প্রাক্তন ওয়ারফেজ সদস্য), দলছুটের বাপ্পা, সোলসের পার্থ দা’র গীটারের হাতেখড়ি হয় প্রয়াত নিলয় দাসের হাত ধরেই।

১৯৮৮ সালে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সারগামের ব্যানারে প্রকাশিত হয় নিলয় দাশের ফার্স্ট সলো অ্যালবাম ‘কত যে খুঁজেছি তোমায়’ (সারগাম লেভেল – ১৬৫)। অসংখ্য জনপ্রিয় গানের গীতিকার কাওসার আহমেদ চৌধুরীর লেখা ও বাংলাদেশের অন্যতম সেরা সুরকার ও সঙ্গীতপরিচালক ফিডব্যাকের দলনেতা ফোয়াদ নাসের বাবুর সুরারোপে করা ‘কত যে খুঁজেছি তোমায়’ গান দিয়েই শুধু হয় অ্যালবাম। লিরিকের কিছুটা তুলে দিলামঃ

“সেই যে চলে গেলে আর হায় এলেনা ফিরে

কত যে খুঁজেছি তোমায় অকারণ অশ্রুজলে”


এই গানটিই খুব সম্ভবত নীলয় দাশের গাওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় গান। গানের কথা, সুরবিন্যাস ও সঙ্গীতায়োজন হৃদয়ের গভীরে গিয়ে স্পর্শ করে মুহুর্তেই। গানের কথামালার কাব্যিক উপমা, সুরের নান্দনিক ও ব্যতিক্রমী উপস্থাপন, যন্ত্রসঙ্গীতের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা নিলয় দাসের গানের তিনটি প্রকট বৈশিষ্ট।

বাংলাদেশের বরেণ্য গীতিকার কাওসার আহমেদ চৌধুরী, আহমেদ ইউসুফ সাবের, আসিফ ইকবালের লিরিকে ও ফোয়াদ নাসের বাবুর সুর সংযোজনায় এই অ্যালবামে সংকলিত হয় ১১ টি মাস্টারপিস। জীবনবোধ, প্রেম-ভালোবাসা, বিষাক্ত মাদকতা, হ্যাপীর অকালে চলে যাওয়া, বিরহ সবকিছু মিলিয়ে বিষয়ভিত্তিক বৈচিত্র্যতায় ভরপুর বৈচিত্র্যময় এক দুর্দান্ত অ্যালবাম। প্রতিটি গানে গীটারের চমৎকার কাজগুলো যে কাউকেই মুগ্ধ ও বিষ্মিত করতে বাধ্য। নিলয় দা’র গান মানের গীটারের চমকপ্রদ নান্দনিক ব্যবহার।

অ্যালবামের উল্লেখযোগ্য গানগুলো হলো ‘কত যে খুঁজেছি তোমায়’, ‘যখনই নিবিড় করে’, ‘আমি মুক্তি পেয়েছি’, ‘সেই অচেনা’, ‘যখন দেখি’, ‘একা একা’, ‘হ্যাপী’, ‘সাগর ডেকে বলে’। এই অ্যালবামের গানগুলো প্রসঙ্গে আমার এক বন্ধু আমাকে বললো “নীলয় দা’র গান মোবাইল ফোনে সিনক্রোনাইজ করতে গিয়ে দেখি কোনটা রেখে কোনটা নিই। প্রতিটি গান একটা অন্যটার চেয়ে ব্যতিক্রম ও অসম্ভব সুন্দর। তাই একটা একটা করে সবগুলোই ফোনে নিয়ে নিয়েছি”।

নিলয় দাসের গান মানেই প্রতিটি গান শুনে মুগ্ধ হতে হবে এবং সমস্ত সংশয় ঝেড়ে ফেলে দিয়ে স্বীকার করে নিতে হবে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। তবে দুঃখ ও আক্ষেপ এই যে, নিয়মিত গান শোনেন এমন অনেকেই চিনেন না এই শিল্পীকে। শুনে দেখেন নি বাংলা ব্যান্ড মিউজিকে তার সেই মাস্টার পিসগুলো। ফুয়াদ-আল-মুক্তাদির তার ‘বন্য’ শিরোনামের অ্যালবামে নীলয় দাশের জনপ্রিয় ‘যখনই নিবিড় করে’ গানটি রিকম্পোজ করে। আর সেই গানটিতে কণ্ঠ দেন তৎকালীন ‘রাগা’ ব্যান্ডের ভোকাল ‘এলিটা’। মজার ব্যাপার হলো, নতুন প্রজন্মের শ্রোতারা লুফে নেয় সেই গানটি। আমার ঠিক মনে নেই, অ্যালবামের কাভারে গানটির মূল গায়ক, সুরকার ও সঙ্গীতপরিচালকের নাম উল্লেখ ছিল কিনা। তবে, যেহেতু এই প্রজন্মের শ্রোতাদের একটা বিশাল অংশ অ্যালবাম না কিনে নেট থেকে ডাউনলোড করে গান শুনে অভ্যস্ত তাই তাদের অনেকের কাছেই গানটি ফুয়াদ ও এলিটা’র অসামান্য সৃষ্টি বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। এর দায়ভার কে নেবে? –এই প্রশ্নটা রেখে গেলাম!

আহমেদ ইউসুফ সাবেরের লেখা ও ফোয়াদ নাসের বাবুর সুরারোপে করা নীলয় দাশের সঙ্গীতায়োজনে ‘কত যে খুঁজেছি তোমায়’ অ্যালবামে ‘যখনই নিবিড় করে’ শিরোনামে সংকলিত গানের লিরিকের কিছুটা তুলে দেবার লোভ সামলাতে পারছিনা।

“যখনই নিবিড় করে পেতে চাই তোমাকে

তখনই দু’চোখ বুঁজি আমি

শয়নে স্বপনে দেখি শুধু তোমায়

বিরহ বরষায়, মেঘেরই ছায়ায় ….”

গীতিকার আসিফ ইকবালের কথায় একই অ্যালবামে তিনি সংকলন করেন অকাল প্রয়ত হ্যাপী আখন্দের স্মৃতি।

“হ্যাপী তোকে মনে পড়লেই

একটা গীটার তোলে ঝঙ্কার

পিয়ানোটা বেজে উঠে

তোর সেই নিপুণ হাতে

হ্যাপী তোকে মনে পড়লেই

‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’

মনে পড়ে যায় মাঝরাতে …..”

প্রাশ্চাত্য ইন্সট্রুমেন্টের সৃজনশীল ব্যবহারে বিবর্তনের হাওয়া বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনে যে জোয়ার এসেছিল তা ফুটিয়ে তোলেন ‘বিবর্তন’ নামের ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিকে, অসাধারণ সেই কম্পোজিশনটি একই অ্যালবামে সংকলিত হয়।

১৯৮৮ সালে প্রথম অ্যালবাম প্রকাশের পর দুই বছরের ব্যবধানে সারগামের ব্যানারে ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয় প্রচারবিমুখ ও নিভৃতচারী এই গুণী শিল্পীর সেকেন্ড সলো অ্যালবাম ‘বিবাগী রাত’ (সারগাম লেভেল – ৪১২)। প্রথম অ্যালবাম প্রকাশের মাধ্যমে তৎকালীন সময়ের সঙ্গীত পিয়াসী শ্রোতাগোষ্ঠিকে মুগ্ধতায় ডুবিয়ে নিজের যে গ্রহণযোগ্যতা তৈরী করেছিলেন, তারই ধারাবাহিকতায় শ্রোতাদের ভালোবাসা ও অনুভূতিগুলোকে আরো মুগ্ধতায় ডুবিয়ে দেবার স্লোগান ছিল সমস্ত ‘বিবাগী রাত’ অ্যালবামজুড়ে। এটা সত্য যে, শুধুমাত্র শ্রোতাদের মুগ্ধতা আর ভালোবাসার প্রতিনিধিত্ব নয় বরং সৃজনশীল ও নান্দনিক শিল্পীস্বত্বার প্রতিনিধিত্বই তিনি করেছিলেন। আর তাই জনপ্রিয়তার ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখে নিজের বিশ্বাসের প্রতিনিধিত্ব করেছেন স্বকীয় মহিমায়!

প্রসঙ্গক্রমে বলতেই হয়, বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের গৌরবোজ্জ্বল যে অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল তারুণ্যদীপ্ত মহারথীদের হাত ধরে এবং দীর্ঘ প্রায় তিনযুগের মত আলোকিত ছিল স্বকীয় অনন্যতায়! সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনে নেমে আসে যুগের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্ধ্যাত্ব! সঙ্গীতের বাণিজ্যিকীকরণ, সস্তা ও মানহীন গানের বাড়াবাড়ি রকমের ছড়াছড়ি এবং সেই সব মানহীন গানের ব্যাপক প্রচার ও প্রসারে মিডিয়ার প্রশ্রয়ে বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনে সূচনা হয় যুগের সবচেয়ে নিকৃষ্ট গানের অধ্যায়! শ্রোতাদের ভালোলাগা ও আদিখ্যেতায় বিক্রি হয়ে যায় শিল্পী স্বত্বা! ‘নাস্তিক’ শব্দটার মতই শহর ছাড়িয়ে গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে নাশকতার মত! সৃজনশীল গানের রুচিবোধেও ফাটল ধরে একই সময়ে! আদতে সাময়িকভাবে মোহাবিষ্ট করা নিকোটিনের মতই ভয়ংকররূপ ছিল সেই সময়ের গানগুলোর! তৃপ্তি সাময়িক কিন্তু প্রভাব দীর্ঘ! মিডিয়া ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি অনেক জনপ্রিয় সুরকার, গীতিকার ও শিল্পী সেই সস্তা জনপ্রিয়তার কাছে বিক্রি হয়ে গিয়েছিলেন! এটা সত্য যে, সঙ্গীতকে অনেকেই একমাত্র পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, হয়ত তাই জনপ্রিয়তা ও সস্তা-মানহীনতার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে মেতে উঠেছিলেন জীবনের তাগিদে!

নীলয় দাশ যতদিন বেঁচে ছিলেন এই সমস্ত কিছু থেকেই নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পেরেছিলেন! ‘বিবাগী রাত’ অ্যালবামে ফিরে যাই প্রিয় নীলয় দাশের কাছে। অ্যালবাম শুরু হয় গীতিকার মারুফ আহমেদের লেখা ‘আমার স্বপ্নের দরজা’ গানটি দিয়ে।

“ছেঁড়া কাগজে কলম ধরে লিখতে চেয়েছি তোমার কথা

তুমি আসনি তাই লেখা হলোনা আজও তা . . . . . .

তুমি আসবে বলেইতো স্তব্ধ নগরী অপেক্ষারত ! ”

প্রিয় মানুষটির ফেরার অপেক্ষায় কতশত অনুক্ত অনুভূতিগুলো পথ চেয়ে থেকে স্বপ্নের জাল বুনে বিরহী মন। বিবাগী মন বোহেমিয়ান ঘুরে বেড়ায় আর বিনিদ্র জেগে থাকে প্রিয় মানুষটির অপেক্ষায়! এরপরই অন্যতম সেরা গীতিকার বাপ্পী খানের কথায় গেয়ে উঠেন জায়ান্ট হিট ‘বিবাগী রাত’! অসম্ভব চৎমকার কথার জোরালো গাঁথুনি, মনোমুগ্ধকর সুরারোপ, যন্ত্রসঙ্গীতের দুর্দান্ত উপস্থাপন ও নীলয় দা’র জাদুকরী কণ্ঠের ছোঁয়াতে অনুভূতিগুলো সিক্ততা খুঁজে পেয়ে মুখ লুকায় সেই গানে! অসম্ভব চমৎকার সেই গানের কিছুটা অংশ তুলে দিলামঃ

“যখনই চেয়েছে মন কিছু কথা বলি

সামনে এলেই তুমি অগোছালো হই আমি

বিবাগী রাতের মত ফিরে আসে বারবার

ফেরারী গানের মত দেখা হয় দু’জনার

নিঃশব্দ হৃদয়ে আমার . . . . ”

বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের এটি একটি ক্ল্যাসিক! নিলয় দা’র এই গানটি যাদের এখনও শোনার সুযোগ ও সৌভাগ্য হয়ে উঠেনি তাদের প্রতি অনুরোধ রইল অসম্ভব চমৎকার এই গানটি অন্তত একবার হলেও শুনে দেখবেন! আমার বিশ্বাস সঙ্গীতের নতুন একটি অধ্যায় উন্মোচিত হবে আপনার! সেই অধ্যায় নিভৃতচারী নীলয় দাশের, বাংলাদেশের অন্যতম সেরা গীটারিস্টের!

এরপরই একে একে আসে ‘ছেড়ে গেল চাঁদ’, ‘ভালোবাসি জোৎস্না’, ‘আকাশ কত বিশাল যদি দেখতে’, এবং ‘সেই ভালো’। প্রতিটি গানই অসম্ভব চমৎকার! বিশেষ করে প্রতিটি গানের সঙ্গীতায়োজন, গীটারের নিপুণ ও শৈল্পিক ব্যবহার ও উপস্থাপনা মুগ্ধতায় ডুবিয়ে দেবে এটা নিশ্চিত! ব্যক্তিগতভাবে উল্লিখিত প্রতিটি গানই আমার অসম্ভব প্রিয়! হয়ত অন্য কোন পোষ্টে প্রতিটি গান নিয়ে বিশদভাবে আরও ভিন্ন আঙ্গিকে ফেরার চেষ্টা করবো! কোন প্রতিশ্রুতি দিয়ে নয়, তাগিদ থেকেই বার বার ফিরে যাবো নীলয় দা’র কাছে! প্রিয় মানুষটিকে ঘিরে আমার ভালোলাগার শেষ নেই! ভালোলাগাগুলো বেঁচে থাকুক।

অনেক জনপ্রিয় গানের গীতিকার আহমেদ ইউসুফ সাবেরের লেখা ‘সেই ভালো’ গানটি দিয়েই শেষ হয় ক্যাসেটের এ-পিঠ! আপনাদের সাথে শেয়ারের লোভ সামলাতে পারছিনা বলেই লিরিকের কিছুটা অংশ তুলে দিলাম। বাকীটা আপনাদের জন্যই রইলঃ

“এত দিন হাসি গানে যত খেলা খেলেছো

সবকিছু মুছে ফেলে আজ একা চলেছো

সেই ভালো, সেইতো অনেক ভালো

মেটাবো পিপাসা অশ্রু দিয়ে

সেই ভালো চলে যাও

আমি শুধু জ্বলে জ্বলেই যাবো ফুরিয়ে

বাকী জীবনটা ঢাকবো অন্ধকার দিয়ে . . . ”

ক্যাসেটের বি-পিঠের শুরুতেই বাপ্পী খানের লেখায় ‘স্বপ্নের সাঁওতালী’। এরপর একে একে বেজে উঠে সামিনা চৌধুরীর লেখায় ‘সাকি’, অসংখ্য জনপ্রিয় গানের গীতিকার লতিফুল ইসলাম শিবলীর লেখা ‘সন্ধ্যাতারা’, বাপ্পী খানের লেখা ‘আরশি ও আমি’, নীলয় দা ও লতিফুল ইসলাম শিবলীর যৌথ লেখা ‘রাস্তার ছেলে’ এবং নীলয় দা’র নিজের লেখা ‘অপবাদ’ গানটির মাধ্যমে শেষ অ্যালবামটি। শেষ হয় অসম্ভব প্রতিভাবান গীটারিস্ট, সুরকার ও কম্পোজার নীলয় দাশের দ্বিতীয় ও সর্বশেষ সলো অ্যালবাম।

লতিফুল ইসলাম শিবলী, তিনি একজন নাগরিক কবিয়াল! বাংলাদেশের সংঙ্গীতাঙ্গনে অসংখ্য জনপ্রিয় গানে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন এই লিরিসিস্ট! এই অ্যালবামেই প্রথমবারের মত প্রিয় নীলয় দা’র জন্য গান লিখেন প্রিয় এই গীতিকার! দুই দিকপাল মিলে সৃষ্টি করেন মাধুর্য্যময় এক মাষ্টারপিস! জোর দিয়েই বলা যায়, এই গানটি না শুনলে বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের অপূর্ব এক সৃষ্টির বেদনা আড়ালেই থেকে যাবে অযত্ন আর অবহেলায়! লিরিকের কিছুটা অংশ তুলে না দিলে এই লেখাটাই অপূর্ণ থেকে যাবে।

“কপালে যে টিপ পড়েছ তুমি

সেইতো সন্ধ্যাতারা

পাতার নূপুর তোমার আঁচলেতে

তুলেছে সুরের সাড়া

হাওয়ার কাঁপন করেছে আপন

তোমার নীরব চুল

পাথর চাপা দুঃখের বাগানে

ফোটাবে তুমি ফুল

তুমি হেঁটে গেলে নদী কথা বলে যায়

তোমার পলকে ভোরের পাখিরা ডেকে যায়

আকাশ হাসে যখন দেখে তোমার অবুঝ ভুল . . . ”

গানের কথামালাতেই কণ্ঠ মেলে দিয়ে তুলে ধরেছেন নিজেকে। গানের কথাতেই সমস্ত দুঃখগাথা, হতাশা, ভালোবাসা কিংবা আত্মিক বিশ্লেষণে নিজেকেই ফুটিয়ে তুলেছেন প্রতিটি গানের মাঝে! কখনো গেয়ে উঠেছেন

“আশরিতে নয়ন রেখে সযতনে

যতটা খারাপ আমি ভাবছি আমাকে

ততটা খারাপ আমি নই একজন

মানুষ হিসেবে আমি বড় অযতন . . . ”

কিংবা

“সকলের অভিনয় নিন্দার সানাই

দিয়ে ভালোবাসা পেয়েছি ঘৃণা

আমার দু’চোখ তাই প্রশ্নে ভরা

অপবাদ অপবাদ . . .

বিরহের শিশিরে এই বুক ভরা

অপবাদ অপবাদ . . .

সিক্ত কুহুক জানে আমি আজ একা ”

সঙ্গীতায়োজনের ব্যতিক্রমী উপস্থাপন, বৈচিত্র্যময় কথায় ভরপুর নান্দনিক সুরের মেলা জমে উঠে নীলয় দা’র গানে! গীটারের নিপুণ উপস্থাপনা মুগ্ধতায় ভরে দেয় ক্ষণে ক্ষণে! প্রেম, ভালোবাসা, জীবন-বোধ, হতাশা, ক্ষোভ সবই তুলে ধরেছেন সঙ্গীতের ঝঙ্কারে। নিজের ভালোলাগা আর সৃজনশীল মেধার সবটুকু ঢেলে দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন আমাদের ব্যান্ড মিউজিক! আমি বিশ্বাস করি শিল্পী মানেই সামাজিক দায়বদ্ধতায় শিল্পী মন বিষাদে ভরে উঠবে। ‘বিবাগী রাত’ অ্যালবামে ‘ভালোবাসি জোৎস্না’ গানটি তেমনই একটি গান। একজন ব্যক্তি মানুষ হিসেবে, শিল্পী হিসেবে নৌকায় চড়ে বেড়াতে কার না ভালো লাগে! ভালো লাগে অপরূপ প্রকৃতিতে মুগ্ধতায় ডুবে যেতে! নাগরিক জীবন ছেড়ে নিঝুম সবুজের বুক ধরে হেঁটে যেতে ভালো লাগে! এতসব ভালোলাগার মাঝে শিল্পী বিষাদে ডুবে যান! বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যায় অক্ষমতায়! আর সেই অক্ষমতায় নিজের মনের কথাগুলো সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়াটাই একমাত্র মানসিক প্রশান্তি। তারই প্রতিচ্ছবি অঙ্কিত হয়েছে ‘ভালোবাসি জোৎস্না’ গানটিতে যার কিছুটা তুলে দিলামঃ

“ভালোলাগে ডিঙি নৌকায় চড়ে ভাসতে

প্রজাপতি বুনোমেঘ ভালোলাগে দেখতে

জানালার কোণে বসে উদাসী বিকেল দেখে

ভালোলাগে এক মনে কবিতা পড়তে

তবুও কিছুই যেন ভালো যে লাগে না কেন

উদাসী পথের বাঁকে মাঝে মন পড়ে থাকে কেন

কোথায় রয়েছে ভাবি লুকিয়ে বিষাদ তবুও . . .

যখন দেখি ওরা কাজ করে গ্রামে বন্দরে

শুধুই ফসল ফলায় ঘাম ঝরায় মাঠে প্রান্তরে

তখন ভালোলাগেনা লাগেনা কোন কিছুই

সেদিন কাছে এসো ভালোবাসি একসাথে এই সবকিছুই . . .”

নীলয় দাশের গানে উঠে এসেছে প্রেম, ভালোবাসা, বিরহ, জীবন-বোধ থেকে শুধু করে মাদকের নাশকতা, শ্রমজীবী মানুষের জীবনযুদ্ধের কথা, উঠে এসেছে অসম্ভব মেধাবী ক্ষণজন্মা শিল্পী হ্যাপী আখন্দের কথা! নীলয় দাশ খুব কম সংখ্যক গান করে যেতে পেরেছেন আমাদের জন্য। তবে এই অল্পসংখ্যক গানের মাধ্যমেই নিজেকে মেলে ধরেছেন আপন মহিমায়! তার সৃষ্ট প্রতিটি মিউজিকই এক একটি ক্ল্যাসিক!

‘কত যে খুঁজেছি তোমায়’ এবং ‘বিবাগী রাত’ এই দুটি সলো অ্যালবামের বাইরে বেশ কিছু মিক্সড অ্যালবামে গান করেছেন নীলয় দা! আইয়ুব বাচ্চুর সুরে ‘তুমিহীনা সারাবেলা’ অ্যালবামের দুটি অসম্ভব চমৎকার গানের কথা শুরুতে উল্লেখ করেছি! এর বাইরে বাংলাদেশের সাতজন সেরা গীটারিস্টদের নিয়ে মিক্সড ‘টুগেদার’ অ্যালবামে লতিফুল ইসলাম শিবলীর লেখায় গেয়েছেন ‘

লাশ কাটা ঘর – শিরোনামের দুর্দান্ত একটি গান। আধুনিক ও ব্যান্ড মিক্সড ‘কেউ সুখী নয়’ অ্যালবামে ‘বৃষ্টি’ গানটি অনন্য সাধারণ একটি গান!

এছাড়া প্রাইম অডিও-র প্রযোজনায় প্রকাশিত ব্যান্ড মিক্সড অ্যালবাম ‘দেখা হবে বন্ধু’ অ্যালবামে ‘এইটুকু খোলা রেখো পথ’ আমার অসম্ভব প্রিয় গানের একটি! ‘অবহেলা’ শিরোনামে গান করেছেন আশিকুজ্জামান টুলুর সুরে বাংলাদেশের প্রথম ব্যান্ড মিক্সড অ্যালবাম ‘স্টারস-১’ এ। ‘শুধু তোমার জন্য’ মিক্সড অ্যালবামে ফাহমিদা নবীর সাথে ‘মনে পড়ে গেল’ শিরোনামের একটি দ্বৈত গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। আমার জানা নীলয় দা’র শেষ অ্যালবামটি খুব সম্ভবত ‘কাছে আসার দিন ভালোবাসার দিন’ শিরোনামের ভালোবাসা দিবসের একটি অ্যালবাম। ‘ভালোবাসার দিন’, ‘তোমাকেই প্রয়োজন’, ও ‘তুমি মেয়ে’ শিরোনামের তিনটি গানে কণ্ঠ দেন তিনি। এবং কোন মিক্সড অ্যালবামে সর্বাধিক তিনটি গানে কণ্ঠ দেন একমাত্র এই অ্যালবামটিতেই।

নীলয় দা’ খুব বেছে বেছে গান করতেন। গান করার ক্ষেত্রে গানের সংখ্যাকে কোনদিনই প্রাধান্য দেননি তিনি। চেয়েছেন ভালো কিছু গান করতে। আর তাই সলো এবং মিক্সড অ্যালবাম মিলিয়ে খুব অল্প কিছু গানই তিনি আমাদের উপহার দিয়েছেন। এবং সেই গানগুলোর প্রতিটি গানই অসম্ভব চমৎকার। কিন্তু দুঃখ এই, বর্তমান সময়ের অনেকেই চেনেন না অসম্ভব মেধাবী এই গীটারিস্ট, সুরকার, কম্পোজার ও গায়ক নীলয় দাশকে। ব্যক্তি জীবনে নিভৃত জীবন-যাপন করতে পছন্দ করতেন বলেই প্রচারবিমুখ থেকেছেন সারাটা জীবন! সাম্প্রতিক সময়ে কালের পরিক্রমায় আমরা হারাতে বসেছি আমাদের এই ‘কিংবদন্তীকে’।

এই পোষ্টটি নীলয় দা’র গানগুলো নিয়ে আমার মুগ্ধতা ও ভালোবাসার অনুভূতিগুলোর বহিঃপ্রকাশ। কথা দিচ্ছি, আবারও ফিরবো নীলয় দা’কে নিয়ে! তুলে ধরবো অজানা অনেক তথ্য। উঠে আসবে অসম্ভব চমৎকার এই গানগুলোর পেছনের গল্প! থাকবে কাছের প্রিয় কিছু মানুষের কথা! কত বিনিদ্র রাত কেটে গেছে সৃষ্টির বেদনায়! হয়ত ক্ষুদ্র এই আমার পক্ষে তার পুরোটা তুলে ধরা সম্ভব হবে না। তবুও চেষ্টার কমতি থাকবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *