পিয়াস করিমের শেষ বক্তৃতা

পিয়াস করিমের শেষ বক্তৃতা

আমি অর্থনীতিবিদ নই। আমি বিভিন্ন ধরনের সম্পর্কের ভারসাম্য এবং উল্লেখযোগ্য ঘটনায় অংশগ্রহণকারীদের ভূমিকা সম্পর্কে কথা বলবো। সেই দিন শেষ হয়ে গেছে, যখন রাষ্ট্র একাই কেবল ভূমিকা পালনকারী ভূমিকায় থাকবে, অবশ্য যদি আপনি একান্তই নয়া রক্ষণশীল ধ্রুপদী অর্থনীতিবিদ না হন।

স্থানীয় পুঁজি এবং আন্তর্জাতিক পুঁজির মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। আপনি কিভাবে আন্তর্জাতিক পুঁজির সঙ্গে নেগোসিয়েট করবেন, আপনি কি ধরনের শর্তসাপেক্ষে আন্তর্জাতিক পুঁজিকে আমন্ত্রণ জানাবেন, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ, আপনাকে শ্রম ও পুুঁজির মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। কারণ শ্রম উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। আর শ্রম এমন একটি বিষয়, বাংলাদেশে যা আমরা প্রায় প্রাত্যহিক ভিত্তিতে মুখোমুখি হচ্ছি। বিশেষ করে গার্মেন্ট কারখানার ক্ষেত্রে, যা এ মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

একটি অসন্তুষ্ট শ্রমশক্তি কখনওই খুব উৎপাদনশীল শক্তি হতে পারে না। আমরা একটি শিক্ষিত শ্রমশক্তি গড়তে চাই, যা হবে প্রতিযোগিতাপূর্ণ এবং একই সঙ্গে তাদের অবশ্যই পুরস্কৃত করতে হবে। আপনি কিভাবে শ্রমিকদের পুরস্কৃত করছেন সেটা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমি মনে করি শ্রম ও মজুরির মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্য লাগবে। বিভিন্নভাবে পূর্ব এশীয় দেশগুলো এটা অর্জন করেছে। যদিও তা পর্যাপ্ত বা সম্পূর্ণভাবে তারা করতে পারেনি। তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, কিছুটা মালয়েশিয়া করেছে। চীনও কিছুটা তার নিজের উপায়ে পথ হাঁটছে। যদিও তা পর্যাপ্ত বা সম্পূর্ণ নয়। কিন্তু সে তার নিজের মতো করে পুঁজির বাজার মোকাবিলার চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশের জন্য এটাই মুখ্য সামাজিক-অর্থনৈতিক বিষয়, যার দিকে আমাদের সর্বাগ্রে মনোযোগ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমরা যখন অর্থনীতি নিয়ে কথা বলবো, তখন কেবল প্রবৃদ্ধি নিয়ে কথা বলতে পারি না। আমরা যখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে কথা বলবো, তখন ব্যাপক ভিত্তিক একটি ফ্রেমওয়ার্ক নিয়ে কথা বলবো। যেটা অমর্ত্য সেন বলেছেন। তার মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে না। যদিও ১৯৯৬ সাল থেকে প্রশংসনীয়ভাবে আমাদের প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু আমাদের যে কোন ধরনের একটা ‘রি-ডিস্ট্রিবিউটিং মেজার’ দরকার। আমাদের দরকার এক ধরনের ক্ষমতায়নের অনুভূতি। ভোক্তা ও শ্রমিকদের মধ্যে দরকার নিরাপত্তাবোধ, যেটা দৈহিক, আর্থিক ও অন্যান্য অনুভূতির দিক থেকেও। নারী-পুরষের সম্পর্কও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। নারীকে উন্নয়নের প্রক্রিয়ায় এনে তাকে একটি গুরুত্বসম্পন্ন অর্থপূর্ণ অংশীদারে পরিণত করতে হবে। উন্নয়নের জন্য এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা।

তবে সবার উপরে যে সত্য মনে রাখতে হবে তাহল কোন দেশের একটি অসুখী নাগরিককুল উন্নয়নের সারথি হতে পারে না। আর তাই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বশর্ত। তবে এর আগের অধিবেশনে শাফকাত মুনির (বিআইপিএসএস) যেমনটা বলছিলেন যে বাংলাদেশে ‘ডেমোক্রেসি ডেফিসিট’ বা ‘গণতন্ত্রের ঘাটতি’ চলছে। এটা একটা খুবই চমৎকার মন্তব্য। আসলে এটাই এখন বাংলাদেশের প্রধান সঙ্কট। বর্তমানে বাংলাদেশে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা চলমান রয়েছে,  তাকে আসলে এক ধরনের গণতান্ত্রিক বাতাবরণ দেয়া ছাড়া টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। বহুবিধ কারণে পূর্ব এশিয়ার স্বৈরতান্ত্রিক মডেল বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য নয়। উদাহরণ হিসেবে বলছি, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া বা সিঙ্গাপুরে যেসব ঐতিহাসিক কারণে রাষ্ট্র তার ইচ্ছাকে সমাজের অবশিষ্টাংশের ওপর চাপিয়ে দিতে পেরেছে, সে সব কারণ বাংলাদেশের সমাজে অনুপস্থিত।

আমি কিন্তু একেবারেই নৈরাশ্যবাদী নই। আমি অবশ্যই আশাবাদী। তবে আমাকে অবশ্যই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। আমাকে অবশ্যই আশাবাদী হতে হবে। কারণ বাংলাদেশ আমার নিবাসভূমি। বাংলাদেশের যে সাফল্য তাতে সরকারের ধন্যবাদ প্রাপ্য। তবে সেজন্য একই সঙ্গে অনেকগুলো বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ সাফল্য মূল্যায়ন করতে গেলে এটা মনে রাখতে হবে যে গৃহীত নীতিমালা যে সব কারণে কোথাও সুফল এসেছে সে সব নীতি এককভাবে কোন একটি সরকার গ্রহণ করেনি। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ফসল।

বাংলাদেশে বসবাস করেন এমন অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন যে, দেশে এই মুহূর্তে যদি কোন সরকার না থাকে তাহলেও ৪-৫ ভাগ প্রবৃদ্ধি হবে। কিন্তু তা নিশ্চয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে না। গ্রামীণ ব্যাংকের মতো এনজিওসমূহ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অসামান্য ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এটাই সত্য, গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সম্ভব সকল উপায়ে হেনস্থা করেছে। আমি মনে করি তাঁর নোবেল পুরস্কার লাভ হয়তো এর অন্যতম কারণ হতে পারে। (সকলের হাসি)।

তবে তা সত্ত্বেও আমি ইতিবাচকভাবে সরকারের ভূমিকার প্রশংসা করতে পারি, আমরা যদি উন্নয়নের ধারণাকে সংকীর্ণভাবে দেখি। তবে আমি মনে করি বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখা দরকার।

সব হিসাব-নিকাশের পরে এটাই বলতে হয় যে একটি দেশের অর্থনীতি হলো সেটাই যা আসলে তার রাজনৈতিক অর্থনীতি। আমার মনে হয় সকল বিদেশী বিনিয়োগকারীর কাছে এটাই প্রত্যাশিত যে তাদের অব্যাহতভাবে শ্রমিক অসন্তোষের কবলে পড়তে হবে না। কিংবা প্রত্যেক সকালে তাদেরকে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের মুখ দর্শন করতে হবে না। ঘুষ দিতে হবে না। তাদেরকে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কবলে পড়তে হবে না।

বাংলাদেশে উন্মুক্ত বন্দরের বিরাট অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে। গ্যাস ও কয়লার ব্যাপারে যদিও অনেক বেশি রাজনৈতিক চাপ রয়েছে। এখানে খনিজ সম্পদের ব্যবহারের বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের মনোভাবকে ধারণ করার একটি বিষয় রয়েছে। দক্ষতার সঙ্গে আমরা আমাদের খনিজ সম্পদ আহরণ ও তার ব্যবহার করতে পারি। সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের এক্ষেত্রে একটি বিরাট সম্ভবনা রয়েছে। যদি তারা এ বিষয়ে সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে পারে। আমি এমন অনেককে ব্যক্তিগতভাবে জানি, যারা কয়লা ও গ্যাসের ব্যবহার নিয়ে নানাবিধ প্রশ্ন তুলেছেন। আর সে সব প্রশ্নের খুবই সঙ্গত গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। আর সেখানেই আমি মনে করি যে ‘প্র্যাগমেটিজম ডেফিসিট’ চলছে। তবে এখানে কথা হলো আমরা এখানে কিভাবে বাস্তববাদী নীতি অনুসরণ করতে পারি। যদি আমরা সেটা করতে সক্ষম হই, তাহলে বাংলাদেশের অমিত সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে একটি সাফল্যজনক বাণিজ্য পরিবেশ সৃষ্টির বিষয়টি বাংলাদেশে ঘটতে যাচ্ছে না। বিনিয়োগকারীরা নিশ্চয়ই তর্ক করতে যাবেন না যে, গণতন্ত্রই হলো তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য একটি আদর্শিক ব্যবস্থা। কিন্তু তারা অবশ্যই বাস্তবসম্মত কারণে বিনিয়োগের আগে একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশের দিকে নজর দেবেন। এবং আমার যুক্তি হলো গণতন্ত্রই হলো একমাত্র ব্যবস্থা, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে পারে। গণতন্ত্র অবশ্যই একটি বিমূর্ত তত্ত্বগত বিষয় নয়। গণতন্ত্র একটি সুনির্দিষ্ট বাস্তবসম্মত প্রয়োজনীয়তা। বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল, যদিও আমার আদর্শের রাজনীতিবিদ  নন কিন্তু আমি তার একটি উদ্ধৃতি দিতে পারি। তিনি বলেছিলেন, গণতন্ত্র একটি নিকৃষ্ট ব্যবস্থা তবে এর অনুশীলন ছাড়া আমাদের সামনে অন্য কোন উত্তম বিকল্প নেই। আর সেটাই আসলে গণতন্ত্রের গুরুত্ব নির্দেশ করে। অন্তত একটি গণতান্ত্রিক সাফল্য ছাড়া বাংলাদেশে বাণিজ্যবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হতে যাচ্ছে না। এটা অবশ্য সাধারণভাবে দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও প্রযোজ্য।

পিয়াস করিম (১৯৫৮-১৪ অক্টোবর ২০১৪) ৬ই অক্টোবর ২০১৪ সালে ওয়াশিংটনে আমেরিকান সিকিউরিটি প্রজেক্ট আয়োজিত ‘বাংলাদেশ: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক একটি সংলাপে অংশ নেন। সেখানে তাঁর আলোচনার অনূদিত অংশ উপস্থাপন করা হল। কোন আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে এটাই তাঁর শেষ বক্তব্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *