আবিষ্কার ফাউন্ডেশন: স্বপ্ন তৈরির কারখানা

:: ডা. মমি আনসারি ::

আবিষ্কারের গল্পটা খুব সাদামাটা। কিন্তু স্বপ্নটা বিশাল ঝলমলে। একজন যোদ্ধার ঝলমলে তরবারির মত। যে তরবারি দিয়ে নতুন নতুন রাজ্য জয় করার স্বপ্ন দেখে। আর আবিষ্কারকরা স্বপ্ন দেখে সুখী, সমৃদ্ধ, আধুনিক বাংলাদেশের।

“আবিষ্কার ফাউন্ডেশন” এর নাম শুনে অনেকেই জিজ্ঞেস করে, “এমন নাম রাখলে কেন?” অনেকে ভাবে এটা কোন “সায়েন্টিফিক অর্গানাইজেশন “! অবশ্য প্রথমেই ”আবিষ্কার” শব্দটা মাথায় ছিলোনা। নাম খুঁজতেছিলাম। বিভিন্ন নাম মাথায়ও আসল। ‘উদাহরণ’, “স্বপ্ন তরী” এবং আরও অনেক নাম, সবগুলো এই মূহুর্তে মনেও পড়ছেনা। তারপর দেখা গেল, যেগুলো মাথায় আসছে সেগুলো কোন না কোন প্রতিষ্ঠানের নাম অথবা সংগঠনের নাম রাখা হয়ে গেছে।

হঠাৎ করে মাথায় আসল, আমরা তো মানুষের স্বপ্ন আবিষ্কার করতে চাই। বঞ্চিত মানুষের সুখ-দুঃখ আবিষ্কার করতে চাই। নতুন বাংলাদেশ আবিষ্কার করতে চাই। সে থেকেই আবিষ্কারের নামকরণ।  যার স্লোগান “স্বপ্ন তৈরির কারখানা।” 

আবিষ্কার ফাউন্ডেশনের সাথে জড়িত আছে স্কুল, কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও মেডিক্যালের শিক্ষার্থীরা। আছে কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী, যাঁরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরামর্শ, অর্থ ও সময় দিয়ে সাহায্য করে থাকেন। এখানে সবাই মনের আনন্দে কাজ করে। আবিষ্কার ফাউন্ডেশনের ভবিষ্যতে পরিকল্পনা আছে দূর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় আধুনিক ক্লিনিক স্থাপন করা ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য আধুনিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা।


আমাদের কারখানা খুব ছোট। কিন্তু স্বপ্ন তৈরির ক্ষমতা বিশাল। কারখানাটা শুরু করি বন্ধু বান্ধব মিলে। স্কুল কলেজে থাকতে আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভলান্টারি কাজ করতাম। তারও আগে একেবারে ছোট বেলায় বাবাকে দেখেছি মানুষের জন্য কাজ করতে। শীতে, বন্যায়, দুর্যোগে কিংবা অসহায় কোন পরিবার মেয়ে বিয়ে দিতে পারছেনা। অথবা কেউ হয়তো টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেনা। বাবা কোন না কোনভাবে সাহায্য করতে এগিয়ে যেতেন। প্রতি রোজার ঈদে বাবা যাকাতের লুঙ্গি, কাপড় বাড়ি বাড়ি গিয়ে দিয়ে আসতো। ২০০৩-২০০৪ সালে একবার অনেক বন্যা হল। সেবার প্রতিদিন আমার মা সাভারের গণস্বাস্থ্য থেকে রুটি, বিস্কুট, খাবার স্যালাইন নিয়ে এলাকায় অসহায় পানিবন্দি মানুষদের মাঝে বিতরণ করেছিলেন।
বিভিন্ন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনগুলোও আমাদের বাসায় গিয়ে গরিব মানুষদের ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করতো। সেই ছোটবেলা থেকেই এগুলো দেখতে দেখতে মানুষের জন্য কাজ করার একটা প্রবল ইচ্ছা ছিল। সেই ইচ্ছা থেকেই ২০১৭ সালে বন্ধুদের নিয়ে কাজ করা শুরু করলাম। আমাদের প্রথম ইভেন্ট ছিল টেকনাফে। নাম ছিল “প্রবাল দ্বীপের কষ্ট ঘুচাও”।  ঘূর্ণিঝড় মোরা আক্রান্ত এলাকায় আমরা ত্রাণ বিতরণ করলাম। সে বছরই আমরা রোজার মাঝে ধানমন্ডি লেকের পথশিশুদের মাঝে ইফতার এবং ঈদের উপহার সামগ্রী বিতরণ করলাম। 

এর পরের বছর আমরা কুড়িগ্রাম রৌমারিতে গিয়েছিলাম। পানিবন্দি অসহায় মানুষের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ  করলাম। এর মাঝে আমরা বিভিন্ন জাতীয় দিবসে ঢাকার পথশিশুদের স্কুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও খেলাধুলার আয়োজন করতে লাগলাম। তাদের মাঝে পুরষ্কার বিতরণ করে উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের চেষ্টা করলাম।

প্রতিবছর বন্যা, শীতে আমরা অসহায় মানুষের পাশে থেকে তাদের দুঃখ কষ্ট ভাগাভাগি করে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমরা গিয়েছি সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চল গাইবান্ধায়; গিয়েছি ভাষা শহীদ সালাম, রফিকের জন্মভূমিতে। আমরা ছুটে চলেছি চর থেকে চরাঞ্চলে। আমরা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে আশার প্রদীপ হয়ে জ্বলেছি। সময় পেলেই আমরা ছুটে যাই বিভিন্ন বৃদ্ধাশ্রমে। তাদের কল্পনার ছেলেমেয়ে হয়ে শুনি মনের অব্যক্ত কথা।

আবিষ্কার ফাউন্ডেশনের আরেকটি প্রজেক্ট আছে। যার নাম “সবুজায়ন বাংলাদেশ “।  আমরা এখন পর্যন্ত ৫০০০ এর উপর বৃক্ষ রোপণ করেছি। প্রথমে আমরা শুরু করেছি ভাষা শহীদদের জন্মস্থানে। এরপর আমরা যাব যারা মুক্তিযুদ্ধে লড়াইয়ের ময়দানে বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে সেই বীর সন্তানদের গ্রামে। এভাবে আমরা আস্তে আস্তে সারা বাংলাদেশে সবুজ বিপ্লব ঘটাতে চাই।

আবিষ্কার ফাউন্ডেশনের সাথে জড়িত আছে স্কুল, কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও মেডিক্যালের শিক্ষার্থীরা। আছে কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী, যাঁরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরামর্শ, অর্থ ও সময় দিয়ে সাহায্য করে থাকেন। এখানে সবাই মনের আনন্দে কাজ করে। আবিষ্কার ফাউন্ডেশনের ভবিষ্যতে পরিকল্পনা আছে দূর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় আধুনিক ক্লিনিক স্থাপন করা ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য আধুনিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা।

তাই আমরা বলি, আমাদের গল্পটা সাদামাটা, কিন্তু স্বপ্নগুলো সুবিশাল। এই স্বপ্নগুলোর পেছনে ক্রমাগত ছুটছি। সকল আবিষ্কারকদের সাথে নিয়ে মানু‌ষের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে জীবনের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত ছুটতে থাকবো, ইনশাআল্লাহ।


আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে     

আসে নাই কেহ অবনী পরে,

সকলের তরে সকলে আমরা,     

প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *