শিশুসাহিত্যিক আলী ইমাম মারা গেছেন

:: নাগরিক প্রতিবেদন ::

খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক আলী ইমাম মারা গেছেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর সোমবার (২১ নভেম্বর) শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে তার ছেলে ডা. অন্তু।

আলী ইমাম ১৯৫০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পুরো পরিবারসহ থাকতেন পুরান ঢাকার ঠাটারীবাজারে।

আলী ইমাম এ পর্যন্ত প্রায় ২০০টির মতো পুস্তক রচনা করেছেন ও ৪০টির মতো গ্রন্থ রচনা করেছেন। শিশু মনস্তত্ত্ব, রোমাঞ্চ এবং মানবতা ধরনের বিষয় তার কাহিনিতে উঠে এসেছে।তিনি সহজ সরল ভাষায় লিখেন। তার লেখায় বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি, রোমাঞ্চকর উপন্যাস ও ইতিহাস সংশ্লিষ্ট রচনা লক্ষ্যণীয়। আলী ইমাম বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাব্যবস্থাপক ছিলেন এবং ২০০৬ সালে চাকরি থেকে অবসরগ্রহণ করেন।

বাংলাদেশের শিশু সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য আলী ইমাম বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (২০০১) এবং শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০১২) ছাড়াও অনেক পুরস্কার লাভ করেছেন।

কর্মজীবনের শেষদিকে একাধিক স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন (২০০৪-২০০৬) ও অধুনালুপ্ত চ্যানেল ওয়ানের (২০০৭-২০০৮) মহাব্যবস্থাপক ছিলেন।

১৯৯৮ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি ইউনিসেফের ‘মা ও শিশুর উন্নয়নে যোগাযোগ কার্যক্রম প্রকল্প’-এর পরিচালক ছিলেন। ওই দায়িত্ব পালনকালে তিনি অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন, জার্মানির মিউনিখ, ব্রাজিলের রিওতে অনুষ্ঠিত ‘চিলড্রেন মিডিয়া সামিটে’ যোগদান করেছিলেন। মিউনিখে অনুষ্ঠিত ‘প্রি জুঁনেসি চিলড্রেনস টিভি প্রোডাকশন প্রতিযোগিতা’র (২০০০) জুরির দায়িত্বও তিনি পালন করেছিলেন।

তিনি ছিলেন ‘সার্ক অডিও ভিজুয়াল বিনিময় অনুষ্ঠানে’র প্রধান সমন্বয়কারী (২০০০-২০০১)। টেলিভিশন ও বেতারে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের নির্মাতা ও উপস্থাপক হিসেবে তিনি সবিশেষ প্রশংসা কুড়িয়ে ছিলেন।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘হ্যালো, আপনাকে বলছি’ (১৯৯৯-২০০৪) নামে তার উপস্থাপিত সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিখ্যাত প্রামাণ্য শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া’রও (১৯৮০-১৯৮৭) প্রযোজনা করেছিলেন তিনি।

বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য আলী ইমাম ২০০১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিলেন। ২০১২ সালে পেয়েছিলেন শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার। এছাড়া তিনি ইকো সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৭), নেধুশাহ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৭), লেখিকা সংঘ পুরস্কারও (১৯৯০) অর্জন করেছিলেন।

শিশুসাহিত্যিক হিসেবে জাপান ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে ২০০৪ সালে তিনি জাপান পরিভ্রমণ করেছিলেন।

আলী ইমামের শিশুসাহিত্য চর্চার শুরু শৈশব থেকেই। ১৯৬৮ সালে তিনি তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান শিক্ষা সপ্তাহে বিতর্ক ও উপস্থিত বক্তৃতায় চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৮৬ সালে ইউনেস্কো আয়োজিত শিশুসাহিত্য বিষয়ক প্রকাশনা কর্মশালায়ও অংশ নেন। এছাড়া বাংলাদেশ স্কাউটসের প্রকাশনা বিভাগের ন্যাশনাল কমিশনারেরও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

শিশুসাহিত্য ছাড়াও তিনি গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ফিচার, ভ্রমণকাহিনি, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি লিখেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ ও গবেষণা গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে সোনালী তোরণ (১৯৮৬), আলোয় ভুবন ভরা (১৯৮৭), দুঃসাহসী অভিযাত্রী (১৯৮৮), সেসুলয়েডের পাঁচালী (১৯৯০), রক্ত দিয়ে কেনা (গল্প ১৯৯১)। তাঁর কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ধলপহর (১৯৭৯), হিজল কাঠের নাও (১৯৮৬), তোমাদের জন্যে (১৯৯৪)। শিশুসাহিত্য রয়েছে দ্বীপের নাম মধুবুনিয়া (গল্প, ১৯৭৫), অপারেশন কাঁকনপুর (উপন্যাস, ১৯৭৮), তিরিমুখীর চৈতা (রহস্য উপন্যাস, ১৯৭৯), রুপোলী ফিতে (গল্প, ১৯৭৯), শাদা পরী (গল্প, ১৯৭৯)। কিশোর উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে রক্তপিশাচ তিতিরোয়া (১৯৮৬), ভয়াল ভয়ঙ্কর (১৯৮৭), নীল শয়তান (১৯৮৭), ভয়ঙ্করের হাতছানি (১৯৯০), রক্তপিশাচ (১৯৯০), ইয়েতির চিৎকার (১৯৯০), নীল চোখের ছেলে (১৯৯২)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *