বাংলা চলচ্চিত্রের মেগাস্টার উজ্জ্বল

বাংলা চলচ্চিত্রের মেগাস্টার উজ্জ্বল

:: ফজলে এলাহী ::

আজকের সিনেমা দর্শকরা তামিলের রজনীকান্তকে দেখে বিস্মিত হয়। অথচ আমার কিশোর বেলায় এই রজনীকান্তের চেয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের ‘মেগাস্টার উজ্জ্বল’ কে বেশি ভালো লাগতো। একসময় আমরা যে শান্তশিষ্ট, রোমান্টিক সব চলচ্চিত্রে উজ্জলকে চিনতাম সেই উজ্জ্বল ৮০র দশকে হয়ে গেলেন সম্পুর্ন ব্যতিক্রম।সাদাকালো সিনেমার যুগের উজ্জ্বল আর ৮০-৯০ দশকের রঙ্গিন চলচ্চিত্রের উজ্জ্বলকে দেখলে কেউই মেলাতে পারবে না।ব্যক্তিগত ভাবে আমি নিজেও একসময় মনে করতাম বুলবুল আহমেদ ও উজ্জ্বল হলো আপন দুই ভাই, যারা কখনও সিনেমায় মারপিট করতে জানে না ও পারবেও না। কিন্তু সবাইকে বিস্মিত করে সেই উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলেন পর্দা কাঁপানো দুর্ধর্ষ নায়ক যাকে দেখলে ভিসিআরে বোম্বের রজনীকান্তের সিনেমা দেখা লাগেনা।৮০র দশকে মাঝামাঝি সময়ে সিনেমা হলে উজ্জ্বলের সিনেমা মুক্তি পেলেই দর্শকরা বলতো ‘ গরম ছবি আইছে’ । অর্থাৎ বিশাল বাজেটে নির্মিত মারমার কাটকাট উজ্জ্বলের সিনেমা হলে আসছে যা দেখতে গেলে হলের ভেতর বা বাহিরে কোন না কোন গন্ডগোল বাঁধবেই।

আশরাফ উদ্দিন উজ্জ্বল যাকে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের ‘মেগাস্টার’ বলা হতো । আমরা যারা ৮০ ও ৯০ দশকের সিনেমা হলের দর্শক তাঁদের কাছে উজ্জ্বল মানেই বিশাল ক্যানভাসে নির্মিত জমজমাট কোন চলচ্চিত্র । উজ্জ্বল ছিলেন আমাদের কাছে ভারতের রজনীকান্তের মতো একেবারে ব্যতিক্রম কোন নায়ক । মজার ব্যাপার হচ্ছে উজ্জ্বলকে কেন ‘মেগাস্টার’ বলা হয় সেটা আজো অনেকের কাছে পরিস্কার না বা বোধগম্য নয়। সংক্ষেপে আমি সেই প্রশ্নের উত্তরটা দেয়ার করছি ।

১৯৪৬ সালের ২৮ শে এপ্রিল সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে জন্ম নেয়া উজ্জ্বল ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে এম এ পাশ করেন । বিশ্ববিদ্যালয়ের থাকালিন সময়েই উজ্জ্বল মঞ্চ নাটক করতেন এবং ১৯৬৭ – ১৯৭০ সাল পর্যন্ত টেলিভিশনের নাটকেও অভিনয় করতেন । নাটক দেখেই ১৯৭০ সালে সুভাষ দত্ত উজ্জ্বল কে ‘বিনিময়’ চলচ্চিত্রে কবরীর বিপরীতে সর্বপ্রথম চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন । ‘বিনিময়’ চলচ্চিত্র দিয়ে অভিষেকেই সফল হওয়া উজ্জ্বল। কবরী থেকে শুরু করে অঞ্জু ঘোষ পর্যন্ত যেসব নায়িকা ছিলেন তাদের সবার বিপরীতেই তিনি অভিনয় করেছিলেন।উজ্জ্বলের প্রথম নায়িকা হলেন কবরী। ‘বিনিময়’ ছবিতে কাজ করার জন্য উজ্জ্বলকে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে যেতে হয়। সেখানে কবরীর সঙ্গে তার প্রথম পরিচয়। ‘বিনিময়’ ছবিটি উজ্জ্বলকে অসম্ভব খ্যাতি দিয়েছিল। ছবিতে কবরী ছিলেন বোবা। উজ্জ্বল ভাবতো, লজ্জায় বুঝি মেয়েটি কথা বলছে না। রুপালি পর্দায় উজ্জ্বল ও কবরীর বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। বিয়ের পরে উজ্জ্বল জানতে পারে কবরী বোবা। তারপর শুরু হয় দ্বন্দ্ব। এরকম দ্বন্দ্বময় ও জটিল চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকের মনে ভীষণভাবে দাগ কাটেন।

অভিনয় জীবনে দ্বিতীয় নায়িকা হলেন নাসিমা খান। সিনেমাটি ছিলো মোহসীন পরিচালিত ‘মেঘের পরে মেঘ’। ১৯৭০ সালে এই ছবির শুটিংয়ে অংশ নেয়ার জন্য তাকে পাকিস্তানের মারীতে যেতে হয়। পাহাড় আর বরফের মধ্যে সেই শুটিংয়ের দিনগুলো নাকি এখনও উজ্জ্বলকে পুলকিত করে। এ সম্পর্কে উজ্জ্বল একবার বলেছিলেন, লাহোরের কে এম স্টুডিওতে প্রথম নাসিমা খানের সঙ্গে দেখা এবং সেখানেই পরিচয় হলো। ‘মেঘের পরে মেঘ’ ছবির প্রযোজক নাসিমা খান নিজেই ছিলেন। তিনি তখন নায়িকা হিসেবে খ্যাতির তুঙ্গে। একই সঙ্গে উনার ‘সেক্স সিম্বল’ হিসেবে ইমেজ ছিল। সেক্স সিম্বলকে সেদিন বাস্তবে দেখে তা মনে হয়নি। মনে হয়েছিল রুচিশীল পরিমার্জিত। এরপর অভিনয় করেন ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ , ‘ইয়ে করে বিয়ে’ , ‘স্বীকৃতি’, ‘অনুভব’ , ‘বলাকামন’, ‘সমাধান’ , ‘ দুটি মন দুটি আশা’, ‘অপরাধ’, ‘অপবাদ’, ‘বেদীন’, ‘অনুরাগ’, ‘মহেশখালীর বাঁকে’ ‘বন্ধু’, ‘সমাধি’, ‘রুপালি সৈকতে’, ‘লালকাজল’, ‘অচেনা অতিথি’, ‘দাবি’, ‘দোস্তি’ সহ দারুন সব কালজয়ী ক্লাসিক চলচ্চিত্রগুলোতে।

ববিতার বিপরীতে তিনি প্রথম ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’তে প্রথম অভিনয় করেন। এ ছবিটি ১৯৭২ সালে মুক্তি পায়। পরবর্তী সময়ে শনিবারের চিঠি, অপরাধ, অপবাদসহ আরও কয়েকটি ছবিতে উজ্জ্বল ও ববিতা রোমান্টিক দৃশ্যে অংশ নেন। ওই সময় তাদের জড়িয়ে পত্র-পত্রিকায় বিভিন্ন মুখরোচক সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে, যা সত্যি কি মিথ্যা এ ব্যাপারে দীর্ঘ ৩৫ বছর পরেও উজ্জ্বল মুখ খুলতে নারাজ। তবে সেদিনের দর্শকরা আজও উজ্জ্বল ও ববিতার রোমান্সের কথা ভুলে যাননি।

যে উজ্জ্বলকে দর্শক প্রায় নিয়মিত মিস্টি রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্পের অভিনয়ে দেখতে অভ্যস্ত সেই উজ্জ্বল যেন ৮০র দশকের শুরুতেই সম্পূর্ণ বদলে যান। মমতাজ আলী পরিচালিত ও উজ্জ্বল প্রযোজিত ‘নসীব’ , ‘নালিশ’, ‘নিয়ত’, ‘ঈমান’ সহ টানা ৪টি চলচ্চিত্রে আগের উজ্জ্বল কে দর্শকরা দেখে সম্পূর্ণ ভিন্নরূপে ও ‘ড্যাশিং’, ‘রাফ এন্ড টাফ’ চরিত্রে। নতুন উজ্জলের টানা তিনটি চলচ্চিত্র হয়ে যায় সেই সময়ের মেগাহিট চলচ্চিত্র। এরপর থেকেই উজ্জ্বল মানেই বিশাল বাজেটের সিনেমা, উজ্জ্বল মানেই মেগাহিট চলচ্চিত্র এমন একটা ধারনা প্রযোজক, পরিচালক , প্রদর্শক ও দর্শকদের মনে ধারনা জন্ম নেয়। একে একে উজ্জলের মুক্তি পায় ‘আমির ফকির’, ‘কুদরত’, ‘চোর ডাকাত পুলিশ’, ‘আমিই ওস্তাদ’ , ‘উসিলা’র মতো দারুন সফল সব চলচ্চিত্র । উজ্জ্বল নিজেকে রোমান্টিক, সামাজিক ও অ্যাকশন সব ধারার চলচ্চিত্রে নিজেকে প্রমাণ করেন ।

উজ্জ্বলের এই সফলতা ও দর্শকদের ক্রেজ দেখে সেই সময় সাপ্তাহিক চিত্রালীর সম্পাদক ও চলচ্চিত্রকার আহমেদ জামান চৌধুরী ‘মেগাস্টার উজ্জ্বল’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন এবং যেখানে আহমেদ জামান চৌধুরী উজ্জ্বলকে ‘’মেগাস্টার’’ উপাধি দেন যেমনটা তিনি এর আগে রাজ্জাক , সোহেলরানা, ইলিয়াস কাঞ্চনের মতো তারকাদের ক্ষেত্রে দিয়েছিলেন। সেই থেকে উজ্জ্বল হয়ে ‘’মেগাস্টার’’ আর মেগাহিট ব্যবসার নিশ্চয়তা দেয়া তারকা। সেই সময়ে আলমগীর, জসিম, কাঞ্চন, সোহেল রানারা যখন পর্দা কাপাচ্ছেন সেই একই সময়ে উজ্জ্বল ছিলেন একাই একশো। উজ্জ্বলের চলচ্চিত্রের সাথে যে নায়কের চলচ্চিত্র মুক্তি পাক না কেন উজ্জ্বলের সিনেমা ব্যবসা করবেই এটা ছিল নিশ্চিত। অর্থাৎ উজ্জ্বলের সাথে কাউকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হতো না। উজ্জ্বলের চলচ্চিত্রের উপর অন্য কারো চলচ্চিত্রের প্রভাব পড়তো না। ৮০র দশকের শেষ দিকে উসিলা, কারণ, বিশাল চলচ্চিত্রগুলো মেগাস্টার উজ্জ্বলের শেষ সোনালি স্বাক্ষর বহন করে যার পরে উজ্জ্বল চলচ্চিত্রে অভিনয় অনিয়মিত হয়ে যান। এখনও আমার চোখে ভাসে উজ্জ্বলের ‘’উসিলা’’ সিনেমা দেখতে টিকেট কালোবাজারিদের সাথে দর্শকদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাটা। উজ্জ্বলের চলচ্চিত্র সিনেমা হলে আসলেই দর্শকরা বলতো ‘’গরম ছবি আইছে’’ অর্থাৎ দর্শকদের টিকেট পেতে খুব বেগ হবে যা নিয়ে কোন না কোন বিশৃঙ্খলা লাগবেই ।

উজ্জ্বল অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো হলো ‘বিনিময়’, ‘মেঘের পরে মেঘ’, ‘ অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ , ‘ইয়ে করে বিয়ে’ , ‘স্বীকৃতি’, ‘অনুভব’ , ‘বলাকামন’, ‘সমাধান’ , ‘ দুটি মন দুটি আশা’, ‘অপরাধ’, ‘ অপবাদ’, ‘বেদীন’, ‘অনুরাগ’, ‘মহেশখালীর বাঁকে’, ‘বন্ধু’, ‘সমাধি’, ‘রুপালি সৈকতে’, ‘লালকাজল’, ‘অচেনা অতিথি’’, ‘দাবি’, ‘দোস্তি’, ‘আমির ফকির’, ‘ ফুলেশ্বরী’, ‘কুদরত’, ‘ঈমান’, ‘নসীব’ , ‘নালিশ’ , ‘নিয়ত’, ‘নিয়তি’, ‘আমিই ওস্তাদ’, ‘চোর ডাকাত পুলিশ’, ‘উসিলা’, ‘ বিশাল’, ‘কারণ’, ‘শক্তিপরীক্ষা’, ‘সতর্ক শয়তান’, ‘পাপের শাস্তি’, ‘তীব্র প্রতিবাদ’। আজকের চলচ্চিত্রের দর্শকরা বুঝবে না ‘মেগাস্টার উজ্জ্বল’ কে? উজ্জ্বল ছিলেন আমাদের সেই মেগাস্টার যিনি একজনই আজো আছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *