কফি হাউজের সেই আড্ডাটা : নারী-অবমানামূলক গান!

:: হাসান শরিফ ::

কলকাতার কফি হাউসকে কেন্দ্র করে রচিত কালজয়ী ‘কফি হাউজের সেই আড্ডা’ শীর্ষক গানটি মুক্তির পর থেকে আজও শ্রোতাপ্রিয় হয়ে আছে। ২০০৬ সালে বিবিসি জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাংলা গানের তালিকায় গানটি চতুর্থ স্থানে ছিল।

গানটিতে ‘সেই সাতজনের’ কাহিনী বলা হলেও বাস্তবে ছয়টি চরিত্র। বাকিজন রচয়িতা কিংবা শিল্পী নিজে। চরিত্রগুলো হলো নিখিলেশ সান্যাল, মঈদুল, ডি সুজা, রমা রায়, অমল, সুজাতা।

এদের মধ্যে তখন আর্ট কলেজের ছাত্র নিখিলেশ সান্যাল বিজ্ঞাপনের ছবি আঁকতেন। জীবন-জীবিকা কিংবা শিল্পের নেশায় শেষ পর্যন্ত তিনি প্যারিসে পাড়ি জমিয়েছেন। সাংবাদিক মঈদুল কলকাতার জীবন শেষ করে ঢাকায় একই পেশায় নিয়োজিত হয়েছেন। গিটারিস্ট ডি সুজা অকালে মৃত্যুবরণ করেছেন। ভালোবাসার মানুষের কাছে প্রতারিত হয়ে মানসিক রোগে আক্রান্ত অফিসের সোশ্যালে ‘অ্যামেচার’ নাটকের অভিনেতা রমা রায় পাগলা গারদে আছেন। ‘ব্যর্থ কবি’ অমল ক্যানসারে আক্রান্ত। আর সুজাতা সুখী বিবাহিত জীবন অতিবাহিত করছেন।

তবে ‘সুখী’ হয়েছেন কেবল সুজাতা। কথাটি জোর দিয়ে বলা হয়েছে। আর তিনি সুখী হয়েছেন কেন? কারণ, তার স্বামী লাখপতি এবং তিনি হীরে আর জহরতে মোড়া। তার গাড়ি-বাড়ি- সবকিছুই দামী। অর্থাৎ তিনি নিজের কৃতিত্বে নন, স্বামীর তরফে তিনি ধনী এবং সেইসূত্রে সুখী। এর মানে কি মেয়েরা নিজেদের যোগ্যতায় কিছু করার ক্ষমতা রাখেন না? গানে কিন্তু তার কোনো পরিচয় দেয়া হয়নি, বিশেষ কোনো গুণের কথা বলা হয়নি। একজন সুন্দরী (যদিও তিনি সুন্দরী- গানে তা বলা হয়নি)- কেবল এই যোগ্যতাতেই তিনি আড্ডাতে সামিল হতেন? তাহলে কি গানটির মাধ্যমে এ কথাই বলা হচ্ছে- নারীদের কেবল বাহ্যিক চাকচিক্য থাকলেই চলবে, ধনী একজন স্বামী বাছাই করে নিতে হবে। আর তাহলেই তিনি ‘সুখী’ পারবেন? আর প্রেমিকের গলায় ঝুলতে পারেননি বলেই রমা রায়কে পাগলা গারদে কাটাতে হচ্ছে! এটা নারীদের ‘অবলা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সচেতন চেষ্টা নাকি অবচেতন মনে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নারীদের ভোগ্যপণ্য বিবেচনা করার দলিল? সেটাই যদি হয়, তবে বাংলায় কি এর চেয়ে বেশি নারী-অবমাননামূলক কোনো গান আছে?

গানের কথা অনুযায়ী, সুজাতা ছাড়া আর কেউ ‘সুখী’ নন। নিখিলেশ প্যারিসে থাকায় ধরে নেয়া যায়, তিনি আর্থিক ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। তবে তিনি তার বর্তমান জীবন নিয়ে ‘সুখী’ বা ‘পরিতৃপ্ত’ কিনা তা গানে বলা হয়নি। মঈদুল তার প্রিয় স্থান কলকাতায় টিকতে পারেননি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা অন্য কোন কারণে তা পারেননি, তা গানে বলা হয়নি। তবে বলা যায়, তিনি নিজের কাজ নিয়ে আত্মবিশ্বাসীই ছিলেন। ঢাকায় এসেও সাংবাদিকতা করেছেন। নয়তো এত বিদগ্ধ বন্ধুদের কাছে তার রিপোর্টগুলো নিয়ে আলোচনা করতেন না। ধরে নেয়া যায়, তারাও তার সংবাদ প্রতিবেদনগুলো মনোযোগ দিয়েই শুনতেন। এমন লোকও ‘সুখী’ হতে পারেননি বলেই গানে বলা হচ্ছে। গিটারিস্ট ডি সুজার মৃত্যু কিভাবে হয়েছে, তা বলা হয়নি। তবে পরিণত বয়সের আগে মৃত্যুবরণ করায় তিনি তার প্রতিভাকে বিকশিত করতে পারেননি, তা নিশ্চিত। ফলে তিনিও ‘সুখী’ হননি। পাগলা গারদে কাটানো রমা রায়কে প্রচলিত সংজ্ঞায় কোনোভাবেই ‘সুখী’ বলা যায় না। আর কবি অমলের একটি কবিতাও ছাপা হয়নি। প্রতিভার ন্যূনতম মূল্যায়নও তিনি পাননি। হতাশায় মোড়া তার জীবন।

তবে ‘সুখী’ হয়েছেন কেবল সুজাতা। কথাটি জোর দিয়ে বলা হয়েছে। আর তিনি সুখী হয়েছেন কেন? কারণ, তার স্বামী লাখপতি এবং তিনি হীরে আর জহরতে মোড়া। তার গাড়ি-বাড়ি- সবকিছুই দামী। অর্থাৎ তিনি নিজের কৃতিত্বে নন, স্বামীর তরফে তিনি ধনী এবং সেইসূত্রে সুখী। এর মানে কি মেয়েরা নিজেদের যোগ্যতায় কিছু করার ক্ষমতা রাখেন না? গানে কিন্তু তার কোনো পরিচয় দেয়া হয়নি, বিশেষ কোনো গুণের কথা বলা হয়নি। একজন সুন্দরী (যদিও তিনি সুন্দরী- গানে তা বলা হয়নি)- কেবল এই যোগ্যতাতেই তিনি আড্ডাতে সামিল হতেন? তাহলে কি গানটির মাধ্যমে এ কথাই বলা হচ্ছে- নারীদের কেবল বাহ্যিক চাকচিক্য থাকলেই চলবে, ধনী একজন স্বামী বাছাই করে নিতে হবে। আর তাহলেই তিনি ‘সুখী’ পারবেন? আর প্রেমিকের গলায় ঝুলতে পারেননি বলেই রমা রায়কে পাগলা গারদে কাটাতে হচ্ছে! এটা নারীদের ‘অবলা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সচেতন চেষ্টা নাকি অবচেতন মনে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নারীদের ভোগ্যপণ্য বিবেচনা করার দলিল? সেটাই যদি হয়, তবে বাংলায় কি এর চেয়ে বেশি নারী-অবমাননামূলক কোনো গান আছে?

কফি হাউজের সেই আড্ডাটা : নারী-অবমানামূলক গান!
কলকাতায় কফি হাউস উত্তর কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অবস্থিত। উল্লেখ্য, ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ কলকাতায় কফি পানের প্রচলন শুরু করেছিলেন হেনরি পিডিংটন। উদ্দেশ্য ছিল, ব্রিটিশ যুবকদের মাদকের প্রতি আসক্তি কমানো। 

গানটি হলো

হুঁউম… উঁ… ম… উঁ… ম… উঁম উঁম উঁম…

কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই

আজ আর নেই

কোথায় হারিয়ে গেল সোনালী বিকেলগুলো সেই

আজ আর নেই

লারা লাল লা লাল লা লা লা লা লা, লালা লা লা

নিখিলেশ প্যারিসে, মঈদুল ঢাকাতে

নেই তারা আজ কোন খবরে।

গ্র্যান্ডের গিটারিস্ট গোয়ানিস ডিসুজা

ঘুমিয়ে আছে যে আজ কবরে।

কাকে যেন ভালোবেসে আঘাত পেয়ে যে শেষে

পাগলা গারদে আছে রমা রায়।

অমলটা ধুঁকছে দুরন্ত ক্যানসারে

জীবন করেনি তাকে ক্ষমা হায়।

কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই

আজ আর নেই।

কোথায় হারিয়ে গেল সোনালী বিকেলগুলো সেই

আজ আর নেই।

সুজাতাই আজ শুধু সবচেয়ে সুখে আছে

শুনেছি তো লাখ্ পতি স্বামী তার

হীরে আর জহরতে আগাগোড়া মোড়া সে

গাড়িবাড়ি সবকিছু দামী তার।

আর্ট কলেজের ছেলে নিখিলেশ সান্যাল

বিজ্ঞাপনের ছবি আঁকত।

আর চোখ ভরা কথা নিয়ে

নির্বাক শ্রোতা হয়ে

ডিসুজাটা বসে শুধু থাকত।

কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই

আজ আর নেই।

লারা লাল লা লাল লা লা লা লা লা, লা লা লা

একটা টেবিলে সেই তিন চার ঘন্টা

চারমিনারটা ঠোঁটে জ্বলতো

কখনো বিষ্ণু দে কখনো যামিনী রায়

এই নিয়ে তর্কটা চলতো

রোদ ঝড় বৃষ্টিতে যেখানেই যে থাকুক

কাজ সেরে ঠিক এসে জুটতাম

চারটেতে শুরু হয়ে জমিয়ে আড্ডা মেরে

সাড়ে সাতটায় ঠিক উঠতাম

কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই

আজ আর নেই

লারা লাল লা লাল লা লা লা লা লা, লালা লা লা

কবি কবি চেহারা, কাঁধেতে ঝোলানো ব্যাগ

মুছে যাবে অমলের নামটা

একটা কবিতা তার হলো না কোথাও ছাপা

পেল না সে প্রতিভার দামটা

অফিসের সোশ্যালে ‘অ্যামেচার’ নাটকে

রমা রায় অভিনয় করত।

কাগজের রিপোর্টার মঈদুল এসে রোজ

কী লিখেছে তাই শুধু পড়ত ওঃ ওঃ ওঃ

কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই

আজ আর নেই।

কোথায় হারিয়ে গেল সোনালি বিকেলগুলো সেই

আজ আর নেই।

সেই সাতজন নেই আজ টেবিলটা তবু আছে

সাতটা পেয়ালা আজও খালি নেই

একই সে বাগানে আজ এসেছে নতুন কুঁড়ি

শুধু সেই সেদিনের মালী নেই।

কত স্বপনের রোদ ওঠে এই কফি হাউসে

কত স্বপ্ন মেঘে ঢেকে যায়

কতজন এলো গেল, কতজনই আসবে

কফি হাউসটা শুধু থেকে যায়।

কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই

আজ আর নেই

কোথায় হারিয়ে গেল সোনালি বিকেলগুলো সেই

আজ আর নেই

উঁহুহুঁ লা লাল লা লা লালা লা লালা, লা লা লা

কোথায় হারিয়ে গেল সোনালি বিকেলগুলো সেই

আজ আর নেই।

***

গানটির শিল্পী : মান্না দে, কথা : গৌরী প্রসন্ন মজুমদার, সুর : সুপর্ণ কান্তি ঘোষ। ১৯৮৩ সাল।

লেখক: অনলাইন এডিটর, নয়া দিগন্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *