জেনারেল ওসমানীর দুটি ঐতিহাসিক পদত্যাগপত্র

:: মারুফ কামাল খান ::

পয়লা সেপ্টেম্বর ছিল আমাদের জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর স্থপতি জেনারেল মহম্মদ আতাউল গণী ওসমানীর জন্মদিন। মরহুম এ জেনারেলকে অবশ্য আওয়ামী লীগ কিছুদিন যাবত সর্বাধিনায়ক বলেও স্বীকার করেনা। ওরা অবশ্য সকলের অবদান অস্বীকার এবং সবার ভূমিকা খাটো করে দেখে। কাউকেই সম্মান দিতে জানেনা। তারা বলে উনি প্রধান সেনাপতি ছিলেন। আসলে মুক্তিযুদ্ধে প্রধান সেনাপতি অর্থাৎ সেনাপ্রধান বা চিফ অব আর্মি স্টাফ ছিলেন মেজর জেনারেল আবদুর রব। ওসমানী ছিলেন কমান্ডার-ইন-চিফ (সি-ইন-সি) অর্থাৎ সর্বাধিনায়ক। স্বাধীনতার পর সর্বাধিনায়ক পদ বিলুপ্ত হয়। প্রজাতন্ত্রের সংবিধান গৃহীত হবার পর সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কতা অর্পিত হয় রাষ্ট্রপতির ওপর। তবে রাষ্ট্রপতিকে ইংরেজিতে সি-ইন-সি না বলে সুপ্রিম কমান্ডার বলার বিধান করা হয়।

গোড়া থেকেই শুরু বিকৃতি

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস স্বাধীনতার পর থেকেই বিকৃত করা শুরু হয়। আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে নানান ব্যাখ্যা দেয়া শুরু হয়। পাকিস্তান আমলে আমাদের অঞ্চলে সোহরাওয়ার্দী-মুজিবের আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী ধারায় যে রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে ওঠে তার লক্ষ্য ছিল, পাকিস্তানের ফেডারেল কাঠামোর আওতায় পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন। আর মওলানা ভাসানী ছিলেন লাহোর প্রস্তাব ভিত্তিক দুই পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিদার। তাই তিনি গোড়া থেকেই পাকিস্তানকে আসসালামু আলাইকুম বা বিদায় জানাবার কথা বলে আসছিলেন।

এলএফও বনাম ছয় দফা

পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের ছাত্র-যুবকদের মধ্যে স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জনের আকাঙ্ক্ষা গড়ে ওঠে এবং তার ভিত্তিতে গোপন কার্যক্রমও চলতে থাকে। তবে মূলধারা ছিল ছয় দফা ভিত্তিক স্বায়ত্বশাসনের পক্ষে। স্বাধীনতাকামী ভাসানীর দলের বর্জনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত ১৯৭০এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়ের পর দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতায় যাবার উদ্যোগ আয়োজন শুরু করে। কিন্তু গোল বাধে স্বায়ত্বশাসন বাস্তবায়নে ছয় দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনা নিয়ে। আ.লীগ সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খাঁর জারি করা লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার (এলএফও) মেনে এর আওতায় নির্বাচনে অংশ নেয়। তাতে বিধান ছিল পাকিস্তানের উভয় অংশের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সম্মতির ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচিত হবে।

অসহযোগ ও আলোচনা

ভোটের পর মুজিব বললেন, “ছয় দফার পক্ষে ম্যান্ডেট পেয়েছি। শাসনতন্ত্র হবে এর ভিত্তিতে।” ভুট্টো বললেন, “পরিস্কার স্লেট চাই। মুজিব শর্ত চাপিয়ে দিচ্ছেন। তার কথা প্রত্যাহার না করলে আমরা এসেম্বলিতে যাবো না।” এ দ্বন্দ্ব আলোচনা করে নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়ে ইয়াহিয়া তার ডাকা অধিবেশন স্থগিত করে দেন। আ.লীগ এর বিরুদ্ধে অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি দিয়ে পাশাপাশি আলোচনা চালাতে থাকে।

অপারেশন সার্চলাইট

আলোচনার নামে সময়ক্ষেপনের এই অপকৌশলের আড়ালে পাকিস্তানি সমরজান্তা সৈন্য ও অস্ত্র আনতে থাকে। তারপর আন্দোলন দমাতে নৃশংস সামরিক অভিযান চালাবার অনুমতি দিয়ে ইয়াহিয়া খাঁ বিনা ঘোষণায় গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। শেখ সাহেবের আলোচনায় অগ্রগতির আশাকে অলীক প্রমাণ করে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের নৃশংস হত্যার অভিযান শুরু করে পাকিস্তানি ফৌজ। ২৫ ও ২৬ মার্চের মধ্যবর্তী রাতের এই অভিযানের প্রাক্কালে তাজউদ্দীন, ওসমানী সহ অনেকেই শেখ মুজিবকে গুপ্তস্থানে আত্মগোপনের পরামর্শ দেন। স্বাধীনতা ঘোষণার আহ্বানও জানান। তিনি রাজি হননি। নিজের বাসায় বসে তিনি গ্রেফতার বরণ করেন। তাজউদ্দিন, ওসমানীদের বাসায় হামলার পূর্বাহ্নে তারা পালিয়ে আত্মগোপনে সক্ষম হয়।

অসহায় জনগণ

ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের সিভিলিয়ান এলাকায় আক্রমণ রুখতে আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবকরা ও সাধারণ মানুষ গাছের গুঁড়ি ফেলে পথে ব্যারিকেড দেয়ার চেষ্টা করে। নির্বিচারে গুলি করে তাদেরকে পাখির মতন হত্যা করে পাকিরা। এরপর তারা পিলখানা, রাজারবাগ, ঢাকা ভার্সিটি, তাঁতীবাজার, শাঁখারিপট্টি, বিরোধী সংবাদপত্র অফিস সহ টার্গেটেড বিভিন্ন স্পটে অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকান্ড চালায়। কোনো দিক-নির্দেশনা না থাকায় জনগণ দিশেহারা হয়ে পড়ে।

জিয়ার ঘোষণা

এ অবস্থায় চট্টগ্রামে মেজর জিয়ার নেতৃত্বে চট্টগ্রামে বেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ করে। তিনি ও তাঁর সহযোগীরা পাকিস্তানি সেনা ও অফিসারদের পাকড়াও করেন। বিপ্লব উদ্যাণে দাঁড়িয়ে ২৬ মার্চ প্রত্যুষে তিনি স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। পরদিন কালুরঘাট বেতার থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়ে আন্তর্জান্তিক সাহায্য-সমর্থনের আহ্বান জানান। এতে হানাদারদেরকে প্রতিরোধ করার লড়াই সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে উন্নীত হয়। বেঙ্গল রেজিমেন্টের অন্যান্য ইউনিট, পুলিশ, ইপিআর ও আনসার সদস্যরাও যুদ্ধ শুরু করে। ছাত্র-যুবকে ও প্রাক্তণ সৈনিকেরাও বিভিন্ন স্থানে অস্ত্র জোগাড় করে যুদ্ধে নেমে যায়।

তেলিয়াপাড়া: ইতিহাসের মোড়

এপ্রিলের শুরুতে বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার তেলিয়াপাড়া চা বাগানে যুদ্ধের কমান্ডাররা জেনারেল ওসমানীর সভাপতিত্বে এক বৈঠকে মিলিত হন। সে বৈঠকে জিয়া ছাড়াও কর্নেল রব, সি আর দত্ত, আবু ওসমান চৌধুরী, শফিউল্লাহ্, খালেদ মোশাররফ, নুরুজ্জামান, মইনুল হোসেন চৌধুরী, শাফায়াত জামিল সহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। সেই বৈঠকেই মুক্তিফৌজ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। জেনারেল ওসমানীকে মুক্তিফৌজের সর্বাধিনায়ক করে সেক্টর বিভাজন ও অধিনায়কদের নিযুক্ত করা হয়। বৈঠকে অস্ত্র সংগ্রহ ও আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভের ওপর জোর দেয়া হয়। এ লক্ষ্যে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে জেনারেল ওসমানীকে এ ব্যাপারে যোগাযোগ স্থাপনের দায়িত্ব দেয়া হয়।

প্রবাসী সরকার

এরই ধারাবাহিকতায় অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, বিবদমান আওয়ামী নেতাদেরকে নানান কনসেশান দিয়ে, কখনো হুমকি ধামকি দিয়ে সমঝোতায় বাধ্য করে ১০ এপ্রিল আগরতলায় প্রবাসী সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলার সীমান্তবর্তী আম্রকাননে দেশী-বিদেশী সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে সেই সরকারের শপথ গ্রহন ও অভিষেক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সেই সরকারের তরফ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণার সনদপত্রও পাঠ করা হয়৷ মোট কথা, আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধীনতার লক্ষ্যে নিয়মতান্ত্রিক গণসংগ্রাম পরিচালনা করেছেন। ছাত্র-তরুণ ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা এক্ষেত্রে তাদের চেয়েও অগ্রণী ছিলেন। নির্বাচনের পর খুব যৈক্তিক ভাবেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নেতারা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ক্ষমতাপ্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু তাদের স্বায়ত্বশাসনের প্রয়াসকেও পাকিস্তানি সমরজান্তা অস্ত্রের ভাষায় দমনের চেষ্টা করলে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েন।

রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে সশস্ত্র যুদ্ধ

আসলে পাকিস্তানিরা আক্রমণ করে রাজনৈতিক দাবিকে দমাতে চেয়েছে। এই আক্রমণকে পাইকারি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রূপ দিয়ে তারা জাতির ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল। বিদ্রোহ করে আমাদের সৈনিকেরাই সেই যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ গ্রহন করেন। গণতান্ত্রিক রাজনীতিবিদদের রাজনৈতিক আন্দোলনই করার কথা। তারা তাই করেছেন। যুদ্ধ চাপলে সেটা মোকাবিলা হচ্ছে সৈনিকতার কাজ। কাজেই যুদ্ধের সূচনা ও মোকাবিলা আমাদের সৈনিকেরাই করেছেন। তারাই যুদ্ধরত অবস্থায় মুক্তিফৌজ গড়েছেন। এর সর্বাধিনায়ক ও সেক্টর কমান্ডারদের দায়িত্ব বন্টন করেছেন। তাদের অভিপ্রায় ও চেষ্টায় প্রবাসী সরকার গঠিত হয়েছে। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধ প্রবাসী সরকারের সৃষ্টি নয়। মুক্তিযোদ্ধারাই প্রবাসী সরকার সৃষ্টির নিয়ামক। মুক্তিফৌজ আগে এবং প্রবাসী সরকার পরে গঠিত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের কার্যক্রমকে পরে প্রবাসী সরকার অনুমোদন দিয়েছে ও সমন্বয় করেছে। ১১ এপ্রিল মুক্তিফৌজকে মুক্তিবাহিনী নামকরণের সিদ্ধান্ত হয়।

তাজউদ্দীনের বিদায় এবং

স্বাধীনতার পর পাকিস্তানে ক্যু হয়। সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে হটিয়ে পাকিস্তানি ফৌজ গদিতে বসায় সিভিল রাজনীতিবিদ ভুট্টোকে। যেমন ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে বেসামরিক রাজনীতিবিদ মোশতাক ও পরে জাস্টিস সায়েমকে সামরিক প্রেসিডেন্ট করা হয়েছিল। যা হোক, ভুট্টো শেখ মুজিবকে মুক্তি দেন। তিনি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি মুক্ত স্বদেশে ফিরে তাজউদ্দীনকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রী হন। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের কেন্দ্রীয় চরিত্র তাজউদ্দীনকে ১৯৭৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব অর্থমন্ত্রীর পদেও ইস্তফা দেয়ার নির্দেশ দিয়ে চিঠি দেন। তাজউদ্দিন সেই নির্দেশ মেনে সরকার থেকে সরে দাঁড়ান। প্রায় কাছাকাছি সময়ে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানীও মন্ত্রিসভা ও জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন।

প্রথম পদত্যাগপত্র

জেনারেল ওসমানী তাঁর এই পদত্যাগপত্র নিজেই প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন। পত্রে তাঁর পদত্যাগের কারণ স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়। পদত্যাগপত্রটি নিম্নরূপ:

১ মে ’৭৪

আমার প্রিয় বঙ্গবন্ধু,

অনুগ্রহ করে স্মরণ করবেন যে, উপমহাদেশের রাজনীতি চর্চায় ‘কপটতার’ প্রকোপ ডিজরাইলীর ভাষায় ‘ডিসসিমুলেশন’ আরো স্পষ্ট বলতে গেলে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান থাকার কারণেই ১৯৭০ সনে আমি রাজনীতিতে যোগদানের ব্যাপারে ঘোরতর অনিচ্ছুক ছিলাম। জাতীয় চাহিদা এবং আশা-আকাঙ্খা অনুযায়ী আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বার্থে আমার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজনীয়তার উপরে আপনি জোর দিয়েছিলেন। বিশেষ করে সামরিক ক্ষেত্রে সৈনিকদের অধিনায়কত্ব এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিকল্পনায় আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ফলে পার্টি একজন সামরিক উপদেষ্টা লাভ করবে বলে জাতির সেবায় আমাকে আপনার সঙ্গে যোগদানের জন্য চাপ দিয়েছিলেন। বাঙ্গালীদের স্বার্থ ও আশা-আকাঙ্খার প্রশ্নে আপনি কখনও আপস করেননি। তাই আপনি এবং আওয়ামী লীগ সমাজতন্ত্র ও সংসদীয় গণতন্ত্রের মাধ্যমে ব্যক্ত জনগণের সার্বভৌমত্ব, দেশরক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের জন্য সংগ্রাম করবেন এমন নিশ্চয়তা প্রদানের পরই আমি রাজনীতিতে যোগদান করি। এটাও নিশ্চয়ই আপনার স্মরণ আছে যে, আমি বলেছিলাম ইংরেজী ‘পলিটিকস’ শব্দ বলতে আমি রাজনীতির পরিবর্তে গণনীতি বুঝে থাকি।

(২) তখন থেকে আমার অতীত জীবনের মতোই নিঃস্বার্থভাবে পূর্বোল্লিখিত আদর্শ বাস্তবায়নে আত্মনিয়োগ করি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গণপ্রতিনিধি, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ও পরবর্তীকালে সংসদ সদস্য এবং জাহাজ ও বেসামরিক বিমান পরিবহনকে কার্যকরী, সাংগঠনিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তিতে গড়ে তোলা এবং দেশের প্রধান প্রধান নৌ-পথগুলোর নাব্যতা রক্ষা ও নৌ-পথ পুনরুদ্ধার করার মহান দায়িত্বে নিযুক্ত মন্ত্রী হিসেবে আমি দেশ ও জাতির সেবা করেছি। এসব ক্ষেত্রে উৎসর্গীকৃত অফিসার কর্মচারীদের সহায়তায় আমি দেড় বছরের মধ্যে আপ্রাণ চেষ্টা করেছি এবং অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জনে সক্ষম হয়েছি। তবে আমার বলার উদ্দেশ্য এটা নয়, আমার উদ্দেশ্যে হলো – এ সময় আমি লক্ষ্য করেছি যে, কতিপয় মারাত্মক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে না হলে এ ক্ষেত্রে আরো অধিক সাফল্য অর্জন সম্ভব ছিল।

(৩) মন্ত্রিসভা ও সরকারের সদস্যরূপে আপনার প্রতি – আপনি মন্ত্রিসভার নেতা ও সরকার প্রধান – আন্তরিকতা ও আনুগত্য আমার একান্ত কর্তব্য। তদনুযায়ী আমি মৌখিকভাবে আপনাকে জানিয়েছিলাম যে, নিম্নলিখিত দুঃখজনক পরিস্থিতিতে যে আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আমি দলে যোগ দিয়েছিলাম তার কার্যকরী ও বলিষ্ঠ বাস্তবায়ন করতে অক্ষম বোধ করছি।

ক॥ অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নতির ধারা অক্ষুন্ন রাখার স্বার্থে একান্ত প্রয়োজনীয় ও জরুরী বিষয় যথা : নীতি, নিয়োগ, অপসারণ ইত্যাদি বিষয়ে সিদ্ধান্তের অনুমোদন স্থগিত রাখা এসব বিষয়ে অগ্রগতির জন্যে আমাদের সমগ্র প্রচেষ্টা ব্যাহত হচ্ছে।

খ॥ আমাদের প্রতিশ্রুত নীতির পরিপন্থী ব্যক্তিবিশেষ বা কায়েমী স্বার্থের প্রবক্তাদের দ্বারা সহজে বিভ্রান্ত হয়ে আমরা দলগতভাবে এবং সরকার হিসেবে দুর্নামের ভাগী হচ্ছি।

গ॥ আপাতঃ দৃষ্টিতে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের নির্দিষ্ট নীতির অভাবে বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে আমরা আমাদের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছি। শহীদদের পরিবার ও প্রাক্তন সামরিক ব্যক্তিদের উপেক্ষা প্রদর্শন করা হয়েছে ; যদিও এসব উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ ও নিবেদিত প্রাণ অফিসার এবং সামরিক ব্যক্তিদের ব্যতিরেকে বাংলাদেশের উদ্দীপ্ত সামরিক শৌর্যবীর্য ও ঐতিহ্য ফিল্ড মার্শাল আইয়ূব ও তার পাঞ্জাবী জেনারেলদের প্রবল বিরোধিতার মুখে পঁচিশ বছরে গড়ে উঠতো না। এমনকি আপনার আহ্বানে মুক্তিযুদ্ধের অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রারম্ভকাল হতে তাদের দৃঢ় সংকল্প ও শৌর্য-বীর্যময় যুদ্ধছাড়া মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ করা সম্ভব হতো না। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় বাঙ্গালী প্রতিরক্ষাবাহিনী নির্জীব ও হতাশ হয়ে পড়েছে।

ঘ॥ জনগণের শ্রদ্ধা নেই এমন বিতর্কিত ব্যক্তিদের দলে স্থান দেয়া।

ঙ॥ দেশের জন্য সংসদীয় গণতন্ত্রের ব্যবস্থাপনারই একটি সুষ্ঠু সংবিধান যা ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসের নির্বাচনে জনগণ কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে, তার বিধান ও তাৎপর্য বাস্তবায়িত হোক – এটা কাম্য হওয়া সত্ত্বেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে যে, নীতি ও সিদ্ধান্ত প্রণয়নে তার কোনো অংশ নেই।

(৪) এই দুঃখজনক পরিস্থিতিতে আমি আপনাকে অনুরোধ করছি যে, মন্ত্রী পরিষদের সদস্য ও সেই সঙ্গে সংসদ সদস্য পদ থেকে আমার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করুন এবং তা গ্রহণের জন্য প্রেসিডেন্টের প্রতি সুপারিশ জানান।

(৫) এবং এরই সঙ্গে আপনার ও মন্ত্রিসভার অন্যান্য বিশিষ্ট সদস্যদের কাছ থেকে যে সম্মান ও সৌজন্য আমি পেয়েছি সেজন্য আমাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে দিন। কারণ, আপনার অনুপস্থিতিতে তারাই আমাদের ইতিহাসের অগ্নিপরীক্ষায় মুহূর্তে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে রাজনৈতিক উপদেশ ও সমর্থন দিয়ে আমাকে সর্বাধিনায়কের দুর্বহ কর্তব্য পালনে সক্ষম করেছিলেন। আমি জাতীয় সংসদের মাননীয় সদস্যদের নিকটও কৃতজ্ঞ তাঁরা আমাকে বিশেষ বিবেচনা ও সম্মান প্রদর্শন করেছেন।

ব্যরিস্টার মইনুলকে হেনস্তা

জেনারেল ওসমানীর এই পদত্যাগপত্র অনেকদিন ঝুলিয়ে রেখে কেবল মন্ত্রিসভা থেকে তার পদত্যাগ ১৯৭৪ সালের জুন মাসে গৃহীত হবার কথা জানানো হয়। ১৯৭৫ সালের ১৮ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান দেশে একদলীয় বাকশাল পদ্ধতি প্রবর্তনের পরিকল্পনার কথা জানান। নূরে আলম সিদ্দিকী সহ দু-এক জন সদস্য ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কিছু বলার চেষ্টা করলে শেখ সাহেব ধমক দিয়ে থামিয়ে দেন। ইত্তেফাকের ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন না থেমে বক্তৃতা অব্যাহত রাখলে সভাস্থলেই শারিরীক ভাবে লাঞ্ছিত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ, আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক সরদার আমজাদ হোসেন ‘সিআইএর এজেন্ট’ বলে উল্লেখ করে টেনে তার পাঞ্জাবি ছিঁড়ে ফেলেন। আতঙ্কিত মইনুল দৌঁড়ে আত্মরক্ষার্থে শেখ সাহেবের পেছনে গিয়ে দাঁড়ান। প্রধানমন্ত্রী তাঁর দেহরক্ষী মহিউদ্দিনকে নির্দেশ দেন মইনুলকে নিরাপদে গাড়িতে তুলে দিতে। মইনুল হোসেন পদত্যাগ করারও অবকাশ পাননি। বাকশাল-এ যোগ না দেয়ায় তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়ে যায়।

বঙ্গবন্ধু থেকে ‘মুজিব খান’

এই পরিবেশে আর কারো পক্ষে বাকশাল বিরোধিতা অসম্ভব হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই অসম্ভব দুঃসাহসের কাজটাই করেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী। তিনি তীক্ষ্ণ যুক্তিতর্ক পেশ করে একদলীয় বাকশাল পরিকল্পনার বিরোধিতা করে দীর্ঘ ভাষণ দেন। উপসংহারে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রিয় এদেশের মানুষ আইউব খান, ইয়াহিয়া খানকে বরদাশত করেনি। সেই জনগণের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আপনি বঙ্গবন্ধু হয়েছেন। কিন্তু গণতন্ত্র করে যদি আপনি বাকশাল করেন তাহলে আপনিও আর বঙ্গবন্ধু থাকবেন না, মুজিব খানে পরিণত হবেন। এদেশের মানুষ মুজিব খানকেও বরদাশত করবে না।

দ্বিতীয় পদত্যাগপত্র

জেনারেল ওসমানীর এ বক্তব্য আমলে নেয়া হয়নি। ২১ এপ্রিল আবারো আওয়ামী পার্লামেন্টারি পার্টির সভায় এ প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে এ ব্যাপারে একক সিদ্ধান্ত গ্রহনের সর্বময় ক্ষমতা দেয়া হয়। এর প্রতিবাদে জেনারেল ওসমানী তাদের বক্তব্যের আলোকে সংক্ষিপ্ত বিবৃতি পেশ করে সভা বর্জন করে বেরিয়ে যান। পরদিন তিনি সংসদ সদস্যপদ ও দল থেকে ইস্তফা দেন। তাঁর দ্বিতীয় পদত্যাগপত্রটি নিম্নরূপ:

জেনারেল এম.এ.জি ওসমানী, পিএসসি (অবসরপ্রাপ্ত)

১৯, ডি.ও.এইচ.এস

ঢাকা সেনানিবাস।

ডি ও নং-০০১৪

২২ জানুয়ারী ১৯৭৫

আমার প্রিয় বঙ্গবন্ধু,

১৯৭৫ সনের ২১ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারী পার্টির সভার পর আপনার নিকট আমার মৌখিক বক্তব্যের সমর্থনে এই চিঠি লিখছি। আপনি অবগত আছেন যে, উক্ত সভায় নিন্মলিখিত কারণে সংবিধানের আমূল পরিবর্তনের জন্য গৃহীত সংশোধনীর পক্ষে আমি ভোট প্রদান করিনি।

॥ক॥ তা করলে আমি আমার বিশ্বাস ও বিবেকের বিরুদ্ধে কাজ করতাম।

॥খ॥ এই সংশোধনীর অর্থ হলো জনগণের কাছে প্রদত্ত আমাদের দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি এবং বস্তুুত জনগণ ১৯৭৩ সনের সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে যে শাসনতন্ত্রের বিষয়বস্তুু অনুমোদন করেছে, তার সাথে প্রতারণা করা।

(২) উপরোক্ত কারণসমূহের জন্য আগামী ২৫ জানুয়ারী ১৯৭৫ সালে এই সংশোধনী প্রস্তাব জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হলে আমি তাতে সম্মতি প্রদানে অক্ষম। সংসদের দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে একটা অপ্রীতিকর দৃশ্যের অবতারণা এড়ানোর জন্যই আমি বিনয়ের সঙ্গে একযোগে সংসদ সদস্যপদ ও দলীয় সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করছি।

(৩) পরিশেষে আমি এটাই কামনা করছি যে, বঙ্গবন্ধু আপনি এবং আওয়ামী লীগ জাতির সেবায় সাফল্য লাভ করুন। আল্লাহ আপনাকে দেশ ও জনগণের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিধানে পথ প্রদর্শন ও সাহায্য করুন। যে দেশ ও জনগণের স্বার্থকেই আমি বারবার সবার ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছি এবং আনুগত্য সহকারে নিঃস্বার্থভাবে সেবা করেছি।#

বানোয়াট গল্প ও দায়

জেনারেল ওসমানী এখন প্রায় বিস্মৃত একটি নাম। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের লগ্নে পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে তাঁকে আসতে দেয়া হয়নি। তাকে বহনকারী হেলিকপ্টার গুলী করে ভূপাতিত করা হয়। কিন্তু এ নিয়ে নানান বানোয়াট কাহিনী রচনা করে অনুপস্থিতির জন্য তাঁকেই দায়ী করা হয়েছে। আবার ১৯৭৫ এর পর ওসমানীকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করে তাঁর ছত্রছায়ায় আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক ময়দানে নির্বিঘ্নে নামার পথ বেছে নিতে হয়েছিল। বাংলাদেশের মহান জাতীয় বীর, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানীর স্মৃতির প্রতি তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে জানাই শ্রদ্ধা ও অভিবাদন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *