আমার আব্বু প্রফেসর ড. হাসান মোহাম্মদ

:: ফুয়াদ হাসান ::

বাবার স্মরণে কিছু লিখতে বাবা সম্পূর্ণভাবে স্মৃতি হয়ে যেতে হয়। এই সেদিনও আমার আব্বু, প্রফেসর ড. হাসান মোহাম্মদ, আমাদের জীবনে এতটাই প্রবলভাবে ছিলেন যে তাঁকে স্মৃতির কেউ ভাবা আমার জন্য ভীষণ কঠিন। তাঁর সাথে প্রতিটা মূহুর্ত এখনও যেন বাস্তব, ভীষণ জীবন্ত। তাঁর জীবনের শেষ পনের-বিশ মিনিট আমি তাঁর বুক স্পর্শ করে রেখে ক্রমাগত কালিমা তাইয়্যেবা পড়ার যে সুযোগ পেয়েছি সেটাও যেন আমি এখনও অনুভব করছি। আসলে, আটষট্টি বছর বয়সে বড় কোন স্বাস্থ্যগত অবনতির আগেই তাঁর চলে যাওয়াটা আমার ও আমাদের পরিবারের জন্য বড় একটা আঘাত। আব্বু অবশ্য সবসময় বলতেন, রোগে ভুগে পরিবারকে দীর্ঘদিন কষ্ট দিয়ে বিদায় নেয়াটা তাঁর নিতান্তই অপছন্দের। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হয়ত তাঁর সে পছন্দকেই মনজুর করলেন।

আমার বুঝ হওয়ার পর থেকে আব্বুকে নিয়ে আমার প্রথম স্মৃতি এমন – সন্দ্বীপ টাউনের কোন এক দুপুরে আমি স্টীমারের ভেঁপু শুনে উৎকর্ণ হয়ে আছি আর কিছুক্ষণ পর বাসার দরজার বাইরে একটা রিকশার বেল শুনব বলে। হয়ত বাসা থেকে বেরিয়ে একটু এগিয়েই দাঁড়িয়ে আছি ধৈর্য ধরতে পারছিনা বলে। আম্মু চিঠি মারফত জানেন যে আজ তাঁর আসার দিন। তারপর উনি আসতেন, আমি কোলে ঝাঁপিয়ে পড়তাম, উনি একে একে ডানো, হরলিক্স, শিশুতোষ বই আর সাধারণ জ্ঞানের বইয়ের মত সব জিনিস বের করে দিতেন যা আমার জন্য নিয়ে এসেছেন। তারপর ক’টা দিন যেত স্বপ্নের মত, যে ক’টা দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটি থাকত। আমার পুরো প্রাইমারি স্কুল জীবনে এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে অনেকবার। সাধারণ জ্ঞানের বই থেকেই নিশ্চয় বুঝতে পারছেন আমার মধ্যে দিন-দুনিয়ার খবর জানার আগ্রহ তৈরি করতে চেয়েছেন সেই ছোটবেলা থেকেই। সাথে প্রচন্ড সচেতন ছিলেন আমার বাংলা উচ্চারণ যেন শুদ্ধ হয় আর পরীক্ষার ফল যেন খারাপ না হয়ে যায়। প্রয়োজনে শত ব্যস্ততার মধ্যেও চিটাগং বসেই আমার জন্য নোট তৈরি করে নিয়ে আসতেন।

আমার আব্বু পেশা ও নেশায় একজন শিক্ষক। তাঁকে সবচেয়ে ভাল চেনা যাবে শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গন বিষয়ে তাঁর অস্বাভাবিক ভালবাসা দিয়ে। প্রাইমারি স্কুলে পড়ার বয়সটুকু মাদ্রাসায় কাটিয়ে তিনি স্কুলে চলে এসে সরাসরি ভর্তি হন ক্লাস সিক্সে। সম্ভবত ক্লাসের তুলনায় অনেক বেশি বয়সী ছাত্র হতে তাঁর খুব অনীহা ছিল। কিন্তু, এজন্য কম ঝক্কি পোহাতে হয়নি। জীবনে প্রথম এ-বি-সি-ডি শিখেছেন সিক্সে ভর্তি হবার পরই। বাংলা আগে থেকেই পড়তে পারতেন। প্রাইভেট পড়ার সঙ্গতি যেহেতু ছিলনা সেহেতু পড়াশোনার পুরো ধকল নিজেকেই নিতে হয়েছে। মাদ্রাসা ছেড়ে স্কুলে ভর্তির পেছনে সম্ভবত আমার ছোট ফুপা নুরুল ইসলাম মাস্টার সাহেবের প্রশ্রয় ও উৎসাহ কিছুটা কাজ করেছে। স্কুল জীবনে বাম রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়াসহ নানা ক্ষেত্রে আমার ছোট ফুপার বেশ প্রভাব ছিল তাঁর ওপর। হাই স্কুলের ছাত্র থাকতেই তিনি সন্দ্বীপ পর্যায়ে বড় ছাত্রনেতায় পরিণত হন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে ও পরে স্বাধিকার আন্দোলনে তিনি স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। তবে, স্কুল জীবনের যে কাজটিকে তিনি তাঁর সবচেয়ে বড় কাজ বলে মনে করতেন সেটি হচ্ছে দেদারসে বই পড়া। এই সময় তিনি পাঠ্য বইয়ের বাইরে বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় হাজার খানেক বই পড়েছেন।

তবে, আব্বুকে নিয়ে এরও আগের যে ঘটনা আমাকে আলোড়িত করে সেটা হচ্ছে আমার আকীকা অনুষ্ঠান ও নাম নিয়ে বিড়ম্বনা। আব্বু সন্দ্বীপে সাতঘড়িয়ার গ্রামের বাড়িতে আমার জন্য এত বড় আকীকা অনুষ্ঠান করেন যে তার গল্প আমি আমার আম্মু আর ফুপুদের কাছ থেকে সেই ছোটবেলা থেকে শুরু করে মাঝে মাঝেই শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। আকীকা করে আমার নাম রাখা হয় “মাহমুদ হাসান” (এখনকার নামটাও সেসময় বিবেচনায় ছিল; কিন্তু কোন কারণে রাখা হয়নি)। আমার প্রাইমারি স্কুলে ভর্তির সময়েও এই নামটাই ছিল। কিন্তু, এরপর শুরু হয় বিড়ম্বনা। আব্বুর কাছে আসা চিঠিতে প্রায় দেখা যায় নাম “মোহাম্মদ হাসান”-এর জায়গায় “মাহমুদ হাসান” লেখা আর আমার নাম অনেকে লিখছে “মোহাম্মদ হাসান”। এই বিড়ম্বনা থেকে বাঁচতে সন্দ্বীপ থেকে চট্টগ্রামে এসে স্কুলে ভর্তির সময় আমার নাম পরিবর্তন করে দেয়া হয় “ফুয়াদ হাসান”। তবে, নাম নিয়ে বিড়ম্বনা আব্বুকে এর পরেও সইতে হয়েছে। আব্বু অনেক আগে থেকেই “হাসান মোহাম্মদ” নামে লিখেন। বলা যায়, এটা তাঁর লেখক নাম (pen name)। কিন্তু, কেউ কেউ “হাসান মোহাম্মদ” আর “মোহাম্মদ হাসান”কে দু’জন আলাদা মানুষ মনে করতে থাকলেন। তখন, তাঁকে এফিডেভিট করে আদালত থেকে এ সংক্রান্ত সনদ নিতে হয় যে তাঁরা একইজন, দু’জন নন।

আমার শৈশবে আমাকে নিয়ে আব্বুর প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল সম্ভবত আমার শ্বাসকষ্টের রোগ। আব্বু নিজে রোগ-শোকে ভুগতেন খুব কম। তবে, ছোটখাটো যেকোন অসুখেই খুব কাতর হয়ে যেতেন। আর আমার অসুখও ওনাকে খুব কাতর করত। দৌড়-ঝাঁপ করলেই যেহেতু আমার শ্বাসকষ্ট বাড়ত সেহেতু আমাকে বাইরে খেলাধুলা করতে দিতে চাইতেননা। পরিবর্তে দাবার মত ইনডোর গেম আর গল্পের বই পড়ায় উৎসাহ দিতেন। আমাকে মারধরের মত শাসনের যৎসামান্য ঘটনা যা আছে তা মূলত শ্বাসকষ্ট সত্ত্বেও এই বাইরে ক্রিকেট-ফুটবল খেলা নিয়েই। আবার আম্মুর কাছে শুনেছি যে আমার প্রতি ওনার স্নেহের সর্বোচ্চ প্রকাশও এই শ্বাসকষ্টের সময়েই। আমি হয়ত “টান ওঠায়” বিছানায় শুয়ে ঘুমাতে পারছিনা; উনি তখন প্রায় সারারাত আমাকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে হাঁটাহাঁটি করেই কাটিয়ে দিতেন। আমার ছোট ভাইয়ের একবার মাসল টর্ট (এক ধরনের মাসল পেইন) হয়েছিল ওর আট-দশ বছর বয়সে যার জন্য ওকে কিছুদিনের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। আমি মনে হয় সেই প্রথম ওনাকে ওর প্রচন্ড যন্ত্রণা দেখে অসহায় হয়ে বাচ্চাদের মত কান্না করতে দেখেছিলাম।

আমার আব্বুকে শক্ত খোলসের মধ্যে নরম মনের একজন মানুষ বলা যায়। নিতান্ত বাধ্য না হলে ইমোশন গোপন করে রাখতেন। কিন্তু, তাঁর কাজ-কর্ম খেয়াল করলে সেটা অনুধাবন করা যেত। তিনি “সিম্পল লিভিং, হাই থিংকিং” পছন্দ করতেন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিসপত্র কেনা তিনি পছন্দ করতেননা। বিশেষত, আমার ছোটবেলায় তাঁর আর্থিক সঙ্গতিও একেবারেই ভাল ছিলনা। এর মধ্যে আমি যখন সিক্স বা সেভেনে পড়ি তখন খেয়াল করলেন আমি টিভি দেখতে প্রায়ই পাশের বাসায় চলে যাই। তিনি তখন একদিন হুট করেই একটা চৌদ্দ ইঞ্চি সাদা-কালো টিভি নিয়ে আসলেন, যদিও আমি টিভি কেনার জন্য কোন বায়না করিনি। আমার সেকি আনন্দ! আমার আনন্দ দেখে নিশ্চয়ই ওনার খুব ভাল লেগেছিল। কিন্তু, উনি সেটাও বুঝতে দেবেননা।

আমার স্কুলের রেজাল্ট বরাবরই ভাল ছিল। ওনাকে সাময়িক বা বার্ষিক পরীক্ষার প্রগ্রেসিভ কার্ড সাইন করতে দিলে উনি রেজাল্ট দেখে বলতেন – ভাল হয়েছে, তবে আরো ভাল করতে হবে। মাঝে মাঝে গণিতের খাতা দেখাতাম যে ১০০তে ১০০ পেয়েছি। উনি তখনও একই কথা বলতেন। আমি তখন জানতে চাইতাম, এরচেয়ে ভাল করা কিভাবে সম্ভব? উনি বলতেন, এর মানে হচ্ছে এটা ধরে রাখতে হবে।

আমার জীবনের প্রথম চাকরি পেয়ে ইস্টার্ণ রিফাইনারি লিমিটেডে জয়েন করার পর আমার মাথায় আসে আমি বাসার জন্য এমন কিছু একটা কিনব যেটা বাসার জন্য প্রয়োজন, কিন্তু আব্বু কিনতে পারছেননা। আমি আমার প্রবেশনারি পিরিয়ডের সামান্য বেতনের টাকা দিয়ে একটা সেমি-অটোমেটক ওয়াশিন মেশিন কিনে নিয়ে আসলাম। বাসার সবাই খুশি। শুধু আব্বু দেখলেন, কিন্তু তেমন কিছু বললেননা। আমার একটু খারাপও লেগেছিল তখন। কয়েকদিন পর আমার এক বন্ধু (আব্বুর এক সহকর্মীর ছেলে) আমাকে সন্ধ্যার আড্ডায় বলল – কিরে! কি নাকি একটা ওয়াশিন মেশিন কিনছিস! চাচা দেখি সবাইকে বলে বলে বেড়াচ্ছে!

তবে, আব্বুর আবেগের অনিয়মিত প্রকাশ কিছুটা বাড়ে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবনের শেষ ভাগ থেকে। ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে আমি প্রথম দেশের বাইরে যাবার সুযোগ পাই। আমি সবে তখন মাস্টার্সের ক্লাস শুরু করেছি। সেসময় একশন এইড বাংলাদেশের অর্থায়নে আমাদের একটা দলকে ভারতের মুম্বাইয়ে ৪র্থ ওয়ার্ল্ড স্যোশাল ফোরামে অংশ নিতে পাঠানো হয়। আমাদের সেই দলে সাংবাদিক, সাহিত্যিক, উন্নয়ন কর্মীদের পাশাপাশি একমাত্র ছাত্র হিসেবে আমি ছিলাম। আব্বু বেশ উৎসাহী হয়ে আমাকে নিয়ে খুব ছোটাছুটি করে অল্প সময়ের মধ্যে জীবনের প্রথম পাসপোর্টটি করিয়ে দিলেন। একশন এইডের উদ্যোগে ভিসা পাওয়া গেল। একদিন খুব ভোরে উনি আমাকে নিয়ে বাসা থেকে বের হলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে বাসে তুলে বিদায় দেবেন বলে। বাসের জন্য অপেক্ষা করছি; হঠাৎ বলে বসলেন – আমার মনে হয় তুই বরং না-ই যা… আমার খুব অস্বস্তি লাগছে… খুব ভয় ভয় লাগছে…। আমি তাঁকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাজি করে যাত্রা করতে হল। উনি এরপর আমাদের যাত্রাসংগী ও তত্ত্বাবধায়ক একশন এইড বাংলাদেশের তৎকালীন কর্মকর্তা মোর্শেদ ইমতিয়াজ পাপ্পু ভাইকে (বর্তমানে ময়মনসিংহ জেলা বিশেষ জজ) ফোন করে বললেন যেন আমাকে খুব দেখে-টেখে রাখেন। এরপর দুই দফায় আমেরিকায় পড়তে যাবার সময়ও এয়ারপোর্টে বাঁধভাঙ্গা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন দৃশ্যত রাশভারী এই মানুষটা।

আব্বু সাধারণত কথায় কথায় পার্টি দেয়া বা পার্টি করা মানুষ না। কিন্তু, আমি পিএইচডি করে ফিরে আসার বেশ কিছুদিন চলে যাবার পর আমি আমাদের কোর্সওয়ার্কের ওয়ার্কলোড কেমন ছিল সেটা ওনাকে বুঝিয়ে বলছিলাম। এক সেমিস্টারের তিনটি সেমিনারের একটি, ফিলসফি অব সাইন্সে, অন্য পেপারের পাশাপাশি যে সতেরটি বই পড়তে হয়েছিল সেগুলোও তাঁকে দেখালাম। বইগুলো কমবেশি তাঁর পরিচিত। সব দেখে-টেখে কি মনে করে হঠাৎ বলে উঠলেন – আচ্ছা চল আমরা একদিন সবাই মিলে চাইনিজ খাই, পিএইচডি ডিগ্রীটা সেলিব্রেট করি।

আব্বুর সিগারেট একেবারে ছেড়ে দেয়ার গল্পটা তাঁর আবেগ প্রকাশের সেরা গল্প। স্কুল ছাত্র থাকতেই রাজনীতিতে জড়ানোর উপসংগ হয়ে এসেছিল সিগারেটের নেশা। উনি বহু বছর যাবত ক্যালেন্ডারে দাগ দিয়ে দিয়ে চেষ্টা করছিলেন ধীরে ধীরে ধূমপান কমিয়ে দিতে ও পুরোপুরি ছেড়ে দিতে। কিন্তু, কিছুতেই সেটা হচ্ছিলনা। ২০১০-এর ২ জুন আমি আমেরিকা থেকে আমার যমজ মেয়ের জন্মের সংবাদ দিলাম। উনি ফোন রেখে সবাইকে খবরটা দিলেন ও জানালেন যে তৃতীয় প্রজন্মের প্রথম আগমণ উপলক্ষ্যে উনি ওইদিন থেকে সিগারেট সম্পূর্ণরূপে ছেড়ে দিলেন।

আমার আব্বুর জীবন কখনোই শুধু আমাদের অর্থাৎ তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের জন্য ছিলনা। কাজ, পড়া, পড়ানোর পাশাপাশি একটা চিন্তা সবসময় থাকত আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের জন্য। নিয়মিত সবার খোঁজ-খবর নেয়া, আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে কারো জীবন সহজ করতে কিছু করা যায় কিনা এসব ছিল তাঁর সার্বক্ষণিক চিন্তার অংশ। চেষ্টা থাকত তাঁদের প্রত্যেকের জন্য সাধ্যানুযায়ী কিছু না কিছু করার।

আমার আব্বুর জীবনের যা অর্জন তার প্রায় সবই নিজের চেষ্টা ও পরিশ্রমের ফল। তাঁকে এজন্য একজন “সেলফ-মেইড ম্যান” বললে অত্যুক্তি হবেনা। আব্বু পৈত্রিক সূত্রে যা পেয়েছিলেন তা হচ্ছে মোটাদাগে একটি ভাল পিতৃপরিচয় এবং পিতার মেধার অনেকাংশ। আমার দাদু্ মাওলানা সৈয়দ আহমদের তাঁর সময়ে দেশ-বরেণ্য একজন আলিম হিসেবে পরিচিতি থাকলেও তিনি একেবারেই বিষয়-বিমুখ ধরনের মানুষ ছিলেন। তিনি দারুল উলুম দেওবন্দে জীবনের দীর্ঘ একটা সময় পড়ালেখা করেন এবং পরবর্তীতে প্রৌঢ়ত্বের আগেই দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেন। দৃষ্টিশক্তি ছাড়াই জীবনের শেষ প্রায় পাঁচ দশক তিনি কাটিয়েছেন। আমার দাদী যখন ইন্তেকাল করেন আব্বুর বয়স তখন তিন বা চারের বেশি ছিলনা। এ অবস্থায় বাবার ইচ্ছায় মাদ্রাসায় পড়ালেখা শুরু করলেও পরবর্তীতে সাধারণ ধারার স্কুলে চলে আসেন। বলা যায়, এসময় থেকেই তিনি নিজেই মোটামুটিভাবে নিজের অভিভাবক। মেট্রিক পাশ করার পর প্রায় কোন সম্বল ছাড়াই চিটাগং এসে চিটাগং কলেজের ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে ভর্তি হন। পরবর্তীতে অনার্স ও মাস্টার্স করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। চট্টগ্রামের দিনগুলোতে নিজের খরচ চালানোর ব্যবস্থা নিয়ে তাঁকেই ভাবতে হয়েছে। সেই সময় রাজনৈতিক সূত্রে তাঁর কিছু সিনিয়র বন্ধু ছিলেন। যেমন, বেলাল মোহাম্মদ ও আবুল কাশেম সন্দ্বীপ (উভয়েই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকে সম্মানিত)। এমন বন্ধুদের মাধ্যমে পরিচয় হয় আরও অনেকের সাথে। একসময় এসব সূত্রেই নিয়মিত বেতার কথিকা পাঠ করার সুযোগ পান। একটি একটি কথিকা পাঠের জন্য যে সম্মানী পেতেন সেগুলোও তাঁর দিনাতিপাত করার অন্যতম সম্বল ছিল। আব্বু পরবর্তীতে চ্যানেল আই-এর “তৃতীয় মাত্রা”র অনেকগুলো পর্বে আলোচক ছিলেন। অন্যান্য টিভি টক শোতেও অনেক আমন্ত্রণ পেয়েছেন। কিন্তু, মিডিয়ায় তাঁর উপস্থিতি নিয়ে কথা তুললে তিনি সেই বেতার কথিকা পাঠের দিনগুলো খুব মমতা নিয়ে স্মরণ করতেন।

সন্দ্বীপ সম্ভবত আমার আব্বুর জীবনের সবচেয়ে কোমল ও সর্বাধিক প্রকাশিত দিক। কমরেড মুজফফর আহমদের ভাষায় তিনি এটাকে বলতেন তাঁর “দ্বৈপায়ন সংকীর্ণতা”। সন্দ্বীপকে নিয়ে তাঁর ভালবাসা তিনি মূর্ত করা শুরু করেছিলেন সেই অল্প বয়সেই বিভিন্ন গ্রন্থ ও সাময়িকী সম্পাদনা করার মধ্য দিয়ে। “সৈকত” নামে একটি সাময়িকী দেখেছিলাম যেটা এযুগের প্রেক্ষাপটেও বেশ স্মার্ট একটি সম্পাদনা বলা যায়। অধ্যাপক ড. রাজীব হুমায়ূনের (যিনি সম্পর্কে আমার আব্বুর মামাও হন) সাথে সন্দ্বীপের উপর যে গ্রন্থ সম্পাদনায় তিনি অংশ নিয়েছেন তা বহু যুগ ধরে সন্দ্বীপের উপর সবচেয়ে প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। পরবর্তীতে “সন্দ্বীপ সমীক্ষা” শিরোনামে একটি গ্রন্থ এককভাবে সম্পাদনা করেছেন যা আরও বৃহৎ কলেবরে সন্দ্বীপকে উপস্থাপন করেছে পাঠকের কাছে। এমনি অনেক কাজের মাঝে তিনি অল্প বয়সেই অংশ নিয়েছেন কমরেড মুজফফর আহমদের উপর একটি গ্রন্থ সম্পাদনায়। নিশ্চয় এর পেছনে কাজ করেছে তাঁর ছাত্র জীবনে বাম রাজনীতির প্রতি আকর্ষণ ও “দ্বৈপায়ন সংকীর্ণতা”র মিথস্ক্রিয়া। সন্দ্বীপ সম্পর্কিত অসংখ্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগের সাথে তিনি সংগঠক বা উপদেষ্টার ভূমিকায় জড়িত ছিলেন। সন্দ্বীপ আনন্দ পাঠশালার মত সফল একটি বিদ্যায়তন বা সন্দ্বীপ মেডিকেল সেন্টারের মত যুগান্তকারী উদ্যোগে তিনি অভিভাবকের মত পাশে থেকেছেন।

সন্দ্বীপ নিয়ে তাঁর কাজকে তিনি অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন দু’টি গ্রন্থ “সন্দ্বীপঃ শিক্ষা সমীক্ষা” ও “সন্দ্বীপসমগ্রঃ সন্দ্বীপপিডিয়া”র মাধ্যমে। “সন্দ্বীপঃ শিক্ষা সমীক্ষা” প্রায় তিনশত পৃষ্ঠার একটি গ্রন্থ। বাংলাদেশের কোন একটি উপজেলার শুধু শিক্ষার উপর এমন বিস্তৃত গ্রন্থের উদাহরণ আরেকটি হয়ত পাওয়া যাবেনা। আর সন্দ্বীপের প্রায় সবকিছুকে দুই মলাটের মধ্যে ধারন করে প্রকাশিত হয়েছে “সন্দ্বীপসমগ্রঃ সন্দ্বীপপিডিয়া”। ধারনাতীত কলেবরের এই প্রকাশনার পৃষ্ঠাসংখ্যা এক হাজার দুইশত (১২০০)। সন্দ্বীপের নবীন-প্রবীণ প্রায় সব লেখকই এই বইকে সমৃদ্ধ করেছেন। একটি উপজেলার উপর সবচেয়ে বিস্তৃত পরিসরের এই বইয়ে সন্দ্বীপের বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় তিন শতাধিক অন্তর্ভুক্তি রয়েছে যা ধারন করার চেষ্টা করেছে সন্দ্বীপের অতীত ও বর্তমান, সন্দ্বীপীদের সংগ্রাম ও অর্জন, বিশ্বজুড়ে বিস্তৃতিসহ অনেক কিছু। টেক্সট হিসেবে “সন্দ্বীপসমগ্রঃ সন্দ্বীপপিডিয়া” অনন্যতার দাবিদার শুধুমাত্র এর কলেবর বা বিষয় বৈচিত্র্যের জন্য নয়; বরং বিভিন্ন বিষয়ে যথাসম্ভব প্রাথমিক উৎস থেকে আকর্ষণীয় বর্ণনার পাশাপাশি এই বইয়ের অসংখ্য ইলাস্ট্রেশন সন্দ্বীপকে পাঠকের কাছে যেকোন সময় যেকোন জায়গায় মূর্ত করে তুলতে পারে।

আমার আব্বু পেশা ও নেশায় একজন শিক্ষক। তাঁকে সবচেয়ে ভাল চেনা যাবে শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গন বিষয়ে তাঁর অস্বাভাবিক ভালবাসা দিয়ে। প্রাইমারি স্কুলে পড়ার বয়সটুকু মাদ্রাসায় কাটিয়ে তিনি স্কুলে চলে এসে সরাসরি ভর্তি হন ক্লাস সিক্সে। সম্ভবত ক্লাসের তুলনায় অনেক বেশি বয়সী ছাত্র হতে তাঁর খুব অনীহা ছিল। কিন্তু, এজন্য কম ঝক্কি পোহাতে হয়নি। জীবনে প্রথম এ-বি-সি-ডি শিখেছেন সিক্সে ভর্তি হবার পরই। বাংলা আগে থেকেই পড়তে পারতেন। প্রাইভেট পড়ার সঙ্গতি যেহেতু ছিলনা সেহেতু পড়াশোনার পুরো ধকল নিজেকেই নিতে হয়েছে। মাদ্রাসা ছেড়ে স্কুলে ভর্তির পেছনে সম্ভবত আমার ছোট ফুপা নুরুল ইসলাম মাস্টার সাহেবের প্রশ্রয় ও উৎসাহ কিছুটা কাজ করেছে। স্কুল জীবনে বাম রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়াসহ নানা ক্ষেত্রে আমার ছোট ফুপার বেশ প্রভাব ছিল তাঁর ওপর। হাই স্কুলের ছাত্র থাকতেই তিনি সন্দ্বীপ পর্যায়ে বড় ছাত্রনেতায় পরিণত হন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে ও পরে স্বাধিকার আন্দোলনে তিনি স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। তবে, স্কুল জীবনের যে কাজটিকে তিনি তাঁর সবচেয়ে বড় কাজ বলে মনে করতেন সেটি হচ্ছে দেদারসে বই পড়া। এই সময় তিনি পাঠ্য বইয়ের বাইরে বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় হাজার খানেক বই পড়েছেন।

শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গন নিয়ে এই মুগ্ধতা তিনি আমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যেও সবসময় সঞ্চারিত করার চেষ্টা করেছেন। খুব করে চাইতেন আমি যেন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতা করি। আমি যখন অনার্সের শেষ ভাগ বা মাস্টার্সের ছাত্র তখন সম্ভাব্য পেশা হিসেবে অন্য কিছু বিকল্প নিয়ে ভাবছিলাম। আমাকে তখন ইউনিভার্সিটির বিষয়ে উৎসাহিত করতে একদিন তাঁর শিক্ষক প্রফেসর ড. আর. আই. চৌধূরীর সাথেও কথা বলিয়ে দেন। প্রফেসর চৌধূরী আমাকে তখন বোঝান যে তাঁর আমেরিকা ও বাংলাদেশ উভয় দেশে পড়া ও পড়ানোর অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা দুই দেশেই পরম সম্মানের পেশা হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই সুযোগ পেলে আমি যেন এই পেশাতেই আসি। সবশেষে, আব্বু আমাকে প্রবল উৎসাহ দিয়েই ইস্টার্ণ রিফাইনারির (আমার প্রথম কর্মস্থল) অত্যন্ত চমৎকার ও লোভনীয় চাকরি ছাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করান। তিনি নিজেও নিজের চাকুরীজীবনের শুরুতেই সরকারের একটি বিভাগে এমন একটি চাকুরী পেয়েছিলেন যা থেকে খুব দ্রুত ধনী হওয়ার সুযোগ আছে বলে জনসাধারণ্যে ব্যাপক আলোচনা আছে। দারিদ্র্যের মধ্যে থাকলেও যোগদান করার ঠিক আগ মূহুর্তে তিনি নিজেকে সংবরণ করেন ও সে চাকুরী থেকে দূরে সরে যান। আব্বু আমাকে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অনেক ধরনের উপদেশ দিয়েছেন। তবে, সবচেয়ে বড় যে উপদেশ আমার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে তা হচ্ছে পরিবার হিসেবে আমাদের টিকে থাকা ও বড় হওয়ার জন্য ভালভাবে পড়ালেখা করা ছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই। শিক্ষাকে পথ ও পাথেয় করার এই শিক্ষা আমার আব্বু নিজের সারাটা জীবন ধরে চর্চা করেছেন। আর সেজন্যই বোধ হয় অন্তিম শয়ানের জন্যও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং তাঁর পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষাগুরু ও পিএইচডি গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক প্রফেসর ড. আর. আই. চৌধূরী স্যারের পাশের স্থানটির কথা আমাদেরকে বলে গেছেন।

শিক্ষায় নিজের আগ্রহের বিষয় নিয়ে গভীরে যাওয়ার চেষ্টা তাঁর আজীবনের সাধনা। তাঁর প্রকাশনা তালিকা বিবেচনায় নিলে তা সহজেই উপলব্ধি করা যায়। রাজনীতি বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে তিনি উপমহাদেশে কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মুজফফর আহমদকে সবিস্তারে পাঠ করার চেষ্টা করেছেন। কমরেডের জীবন ও বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলন নিয়ে বাংলাদেশে প্রথম পূর্ণাংগ গ্রন্থের রচয়িতা তিনি। বইটি বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের আগ্রহী মহলে সমাদৃত হয়েছে। তাঁর অনুসন্ধিৎসা থেকে বংগবন্ধুকে নিয়ে গবেষণা প্রবন্ধ লিখেছেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া, বিএনপি, ও জাতীয়তাবাদ নিয়ে তাঁর একাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত রয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আলোকে তিনি করিডোর-ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্টকে বোঝার চেষ্টা করেছেন ও এ নিয়ে বই লিখেছেন। তবে, তিনি সবচেয়ে বেশি উৎসাহী ছিলেন রাজনীতি ও ধর্মের আন্তঃসম্পর্ক, তার মাত্রা, ও প্রয়োগ নিয়ে। আর তাঁর অধীত এ বিষয় নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি বাংলাদেশের ধর্ম, সমাজ, ও রাজনীতি, তাবলীগ আন্দোলন ও তাবলীগ জামাআত, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষা, বাংলার সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন ইত্যাদি নিয়ে অনেকগুলো গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। সব মিলিয়ে তিনি দশের অধিক একাডেমিক গ্রন্থের লেখক, সম্পাদক, ও সংকলক।

আমার আব্বু শিক্ষাঙ্গনে সাফল্যের সাথে নেতৃত্বও দিয়েছেন বহু বছর ধরে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ রাজনীতি বিজ্ঞান এসোশিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য, এ এফ রহমান হলের প্রভোস্টসহ অনেকগুলো পদে দায়িত্ব পালন করেছেন সুনামের সাথে।

খুব অল্প বয়সে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া এবং রাজনীতির সাথে দীর্ঘ ও নিবিড় সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় আব্বু শিক্ষক রাজনীতি থেকেও দূরে থাকতে পারেননি। তবে, তাঁর পেশাজীবনের রাজনীতি ক্যাম্পাসের বাইরে গিয়ে নাগরিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সম্পৃক্ততায় পর্যবসিত হয়েছিল শেষ পর্যন্ত। বাম রাজনীতি দিয়ে তাঁর রাজনীতির হাতেখড়ি হলেও এক সময় তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসের গতি পরিবর্তিত হয়ে যায়। বাম রাজনীতি করার সময় এক পর্যায়ে তিনি নিজেকে শ্রেণীচ্যুত করার কথাও ভাবা শুরু করেছিলেন। এমন এক সময়েই ভুলবশত তাঁর এক রাজনৈতিক গুরুর ছোট ভাইয়ের কাছে লেখা চিঠি তাঁর হাতে এসে পড়ে। তিনি দেখলেন, যে নেতা তাঁকে শ্রেণীচ্যুত হতে উৎসাহ দিচ্ছেন সে নেতাই তাঁর ভাইকে সিভিল সার্ভিসে যোগ দেয়ার ব্যাপারে তাগাদা দিচ্ছেন। সেই থেকে বাম রাজনীতি নিয়ে তাঁর হতাশার শুরু হয় যা এক পর্যায়ে তাঁকে সেই রাজনীতি থেকেও ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে দেয়। যাই হোক, গতানুগতিক শিক্ষক রাজনীতি নিয়েও তিনি হতাশা প্রকাশ করেছেন অনেকবার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আমার যোগদানের পর পরই তিনি আমাকে বলেছিলেন যে তিনি তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষক হয়ে গেলে তাদের শিক্ষক রাজনীতি করতে উৎসাহ দেননা; তিনি আমাকেও শিক্ষক রাজনীতিতে জড়াতে উৎসাহ দেবেননা। আমি প্রভাষক থাকাবস্থায় সিন্ডিকেট নির্বাচনে প্রভাষক ক্যাটেগরিতে আমার নাম নমিনেশনের জন্য প্রস্তাব ওঠে। সময়টা এমন ছিল যে ওই নমিনেশন পেলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্ষদে শিক্ষক জীবনের প্রারম্ভেই নির্বাচিত হয়ে যাওয়াটা প্রায় নিশ্চিত। আমার আব্বুকে যখন তাঁর সম্মতির জন্য জিজ্ঞেস করা হয় তখন তিনি বলেছিলেন যে এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি ওর (অর্থাৎ আমার); কিন্তু আমার মনে হয়না সে এখন নির্বাচন করতে রাজি হবে। আমিও পরে আমার অসম্মতিই প্রকাশ করেছিলাম। রাজনীতির বদলে তিনি সবসময় বলতেন একাডেমিক্যালি স্ট্রং হওয়ার কথা। তিনি নিজেও সবসময় তাঁর একাডেমিক এচিভমেন্টকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন।

আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাবস্থায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলাম। সে সুবাদে বিভিন্ন বিভাগের অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীর সাথে আমার পরিচয় হত। আমি সাধারণত পিতৃপরিচয় প্রকাশ না করে পরোক্ষভাবে আব্বুর সম্পর্কে তাদের ধারণা জানার চেষ্টা করতাম। বিভিন্ন বিষয়ে তাদের বিভিন্ন মত থাকলেও প্রায় সবাই একমত ছিলেন যে তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে একাডেমিক মানদণ্ডের বাইরে আর কিছুই ব্যবহার করেননা; ছাত্রদের মূল্যায়নে রাজনীতি বা ধর্মীয় পরিচয় তাঁকে কখনো প্রভাবিত করেনা। ঘটনাক্রমে সেই সময়কার চারটি ছাত্র সংগঠনের (ছাত্রলীগ, ছাত্রশিবির, ছাত্র ইউনিয়ন, ও ছাত্রফ্রন্ট) বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সভাপতি আব্বুর সরাসরি ছাত্র ছিলেন। তাঁদের দু’জনের সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল। তাঁরাও আব্বু সম্পর্কে অনুরূপ ধারনাই পোষণ করতেন।

আমার আব্বুর বর্ণাঢ্য জীবনের অনেক কিছুই আমি মিস করব। তবে সবচেয়ে বেশি যা মিস করব তা হচ্ছে তাঁর সাথে আমাদের পারিবারিক আড্ডা। প্রাণখোলা হাসি আর আড্ডাপ্রিয়তার জন্য তিনি যেকোন আসরে মধ্যমণি হয়ে যেতেন। তবে আমাদের সাথে, মূলত আমাদের দুই ভাইয়ের সাথে, তাঁর প্রায়ই বিশেষ ধরনের একটা আড্ডা হত যেখানে মাঝে মাঝে আমার আম্মু আর আমার স্ত্রীও উপস্থিত থাকতেন। সমসাময়িক দেশীয় বা বৈদেশিক কোন ঘটনা এইসব আড্ডাকে উস্কে দিত। আড্ডার মূল বিষয়বস্তু হত রাজনীতি, ধর্ম, সমাজ, ও সংস্কৃতি। থাকত ’৬০-এর দশকের অহঙ্কারের সাথে ’৯০-এর দশকের সৌভাগ্যের দ্বৈরথ। থাকত অভিজ্ঞতা আর পোড় খাওয়া বয়ানের বিপরীতে মেনে নিতে না চাওয়ার জেদ। আমরা দুই ভাই আমেরিকা থেকে পড়ে আসার পর ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে আলাপে যোগ হয়েছিল নতুন সব মাত্রা। আমার মাঝে মাঝে মনে হত এসব ছিল ভিন্ন কোন সময় নিয়ে চাণক্য সেনের “পুত্র পিতাকে” আর “পিতা পুত্রকে”র মঞ্চায়ন। তিনি অদ্ভূতভাবে ওইসময়গুলোতে আমাদের জেদ আর ঔদ্ধত্যকে প্রশ্রয় দিতেন। এতটাই দিতেন যে আমার মাঝে মাঝে দ্বিধা তৈরি হত – কে বেশি আধুনিক? আমি না তিনি? আমি আমাদের এই আড্ডার নাম দিয়েছিলাম – পারিবারিক সেমিনার। গত ১১ এপ্রিলের (২০২১) পর থেকে সেই আড্ডাগুলোই আব্বুকে নিয়ে আমার সবচেয়ে সযত্নে লুকিয়ে রাখা স্মৃতি; আমার খুব বড় সম্পদ।

লেখকঃ প্রফেসর ড. মোহাম্মদ হাসানের বড় সন্তান এবং অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *