সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি

:: নাগরিক নিউজ ডেস্ক ::

গত রাতে বৃষ্টি না হওয়ায় সকাল থেকে সিলেট নগরীসহ বিভিন্ন উপজেলায় বন্যার পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে। কিছু জায়গায় পানি ২ থেকে ৩ ইঞ্চি কমেছে, আবার কোথাও ১ থেকে দেড় ফুট কমেছে।

রোববার সকাল থেকে সিলেটের আকাশ কিছুটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। তুলনামূলক বৃষ্টিপাতও কম হচ্ছে। যদি বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম হয়, তবে বন্যার পানি কমতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আবহাওয়া অফিসের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ সাঈদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আজ সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত খুব কম পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা আমরা রেকর্ড করতে পারিনি। বৃষ্টির পরিমাণ নিম্ন পর্যায়ে থাকলে তা রেকর্ড করা সম্ভব হয় না। এটি একটি ভালো লক্ষণ। এর আগে গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল ৩০৪ মিলিমিটার।

তিনি আরও জানান, তবে দিনের কিছু সময়ে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আশা করা যায় আগামীকাল থেকে আকাশে মেঘের পরিমাণ কমে আসবে। বৃষ্টিপাতও তুলনামূলক কমে যাবে। সেই সঙ্গে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

দুর্গত এলাকা পরিদর্শন না করেই ফিরে গেলেন সিসিক মেয়র

সেচ্ছাসেবকদের তোপের মুখে দুর্গত এলাকা পরিদর্শন না করেই ফিরে গেলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। এ সময় স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে মেয়রের লোকদের বাগবিতণ্ডা হয়। রোববার বিকেলে উপশহর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, বিকেলে মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী উপশহর রোজভিউ হোটেলে সামনের পয়েন্টে যান। সেখানে গিয়ে সেচ্ছাসেবকদের একটি নৌকা তিনি নিতে চান। কিছু দুর্গত এলকা পরিদর্শনের জন্য তাদের কাছে নৌকাটি চান। এ সময় স্বেচ্ছাসেবকরা নৌকা দিতে অপারগতা জানান। তারা জরুরি একজন সন্তানসম্ভাবা নারীকে আনার জন্য যাবেন বলে মেয়রকে জানান।

এ সময় মেয়রের সঙ্গে থাকা লোকজন নৌকা দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। স্বেচ্ছাসেবকরা জরুরি কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এ সময় মেয়রের সঙ্গে থাকা এক যুবক দেখে নেওয়ার হুমকি দিলে পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেয়। তখনই স্বেচ্ছাসেবকরা উত্তেজিত হয়ে এর প্রতিবাদ জানান। তারা বলতে থাকেন, ‘আগে মেয়র, না রোগীর চিকিৎসার প্রয়োজন?’ এমন প্রশ্ন রাখেন তারা।

বিয়ানীবাজার মানবিক টিমের সদস্য রায়হান আহমদ জানান, আমরা ৩ দিন ধরে এখানে। মেয়রকে এতদিন দেখিনি। বিয়ানীবাজার থেকে নৌকা নিয়ে এসেছি। মানুষকে খাদ্য, পানি পৌঁছে দিচ্ছি। পাশাপাশি লোকদেরকে বিনামূল্যে বাড়িতে যাওয়া আসার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। অসহায় রোগীদের বিনামূল্যে সেবা দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু মেয়রের সঙ্গে থাকা এক লোক ‘দেখে নেওয়ার হুমকি দেন’। এটি খুবই দুঃখজনক। এ ব্যাপারে জানতে সিটি মেয়রের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি।

সিরাজগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

এদিকে, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। দ্রুতগতিতে পানি বৃদ্ধির ফলে জেলার শাহজাদপুর ও চৌহালীতে শুরু হয়েছে নদীভাঙন। ধসে গেছে রাউতারা বাঁধসহ অন্তত ১৫টি বসতভিটা। তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি।

রোববার সকাল ১০ টায় সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের গেজ রিডার (পানি পরিমাপক) হাসানুর রহমান জানান, ১২ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি ৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে শহর রক্ষা বাঁধ পয়েন্টে বিপদসীমার ১২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

অপরদিকে, কাজিপুর মেঘাই ঘাট পয়েন্টে গত ১২ ঘণ্টায় ১২ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ২২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে যমুনার পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

পানি বৃদ্ধির ফলে কাজিপুর, সদর, চৌহালী, উল্লাপাড়া, বেলকুচি ও শাহজাদপুরের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। ইতিমধ্যেই জেলার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষেরা ছুটছেন নিরাপদ আশ্রয়ে। এরই মধ্যে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি প্লাবিত হওয়ায় কাঁচা পাট, তিল, কাউন, বাদাম, শাকসবজিসহ বিভিন্ন ধরনের উঠতি ফসল নষ্ট হচ্ছে। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষকেরা।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সিরাজগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান, যমুনায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে আরও ৩ দিন। ভাঙন কবলিত চৌহালী ও শাহজাদপুরের ভাঙনরোধে কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

পানি বৃদ্ধির ফলে শনিবার রাতে শাহজাদপুরের রাউতারায় প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বালির বাঁধ ভেঙে গেছে। এতে প্লাবিত হয়েছে নিম্নাঞ্চলসহ বিস্তীর্ণ এলাকা। একই সঙ্গে উপজেলার কৈজুরি ইউনিয়নের পাচিল ও চৌহালী উপজেলার বাগুটিয়া ইউনিয়নের চলছে তীব্র নদী ভাঙন। গত ২৪ ঘণ্টায় এ দুটি এলাকার অন্তত ১৫টি বসতভিটাসহ বিস্তীর্ণ ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। ইতিমধ্যেই ভাঙন এলাকায় ৪০ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। এছাড়া ভাঙন রোধে ৩০ হাজার জিও ব্যাগ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

কর্মকর্তাদের কাছ ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা চাওয়া হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী বিতরণ করা হবে বলে তিনি জানান।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ত্রাণ কমিটি বিএনপির

দেশের সিলেট অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ত্রাণ কমিটি গঠন করেছে বিএনপি। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে প্রধান করে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দলে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের চাইতে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোকেই অগ্রাধিকার দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। 

রোববার বিকেলে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সিলেট-সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে বন্যা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় এক যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সকল অঙ্গ সংগঠনকে আলাদাভাবে স্টিয়ারিং কমিটি করে প্রতিটি সংগঠনের ত্রাণ কার্যক্রম তদারিক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বৈঠকের পর জাতীয় ত্রাণ কমিটির প্রধান ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্দেশনা দিয়েছেন যে, বন্যা পরিস্থিতির বিষয়ে আমরা যেন সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিই। সাংগঠনিক কাজ-কর্মের চাইতে এখন আমাদের একমাত্র অগ্রাধিকার বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের জন্য কাজ করা। এটা দলের নেতাকর্মীদের প্রতি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশ।

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, সিলেট মহানগর, সুনামগঞ্জ পৌরসভা, ছাতকসহ বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মীরা ত্রাণ বিতরণ শুরু করেছেন। সিলেটে এখন পর্যন্ত ১০ হাজার লোকের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বড় বড় নৌকা ভাড়া করে পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে প্রায় আমাদের শ’ খানেক নৌকা কাজ করছে। ছাতকে বন্যাকবলিত এলাকায় নেতাকর্মীরা নিজেরা ১০ লাখ টাকা তুলে মানুষের মাঝে বিতরণ করেছে। এভাবে গণমানুষের দল হিসেবে আমরা মানুষের পাশে আছি।

বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় দলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবারের বন্যা পরিস্থিতিকে আমরা তিনভাবে ভাগ করেছি। এখন যারা পানিবন্দি মানুষজন আছেন তাদের উদ্ধার করে তাদের কাছে খাবার পৌঁছিয়ে দেয়া। বন্যা পানি চলে গেলে মানুষজনের গৃহ নির্মাণ, তাদের খাবার-দাওয়া ও ওষুধপত্র বিতরণ করা হবে। কৃষি জমি তলিয়ে গেছে বন্যায়। পানি নেমে গেলে কৃষকরা যাতে চাষাবাদ করতে পারে সেজন্য বীজতলা তৈরি করে তাদের সরবারহ করা হবে। ড্যাব ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন রোগ বালাইয়ের চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ বিতরণ, বিশুদ্ধ পানির ট্যাবলেট বিতরণ করবে। আমরা চেষ্টা করব সকল বন্যার্তদের পাশে পৌঁছানোর। এটা আমরা কতটা করতে পারলাম সেটা রিভিউ করার জন্য আগামী ২১ জুন বৈঠকে বসে সিদ্ধান্ত নেব।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে টুকু বলেন, এই সরকার ২০ রাখ টাকা আর কয়েক টন চাল বরাদ্দ করেছে সিলেটের জন্য। এটা আমি মনে করি যে, জনগনের সঙ্গে ব্যঙ্গ করা। ব্যঙ্গ তারা করতেই পারে কারণ তাদের তো জনগণের ভোটের প্রয়োজন হয় না, জনগণের সেবার করারও প্রয়োজন হয় না। তাচ্ছিল্য করে তারা রিলিফ দিচ্ছে। বৈঠকে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম, মহিলা দলের আফরোজা আব্বাস, সুলতানা আহমেদ, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের অধ্যাপক হারুন আল রশিদ, অধ্যাপক আব্দুস সালাম, যুব দলের সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, মোনায়েম মুন্না, স্বেচ্ছাসেবক দলের মোস্তাফিজুর রহমান, আবদুল কাদির ভুঁইয়া জুয়েল, কৃষক দলের হাসান জাফির তুহিন, শহিদুল ইসলাম বাবুল, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবদুস সাত্তার পাটোয়ারী, ছাত্র দলের কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবন, সাইফ মাহমুদ জুয়েল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *