চার মাসে সারা দেশে ১১৮ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

সারা দেশে গত দুই সপ্তাহে ধর্ষণের পর অন্তত চার শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সাড়ে চার মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১১৮ কন্যাশিশু।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছরের কন্যাশিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করা হয়। মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড করে প্রতিবেশী সোহেল রানা। গত ১৬ মে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় ১০ বছরের এক কন্যাশিশুকে। এ ঘটনায় মেয়েটির এক আত্মীয় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সাম্প্রতিক সময়ের ধর্ষণ ও হত্যার পাঁচটি ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবকটিতে শিশুরা প্রতিবেশী, আত্মীয় কিংবা ঘনিষ্ঠজনের শিকার হয়েছে। 

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, গত ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ৪৬ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ১৪ শিশু এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে তিন শিশুকে। ধর্ষণের শিকার দুই শিশু আত্মহত্যা করেছে। 

চলতি মাসে ২০ দিনে (১ থেকে ২০ মে পর্যন্ত) ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২৪ শিশু। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ১২ জন এবং ধর্ষণের ঘটনায় পাঁচজনকে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ঘটনায় জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ১১৫ শিশু খুন হয়েছে।

পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ৫ হাজার ৯৫৮টি মামলা হয়েছে। 

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বলছে, গত বছর ২ হাজার ৮০৮ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে কন্যাশিশু ছিল ১ হাজার ২৩৪ জন। নারী ১ হাজার ৫৭৪ জন। এর মধ্যে ৫৪৩ কন্যাশিশু ও ২৪৩ নারী ধর্ষণের শিকার হন। ১৮ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। ধর্ষণের শিকার হয়ে পাঁচ শিশু আত্মহত্যা করে। এ ছাড়া ১৪৭ কন্যাশিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। 

জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ চাইল্ড হেল্পলাইনে শিশু যৌন হয়রানি সংক্রান্ত ৫ হাজার ৮৫৩টি কল এসেছে। এর মধ্যে ৫২০টি কল এসেছে, যেসব ঘটনায় শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। প্রতিবছর এ ধরনের কলের সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চাইল্ড হেল্পলাইনের ব্যবস্থাপক চৌধুরী মো. মোহায়মেন।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, সমাজের অবক্ষয় এবং দুর্বলতার কারণে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটছে। যার ফলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ছেলেমেয়ে উভয়েই এর শিকার হচ্ছে। তারা আইনের আশ্রয় নিতে পারে; অপরাধীর নাম বলে দিতে পারে– এমন আশঙ্কায় তাদের হত্যা করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাগুলো কেবল যৌন সহিংসতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক সামাজিক, মানসিক ও কাঠামোগত কারণ। ভুক্তভোগীকে হত্যা করলে প্রমাণ ও স্বীকারোক্তির ঝুঁকি থাকবে না– এমন ধারণা করেও অপরাধীরা হত্যা করে। মাদকাসক্তি, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সামাজিক অবক্ষয় অপরাধের মনস্তত্ত্বকে আরও জটিল করে তুলছে। 

অপরাধ দমনে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপ যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে অধ্যাপক উমর ফারুক বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে। তাই দ্রুত ও কার্যকর বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, শিশুরা তুলনামূলকভাবে দুর্বল টার্গেট। তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং নিরাপত্তার জায়গাটাও অনেক সময় দুর্বল থাকে। এই সুযোগই অপরাধীরা কাজে লাগায়। 

তিনি বলেন, মানুষের ভেতরে মানবিক ও পাশবিক– দুই ধরনের প্রবৃত্তিই থাকে। সামাজিক, শিক্ষা, ধর্ম ও সভ্যতার চর্চার মাধ্যমে পাশবিক প্রবৃত্তি সাধারণত নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু কখনও কখনও দেখা যায় এই নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে, পাশবিক প্রবৃত্তি প্রাধান্য পায় এবং মানবিক প্রবৃত্তি দুর্বল হয়ে যায়। তখনই মানুষ নৃশংস অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আরও বলেন, একই ধরনের ঘটনা একের পর এক ঘটতে থাকলে, তা অন্য অপরাধীদের মধ্যেও প্রভাব ফেলে। এতে তাদের মধ্যেও একই অপরাধ করার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি সমাজে মানবিক গুণাবলির চর্চা ধীরে ধীরে কমে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে সবকিছু পাওয়ার অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা জাগছে।

মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনপরিসর কোথাও শিশুরা পুরোপুরি নিরাপদ নয়। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তা ও নৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি।

শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও বিকাশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধান স্বীকৃতি দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতীয় শিশু নীতি-২০১১ শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ ও সুরক্ষার কথা বলেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (ইউএনসিআরসি) অনুযায়ী শিশুদের সহিংসতা ও শোষণ থেকে রক্ষার অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু বাস্তবে বিচার বিলম্ব, দুর্বল আইন প্রয়োগ ও সামাজিক নীরবতা পরিস্থিতিকে জটিল করছে। সরকারের উচিত দ্রুত বিচার, কার্যকর শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা জোরদার করা। মনে রাখতে হবে, শিশু নিরাপদ না হলে সমাজও নিরাপদ হবে না।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *