✍︎ নাটোর প্রতিনিধি ✍︎
নাটোরে যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪ জনে দাঁড়িয়েছে। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে বড়াইগ্রাম উপজেলার সরকারপাড়ার নাটোর-পাবনা মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত ৯ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন- শরীয়পুরের জাজিরা উপজেলার কাজিরহাট গ্রামের ইউনুস আলীর ছেলে সোহাগ হোসেন (৩০), বড়কান্দি গ্রামের জহুর উদ্দিনের ছেলে জুয়েল রানা (৪০), ডুবি সাহেবের গ্রামের জাহান উদ্দিন মোল্লার শালাল মোল্লা (৪৫), কাজির হাট গ্রামের শাহিন হোসেন (২৫), রাজাশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরহাদপুর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে ও বাসটির চালক সোহেল রানা (৪০), বাগমারা উপজেলার কনোপাড়া গ্রামে বাবর আলীর ছেলে আনোয়ার হক (৩০), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালি গ্রামের মৃত শহিদুল ইসলামের মেয়ে তাছফিয়া খাতুন (৮), শরীয়তপুর জাজিরা এলাকার আরোব আলী ফকিরের ছেলে সামাদ ফকির (৭০) ও ফরিদপুরের বাকুন্দা এলাকার অমুল্য চন্দ্রের ছেলে হিমেস (২৮)।
দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই ৯ জনের মৃত্যু হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় আরও পাঁচজনের। আহত ও নিহতদের উদ্ধার করে নাটোর সদর হাসপাতাল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এদেরমধ্যে আটজনকে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় অন্তত ৩০ জন যাত্রী আহত হয়েছেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখায়ের আলম বলেন, নিহতদের মরদেহ নাটোর হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, বরিশালের বরগুনা থেকে রাজশাহীগামী আরপি পরিবহনের একটি বাস ভোরে বড়াইগ্রাম এলাকায় পৌঁছালে পাবনাগামী বালুবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এ সময় ঘটনাস্থলেই ৯ জনের মৃত্যু হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে বড়াইগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, যেহেতু ভোর ছিল, চালক হয়তো ঘুমন্ত অবস্থায় গাড়ি চালাচ্ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। যেহেতু অনেকেই গুরুত্বর আহত, মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। আহত ও নিয়হতের পরিচয় শনাক্তে কাজ করছে প্রশাসন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে করেছেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু এমপি। তিনি বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে যারা নিহত হয়েছেন তাদেরকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য চেষ্টা করব। যেহেতু এই সড়কে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেজন্য দুর্ঘটনা এড়াতে যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া প্রয়োজন সেগুলো সরকারের দায়িত্বশীল এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে তিনি আলোচনা করবেন বলে জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা মাজেদা পারভীন বলেন, ‘ভোরে খুব জোরে একটি শব্দ শুনতে পেয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসি। সেখানে গিয়ে দেখি, ভেতরে যাত্রীদের কেউ কেউ কাতরাচ্ছেন। কোনো কোনো যাত্রীর শব্দ নেই। সবাই মিলে তাদের বাস থেকে বের করে বাইরে রাখি। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস এসে তাদের হাসপাতালে নিয়ে যায়। আমরা বাসের ভেতরেই ৯ জনকে মৃত দেখেছি।’
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এর নাটোর জেলা সভাপতি গোলাম মোস্তফা জানান, সড়কে এভাবে একের পর এক প্রাণ ঝরে যাওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে চালকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো বন্ধ, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং সড়ক পরিবহন আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত এবং মহাসড়কে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
নাটোর জেলা পুলিশ সুপার শরীফুল হক বলেন, সড়কটি সরু। নিহতদের উদ্ধার করে হাইওয়ে ফাঁড়িতে রাখা হয়েছে। পরিচয় শনাক্ত করার পর মরদেহগুলো হস্তান্তর করা হবে। দুর্ঘটনা কবলিত যানবাহন দুটি উদ্ধার করে হাইওয়ে ফাঁড়িতে রাখা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার বলেন, নিহতদের সড়ক আইনে সহায়তা প্রদানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে সাত সদস্যের একটি কমিটি ঘটনা করা হয়েছে।
নাটোর বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনাকবলিত আরপি পরিবহন বাসটির ফিটনেস সনদের মেয়াদ চলতি বছরের ১৩ মে শেষ হয়েছে। তবে বাসটির রুট পারমিটের মেয়াদ রয়েছে ২০২৮ সালের ১৩ মে পর্যন্ত। ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বাসটি কীভাবে চলাচল করছিল, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
