✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
বগুড়া ও সিলেটে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে বগুড়ায় সাতজন ও সিলেটে নয়জন মারা গেছেন। বগুড়ায় আহত আরও ১৪ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সিলেটে অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন আহত হয়েছেন।
প্রথম দুর্ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার (৭ আগস্ট) ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে বগুড়ার সদর উপজেলার বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের এরুলিয়া এলাকায়।
এই দুর্ঘটনার দুই ঘণ্টার মাথায় সকাল সাড়ে সাতটার দিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ওসমানীনগর এলাকায় যাত্রীবাহী দুই বাসের সংঘর্ষ হয়।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের এরুলিয়া এলাকায় স্পিডব্রেকার নির্মাণের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন স্থানীয়রা। পরে সড়ক ও জনপথ বিভাগ তাৎক্ষণিক স্পিডব্রেকার নির্মাণ কাজ শুরু করলে অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়।
দুর্ঘটনাস্থলের সামনে এরুলিয়া উচ্চবিদ্যালয়। প্রতিদিন বিদ্যালয়ের সামনে দিনমজুর শ্রমিকের হাট বসে। গুরুত্বপূর্ণ এই স্থানে এত দিন কোনো স্পিডব্রেকার ছিল না। বিদ্যালয় ও শ্রমিকের হাট থাকার বিষয়ে চালকদের সতর্ক করতে প্রয়োজনীয় সড়কচিহ্নও ছিল না।
পুলিশ জানায়, ঢাকা থেকে নওগাঁর উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস এরুলিয়া এলাকায় পৌঁছালে চালক নিয়ন্ত্রণ হারান। এ সময় সড়কের পাশে অবস্থানরত দিনমজুর ও কৃষিশ্রমিকদের ওপর বাসটি উঠে যায়।
দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলে তিনজনের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত অন্তত ২০ জনকে উদ্ধার করে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, সেখানে চিকিৎসাধীন চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একজনের মরদেহ স্বজনরা নিয়ে গেছেন। অন্য তিনজনের মরদেহ হাসপাতালে রাখা আছে।
নিহতদের মধ্যে চারজনের পরিচয় জানা গেছে। তারা হলেন, গাইবান্ধার আমিরুল, নূর আলম, বেলাল ও জয়পুরহাটের তাজমুল।
বগুড়া সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল ওয়াজেদ বলেন, নিহত সাতজনের প্রত্যেক পরিবারের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে স্পিডব্রেকার নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ায় স্থানীয়রা অবরোধ তুলে নিয়েছেন। বর্তমানে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
সিলেটমুখী বাসের সঙ্গে ঢাকামুখী বাসের সংঘর্ষ
দ্বিতীয় দুর্ঘটনাটি ঘটে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে। সেখানে ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহনের একটি বাস (ঢাকা মেট্রো-ব ১৫-২৫৬৩) এবং সিলেটগামী বেঙ্গল স্লিপার কোচের (ঢাকা মেট্রো-ব ১২-৫৯৮৭) মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ইউনিক পরিবহনের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে খাদে পড়ে যায়। ঘটনাস্থলে ইউনিক পরিবহনের সাতজন যাত্রী প্রাণ হারান। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও দুজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
পুলিশ জানায়, ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহনের একটি বাস (ঢাকা মেট্রো-ব ১৫-২৫৬৩) এবং সিলেটগামী বেঙ্গল স্লিপার কোচের (ঢাকা মেট্রো-ব ১২-৫৯৮৭) মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ইউনিক পরিবহনের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে খাদে পড়ে যায়। ঘটনাস্থলে ইউনিক পরিবহনের সাতজন যাত্রী প্রাণ হারান। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও দুজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
নিহতদের মধ্যে চারজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন, সিলেট নগরীর সোবহানীঘাটের উত্তম রায়ের ছেলে সপ্তম রায় প্রীয়ম, ঢাকার বিক্রমপুরের জাহাঙ্গীর শেখের তিন বছর বয়সি শিশুকন্যা খোজাইফা, লক্ষ্মীপুরের কুলিয়ারচর উপজেলার সাইফুল ইসলাম ও কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার শিল্পী পেহেলী ভৈরবী।
ওসমানী নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মোস্তফা জানান, খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক শেরপুর হাইওয়ে পুলিশ, ওসমানীনগর থানা পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। নিহতরা ইউনিক পরিবহনের যাত্রী ছিলেন বলে জানা গেছে। আহত হয়েছেন অন্তত ২০-২৫ জন।
তিনি আরও জানান, মরদেহগুলো সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা আছে।
হাসপাতালের করিডোর জুড়ে স্বজন হারানোর আহাজারি
কেউ কৃষিজমিতে কাজের জন্য, কেউ দিনমজুরের কাজ খুঁজতে গিয়েছিলেন বগুড়ার এরুলিয়ার কামলার হাটে। উদ্দেশ্য ছিল দিন শেষে পরিবারের জন্য দুমুঠো খাবার জোগাড় করা। কিন্তু কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সবকিছু বদলে যায়। নিয়ন্ত্রণ হারানো শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের বাসের নিচে চাপা পড়ে নিভে যায় ৭টি প্রাণ। আর সেই মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও মর্গ এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) দুপুরে হাসপাতালের করিডোর জুড়ে ছিল কান্না, আর্তনাদ আর স্বজন হারানোর আহাজারি। একের পর এক মরদেহ দেখে স্বজনদের বুকফাটা কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতালের পরিবেশ।
স্বামী আবু সাঈদ মণ্ডলের মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন স্ত্রী রিনা বেগম। কখনো মরদেহ জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন, কখনো বিলাপ করে বলছিলেন, ‘আমাকে একা রেখে কোথায় চলে গেলে?’ পাশে থাকা স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও কোনো সান্ত্বনাই যেন তার বুকের শূন্যতা পূরণ করতে পারছিল না।
আবু সাঈদ ও আমিরুলের স্বজন সানাউল প্রধান বলেন, ২ জনই দিনমজুর ছিলেন। সাঈদের পরিবারের সদস্য ৬ জন। সংসারের সব দায়িত্ব ছিল তার কাঁধে। কাজের সন্ধানে বগুড়ায় এসেছিলেন, কিন্তু আর বাড়ি ফেরা হলো না।
তিনি আরও বলেন, নিহত আমিরুলও ছিলেন ভূমিহীন। এক শতক জমির ওপর ছোট্ট একটি ঘর তুলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটির মৃত্যুতে পরিবারটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
নিহত নূর মোহাম্মদের ভাতিজা আল আমিন বলেন, ফজরের নামাজ পড়ে চাচা কামলার হাটে গিয়েছিলেন কৃষি শ্রমিক নেওয়ার জন্য। কে জানত, সেটাই হবে তার জীবনের শেষ পথচলা।
কৃষি শ্রমিক শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন ভোর ৫টার পর থেকেই এরুলিয়ার কামলার হাটে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শ্রমিকরা জড়ো হন। কৃষিজমির মালিকরা প্রয়োজন অনুযায়ী সেখান থেকে শ্রমিক নিয়ে যান। নিহত ও আহতদের অনেকেই সেখানে জনপ্রতি ২০ টাকা ভাড়ায় একটি কক্ষে থাকতেন।
তিনি বলেন, প্রতিদিনের মতো আমারও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমার একটু দেরি হয়ে যায়। পরে গিয়ে দেখি চারদিকে মানুষের ভিড়, রক্তাক্ত মানুষ আর আর্তনাদ। তখন আহতদের উদ্ধারে অন্যদের সঙ্গে আমিও এগিয়ে যাই।
আরেক শ্রমিক মোশাররফ হোসেন সরকার বলেন, গাইবান্ধা, রংপুর, দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন শ্রমিকরা এই হাটে আসেন। বর্তমানে কৃষি কাজে একজন শ্রমিক দৈনিক প্রায় ৭০০ টাকা মজুরি পান। সেই সামান্য আয়ের ওপরই নির্ভর করে অসংখ্য পরিবারের জীবন।
