✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথি বিদ্রোহীদের হামলায় নিহত দুই বাংলাদেশি নাগরিকের পরিচয় জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
তারা হলেন—বগুড়া জেলার শাহজাহানপুর থানার মাদলা গ্রামের (ডাকঘর: মাদলা) বাসিন্দা মো. শাহেদ আহম্মেদ এবং কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট থানার বদরপুর গ্রামের (ডাকঘর: ঢালুয়া) বাসিন্দা মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরি।
রোববার (১১ অক্টোবর) প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় জানায় গতকাল বিকাল আনুমানিক ৩টা ২০ মিনিটে রিয়াদের কিং খালেদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের টার্মিনাল-৩ এর উপর একটি ক্ষেপনাস্ত্র এসে পড়ে।
এ সময় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের যাত্রী সেখানে অপেক্ষমান ছিল। দুঘটনায় দুজন বাংলাদেশি নাগরিক মৃত্যুবরণ করেছেন।
ওমরায় গিয়ে প্রাণ হারালেন কুমিল্লার নাসরুল্লাহ
ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যাওয়ার পথে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হয়েছেন কুমিল্লার মাদরাসা শিক্ষক মোহাম্মদ নাসরুল্লাহ বদর। স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে তাঁর সংসার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ স্বজনরা। তাঁরা দ্রুত তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।
রোববার রাত ৮টায় এ তথ্য নিশ্চিত করেন নাসরুল্লাহর ভগ্নিপতি মাওলানা মো. নাসিরুদ্দিন।
তিনি জানান, গত শনিবার ৪৫ জনের একটি কাফেলার সঙ্গে ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়েন নাসরুল্লাহ। রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুই ঘণ্টার ট্রানজিট ছিল তাঁদের। সেখান থেকে মক্কার উদ্দেশে যাত্রার প্রস্তুতিকালে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নাসরুল্লাহসহ ১২ জন নিহত হন বলে তিনি জানান। কাফেলার অন্য সদস্যদের মধ্যে ৩২ জন সুস্থ আছেন এবং ১৩ জন গুরুতর আহত অবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
নাসরুল্লাহ কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার ঢালুয়া ইউনিয়নের বদরপুর এলাকার মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহর ছেলে। তিনি রাজধানীর জামিয়া আরাবিয়া রবিউল উলুম মাদরাসার সহকারী অধ্যাপক ছিলেন। স্ত্রী ও দুই ছেলে জামিল (৭), জাওয়াদ (২) এবং মেয়ে নাবিলাকে (৫) নিয়ে কামরাঙ্গীরচরে ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি।
নাসরুল্লাহর ভগ্নিপতি বলেন, ছোট তিন সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে পরিবারটি এখন অসহায় হয়ে পড়েছে। নাসরুল্লাহই ছিলেন তাঁদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর মরদেহের অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজনরা। দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা চান তাঁরা।
নাঙ্গলকোট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু রায়হান বলেন, স্থানীয়দের মাধ্যমে নাসরুল্লাহর মৃত্যুর খবর পেয়েছেন। মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে।
সৌদি ফিরেই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত বগুড়ার শাহেদ
এক মাসের ছুটিতে সৌদি আরবের জেদ্দা থেকে বগুড়ায় নিজ বাড়িতে এসেছিলেন ৩৬ বছর বয়সী মো. শাহেদ আহম্মেদ। ছুটি শেষে ফিরে যান কর্মস্থলে।
রিয়াদ বিমানবন্দরে পৌঁছে উড়োজাহাজ থেকে নামার পর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাণ হারান তিনি।
নিহত শাহেদের বাড়ি বগুড়ার শাহজাহানপুর উপজেলার মাদলা ইউনিয়নের মাদলা গ্রামে। তিনি ২০১৩ সাল থেকে সৌদি আরবের জেদ্দায় প্লাম্বার হিসেবে কাজ করতেন বলে জানান তার চাচাতো ভাই মাসুম রানা (৩০)।
মাসুম বলেন, ‘দুই বছর পর এক মাসের ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন তিনি। স্ত্রী ও দুই সন্তানের সঙ্গে ছুটি কাটিয়ে কাজে ফিরছিলেন। কিন্তু, বিমানবন্দরে নামার মুহূর্তেই সব শেষ হয়ে গেল।’
তিনি জানান, শাহেদের বাবা রফিকুল ২৬ বছর ধরে সৌদি আরবের দাম্মামে থাকেন। তিন মাস আগে তার মা সাহেরা বেগমও সেখানে যান। সৌদি পৌঁছে আগে মা-বাবার সঙ্গে দেখা করে তারপর কাজে যোগ দেওয়ার কথা ছিল শাহেদের। সেই সুযোগ আর পেলেন না তিনি।
শুক্রবার সন্ধ্যায় বগুড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন শাহেদ। পরদিন সৌদি আরবের রিয়াদে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান।
শাহেদের স্ত্রী কাকলী (২৬) জানান, বাংলাদেশ সময় শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে শাহেদ কল করে জানিয়েছিলেন, তিনি নিরাপদে বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি।
স্বামীর মৃত্যুর খবরে শোকে বিহ্বল কাকলী ঠিকমতো কথাও বলতে পারছেন না।
শোকাহত স্বজনেরা শাহেদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে এবং তার দুই শিশুসন্তান ও স্ত্রীর ভরণপোষণের জন্য আর্থিক সহায়তা দিতে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন।
রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্থানীয় সময় শনিবার দুপুরে এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ২ বাংলাদেশিসহ অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে এএফপির প্রতিবেদন বলছে, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা এই হামলা চালিয়েছে।
