তিন বছরে ঢাকায় ৪৩০৭৪টি তালাকের আবেদন 

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

রাজধানী ঢাকায় ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত তিন বছরে ঢাকায় মোট ৪৩ হাজার ৭৪টি তালাকের আবেদন হয়েছে। সবচেয়ে আবেদন এসেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে। এখানে তিন বছরে মোট ২৭ হাজার ৪২টি তালাকের আবেদন হয়েছে, যা উত্তর সিটির তুলনায় ১০ হাজারের বেশি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে এ সংখ্যা ১৬ হাজার ৩২টি। দক্ষিণ সিটিতে প্রতি বছরই গড়ে সাত থেকে আট হাজারের বেশি তালাক হয়েছে। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা পৌঁছায় ৮ হাজার ৮৬৬টিতে।

উত্তরে শীর্ষে মিরপুর-গুলশান, আবেদন বেশি নারীদের: ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, তালাক আবেদন এবং কার্যকর দুই ক্ষেত্রে মিরপুর, কারওয়ান বাজার ও গুলশান এলাকা শীর্ষে রয়েছে। এখানে ২০২৩ সালে ৩ হাজার ৯২২টি তালাক কার্যকর হয়। পরের বছর তালাক হয় ৪ হাজার ২২টি। আর গত বছর ২০২৫ সালে ৩ হাজার ৯৫০টি তালাক হয়।

পর্যবেক্ষণে পাওয়া যায়, উত্তর সিটিতে নারীদের তালাক আবেদন পুরুষদের তুলনায় বেশি, যা অনেক ক্ষেত্রে মোট আবেদনের অর্ধেকের বেশি।

২০২৩-২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরেই নারীদের আবেদন পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। ২০২৩ সালে মোট ৫ হাজার ১৮৫টি তালাকের মধ্যে পুরুষদের আবেদন ছিল ২ হাজার ১৬৭টি, আর নারীদের ৩ হাজার ২৪১টি। ২০২৪ সালে এ ব্যবধান আরও বাড়ে, যেখানে মোট ৫ হাজার ৫২১টি তালাকের মধ্যে নারীদের আবেদন সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ হাজার ৪৪৯টিতে। ওই বছর তালাকের জন্য আবেদন করেছিলেন ১ হাজার ৯৯০ জন পুরুষ। ২০২৫ সালে ৫ হাজার ৩২৬টি তালাকের মধ্যে নারীদের আবেদন ৩ হাজার ৭৭২টি এবং পুরুষদের ২ হাজার ৪৭১টি।

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি, সম্পর্ক নিয়ে অসন্তুষ্টি সহ্য না করার প্রবণতা এবং অধিকার সম্পর্কে নারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এ পরিবর্তনের পেছনে কাজ করছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, নারীর অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া কোনোভাবেই দোষের কিছু নয়। নির্যাতন থেকে মুক্তির জন্য একজন নারী চাইলে ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিতেও পারেন।

তিনি বলেন, পারিবারিক দায়িত্বের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমান অংশীদারত্ব এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এখনো শ্রমের ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন দেখা যায়, কোন কাজ নারীর, কোন কাজ পুরুষের—এমন ধারণা সমাজে গভীরভাবে রয়ে গেছে।

ডা. ফওজিয়া মোসলেম আরও বলেন, একজন নারী যদি নিজে কষ্ট করে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হন এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হন, কিন্তু পারিবারিক সহায়তা বা ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন না আসে, তাহলে তার জন্য কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তার মতে, পরিবার পরিচালনায় কাঠামোগত যে পরিবর্তন প্রয়োজন, সেটির দিকেই এখনো যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে না। এ পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়িত হলে নারীরা আরও স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারবেন এবং একই সঙ্গে বিচ্ছেদের হারও কমে আসবে।

সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দাম্পত্য বিচ্ছেদের পেছনে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি, সম্পর্কে অসন্তুষ্টি সহ্য না করার প্রবণতা এবং বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের মতো বিষয়গুলো বেশি প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ায় অনেকেই এখন আর নির্যাতন, অসম্মান বা দীর্ঘদিনের মানসিক অশান্তি মেনে নিতে চাইছেন না।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আয়, সামাজিক অবস্থান বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন এলেও মানসিকতার পরিবর্তন সেভাবে না হওয়ায় দাম্পত্য সম্পর্কে দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পুরুষের তুলনায় বেশি হলে কিছু পরিবারে আধিপত্যের সংঘাত, অহংবোধ ও মানসিক দূরত্ব বাড়ছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের সুযোগ বাড়ায় বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ঘটনাও আগের তুলনায় বেশি সামনে আসছে। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, একে অপরকে সময় না দেওয়া, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কমে যাওয়া এবং ছোট ছোট বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ থেকেও অনেক সম্পর্ক বিচ্ছেদের দিকে গড়াচ্ছে।

আইনজীবীরা বলছেন, অনেক নারী স্বেচ্ছায় নয়, বরং দীর্ঘদিনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কারণে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। অনেক ক্ষেত্রে স্বামীর পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়, অপমান-অবহেলা কিংবা নির্যাতনের মাধ্যমে স্ত্রীকে ডিভোর্স দিতে বাধ্য করা হয়। পারিবারিক চাপ, সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার মতো বিষয়ও নারীদের বিচ্ছেদের পথে ঠেলে দিচ্ছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিসংখ্যান যেন শুধু তালাকের হিসাব নয়, বরং একটি পুরো শহরের ভেতরে জমে থাকা সম্পর্কের ক্লান্তি, নীরবতা আর ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে যাওয়ার গল্প। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এ সিটিতে মোট তালাকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৪২টিতে।

তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে যেখানে তালাকের সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৫৩০টি, ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৭ হাজার ৬৯৫টিতে পৌঁছে। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৮৬৬টিতে। আর ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই তালাক কার্যকর হয়েছে ২ হাজার ৯৫১টি।

পারিবারিক আদালতের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মলয় সাহা বলেন, সমাজ ও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে দেশে তালাকের সংখ্যাও বাড়ছে। আগে নারীরা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে নির্ভরশীল থাকায় অনেক নির্যাতন সহ্য করতেন। এখন শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সচেতনতা বাড়ায় তারা নিজেদের অধিকার নিয়ে আরও সোচ্চার হচ্ছেন। তিনি বলেন, সমাজ এখনো পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তবে পারিবারিক মানসিকতার পরিবর্তন সে তুলনায় ধীর। অনেক ক্ষেত্রে দাম্পত্য দ্বন্দ্বের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে সন্তানদের ওপর। তার মতে, সামাজিক পরিবর্তন, নারীর ক্ষমতায়ন ও আধুনিক জীবনের বাস্তবতাই বর্তমানে তালাক বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে এখনও ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুসরণ করা হয়। এ আইন অনুযায়ী, ঢাকায় দুই সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের কার্যালয়ে তালাকের আবেদন পাঠাতে হয়। মূলত স্ত্রীর অবস্থানের ঠিকানায় থেকে আবেদনটি ওই অঞ্চলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। এরপর ঢাকায় দুই সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের কার্যালয়ে আবেদন নথিবদ্ধ হয়।

বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়লে কর্তৃপক্ষ আবেদনকারী ও বিবাদী- দুই পক্ষকেই আপসের নোটিশ পাঠায়। সিটি কর্পোরেশন এলাকায় আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তারাই এ ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ। কারণ তারাই দুই পক্ষের কাছে আপসের নোটিশ পাঠান। দুই পক্ষে সমঝোতা না হলে কর্তৃপক্ষের আর কোনো দায়িত্ব থাকে না। আবেদনের তিন মাসের (৯০ দিন) মধ্যে কোনো পক্ষ আপস না করলে কিংবা আবেদন তুলে না নিলে আইনত তালাক কার্যকর হয়ে যায়।

সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রী সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে তালাকের আবেদন করেন। স্ত্রী বা স্বামী- কার আবেদনের নোটিশে সাধারণত অপর পক্ষ আসে না। দুই পক্ষ কখনো এলেও আপসের মতো পরিস্থিতি থাকে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হয়ে যায়।

তালাকের আবেদনের ছক আইনজীবীদের কাছে একরকম প্রস্তুতই থাকে। পরিবর্তন বলতে শুধু বিভিন্ন পক্ষের নাম-পরিচয়-ঠিকানাই ভিন্ন। হঠাৎ দুই-একটি ক্ষেত্রে সামান্য ভিন্ন হলেও বাকি সব একই। সিটি কর্পোরেশনের আবেদনগুলোতে তাই বিবাহবিচ্ছেদের জন্য দেখানো কারণগুলোও ঘুরেফিরে একই।

প্রায় সব আবেদনেই বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হওয়া। এর বাইরে অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক কলহ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, যৌতুক, মাদক সেবন করে নির্যাতন, প্রবাসী স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা, যৌন অক্ষমতা, সন্দেহ, উদাসীনতা, ব্যক্তিত্বের সংঘাতসহ আরও কিছু অভিযোগ।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *