✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
চলতি বছর হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে মৃত শিশুদের ৬৩ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, ডিএনসিসি কোভিড হাসপাতাল ও বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে গত ১৫ মার্চ থেকে মারা যাওয়া ৮৫ জন শিশুর বয়স বিশ্লেষণ করে এ তথ্য উঠে এসেছে।
যে ৮৫ জন এর মধ্যে ৫৪ জন শিশুর বয়স ৯ মাসের নিচে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসে মৃত ২৯ জন শিশুর মধ্যে ১৯ জনের বয়স ৯ মাসের কম। অর্থাৎ এসব শিশু টিকা গ্রহণের বয়স হওয়ার পূর্বেই হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।
মৃত বাকি ১০ জনের বয়স ১০ থেকে ১৫ মাসের মধ্যে। এই ২৯ জন শিশুর মধ্যে শিশুদের মধ্যে ২৮ জনই রাজধানীর বাইরে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসেছে।
রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে ৪৭ জন শিশুর মৃত্যু হলেও বয়স ও অঞ্চলভেদে ৩৪ জনের তথ্য পাওয়া গেছে। সেসব তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, ৩৪ জন শিশুর মধ্যে ২৯ জনের বয়স ৯ মাসের নিচে, বাকি ৫ জনের বয়স ৯ থেকে ১৫ মাসের মধ্যে।
এছাড়া মৃত্যুর শিকার হওয়া এসব শিশুদের মধ্যে ৫ জন ঢাকার ভেতরের এবং বাকি ২৯ জন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এফ এম আসমা খান বলেন, “হামে আক্রান্ত হওয়ার পর অধিকাংশ শিশুই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। যেসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাদের প্রায় সবাই অপুষ্টির শিকার ছিল। যেসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে— তাদের অধিকাংশের বয়স ৯ মাসের কম।”
তবে মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে মৃত্যু হওয়া ২৩ শিশুর মধ্যে ৭ জনের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। বাকি ১৬ জনের বয়স ১০ মাস থেকে ৩ বছর। এ হাসপাতালে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ভর্তি হওয়া ৪ হাজার ৬৭৯ জন রোগীর মধ্যে ৯ মাসের কম বয়সী রোগীর সংখ্যা ৮০০ জন, যা মোট রোগীর ১৭ শতাংশ। এছাড়া ১০ মাস থেকে ২ বছরের মধ্যে হাম ও হাম উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ২৪৩ জন, যা মোট রোগীর ২৬ শতাংশ। ২ থেকে ৫ বছর বয়সী ৯৫৩ জন, ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী ৬১৪ জন, ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী ৩২৩ জন, ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৪৮৮ জন এবং ৩০ বছরের ঊর্ধ্বে হাম ও হাম উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ২৫৮ জন রোগী।
এ হাসপাতালের মৃত বাচ্চাদের তথ্য নিয়ে কাজ করা ডা. মাহমুদা ইসলাম স্নিগ্ধা বলেন, “আমরা মৃত শিশুদের মধ্যে ৩ থেকে ৪ জন পেয়েছি যারা অ্যাসপিরেশন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। অর্থাৎ বাচ্চাদের শোয়ানো অবস্থায় খাবার খাওয়ানোর কারণে খাবার পাকস্থলীতে না গিয়ে সরাসরি ফুসফুসে চলে গেছে। এ কারণে সেখানে ইনফেকশন দেখা দিয়েছে। এছাড়া মারা যাওয়া অন্যান্য বাচ্চাদের হামের সঙ্গে অধিকাংশেরই নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ, হার্ট ফেইলর ও ডায়রিয়া ছিল।”
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) এমআইএস শাখার তালিকায় ২১ জেলায় ৬০টি নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মৃত শিশুদের প্রায় অর্ধেকের টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি। মৃতদের মধ্যে ২৯ জন শিশু ৯ মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই মারা গেছে। এর মধ্যে ১৫ জন শিশুর বয়স ছিল ছয় মাস বা তারও কম। দেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ৯ মাস বয়সে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়। ফলে এসব শিশু টিকা পাওয়ার আগেই সংক্রমিত হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “সাধারণত বুকের দুধ খাওয়া শিশুরা মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির কারণে অন্তত ৯ মাস পর্যন্ত হাম থেকে সুরক্ষিত থাকে। এ কারণেই ৯ মাস বয়সে প্রথম টিকা দেওয়া হয়। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু শিশুর ক্ষেত্রে ছয় মাস বয়স থেকেই এই সুরক্ষা কমতে শুরু করতে পারে। এবার ছড়ানো হামের ভাইরাসে আগের স্ট্রেইনের তুলনায় কোনো মিউটেশন বা গঠনগত পরিবর্তন হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। এ বিষয়ে গভীর বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।”
উল্লেখ্য, গত মার্চ মাস থেকে এ পর্যন্ত দু’মাসে সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৪৩৯ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ৭০ জন ও হাম উপসর্গে মারা গেছে ৩৬৯ জন। একই সময়ে সারাদেশে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৭ হাজার ৩০৫ জন, আর হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ৫৪ হাজার ৪১৯ জন। আক্রান্ত ও হামে মৃত্যুর সংখ্যা ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি। এ বিভাগে হাম উপসর্গে মারা গেছে ১৯২ জন ও আক্রান্ত হয়েছে ২৯ হাজার ৪৮১ জন।
