✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
দেশের বিভিন্ন স্থানে গত এক সপ্তাহে বজ্রপাতে অন্তত ৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে। রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঝুঁকি হ্রাস ও প্রস্তুতি’ শীর্ষক এক কর্মশালায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মমিনুল ইসলাম এ তথ্য তুলে ধরেন।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহযোগিতায় ব্র্যাক এই কর্মশালার আয়োজন করে।
সভাপতির বক্তব্যে মমিনুল ইসলাম বলেন, চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত বজ্রপাতে ৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে। তিন দিন আগে থেকেই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগাম সতর্কবার্তা অনুযায়ী সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হলেই সতর্কবার্তা কার্যকর হয়। এ ক্ষেত্রে সব স্তরের সমন্বিত উদ্যোগ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
কর্মশালায় জানানো হয়, দেশে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার তুলনায় বজ্রপাতে প্রতিবছর বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বজ্রপাতে মারা গেছেন তিন হাজার ৪৮৫ জন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবু দাউদ মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, উচ্চ জনঘনত্বের কারণে কৃষক, শিশু-কিশোর ও নারীরা বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রাণহানি কমাতে আগাম পূর্বাভাস জোরদার, সচেতনতা বৃদ্ধি, বজ্রনিরোধক যন্ত্র স্থাপন এবং নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ব্র্যাকের দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির পরিচালক লিয়াকত আলী বলেন, পূর্বাভাসের তথ্য সময়োপযোগী না হলে তা কার্যকর হয় না। তাই কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই এমন তথ্য দেশজুড়ে ব্যাপক প্রচার নিশ্চিত করতে হবে। বজ্রপাতে মৃত্যুহার কমাতে সময়মতো পূর্বাভাস এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রের আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক। তিনি দেশের বজ্রপাতের প্রবণতা, ঝুঁকি এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
এতে রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি-হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (রাইমস), ইউএনডিপি, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল ও ব্র্যাকের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়ে বজ্রপাত মোকাবিলায় চলমান কার্যক্রম ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ব্র্যাকের দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির প্রধান খন্দকার গোলাম তৌহিদ। পরে প্যানেল আলোচনায় বক্তারা দুর্গম এলাকায় আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং জনসচেতনতার ঘাটতিকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেন। পাশাপাশি প্রাণহানি কমাতে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন তারা।
বাংলাদেশে সাধারণত মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে সবচেয়ে বেশি বজ্রঝড়-বজ্রপাত হয়। এই দুর্যোগ সবচেয়ে বেশি হয় সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলায়। এরমধ্যে জামালগঞ্জ উপজেলাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। গত এক দশকে বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে এই উপজেলাতেই।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সারা দেশে বজ্রপাতে তিন হাজার ৬৫৮ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ২০১৫ সালে ২২৬ জন, ২০১৬ সালে ৩৯১ জন, ২০১৭ সালে ৩৮৮ জন, ২০১৮ সালে ৩৫৯ জন, ২০১৯ সালে ৪০১ জন, ২০২০ সালে ৪২৭ জন, ২০২১ সালে ৩৬৩ জন, ২০২২ সালে ৩৩৭ জন, ২০২৩ সালে ৩২২ জন, ২০২৪ সালে ২৭১ জন এবং ২০২৫ সালে ১৭৩ জনের মৃত্যু হয়।
নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মৌলভীবাজার, রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, ফরিদপুর, মাদারীপুর, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, বরিশালের খেপুপাড়াসহ আরও কিছু এলাকায় তুলনামূলক বেশি বজ্রপাত হয়। মূলত ভৌগোলিক অবস্থান ও আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্যের কারণে সিলেটে বজ্রপাত বেশি ঘটে।
জলীয় বাষ্প সমৃদ্ধ এলাকার আশেপাশেই বজ্রপাত বেশি হয় বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক। তিনি বলেন, সিলেট অঞ্চলে বড় বড় হাওর রয়েছে, যা থেকে প্রচুর জলীয়বাষ্প তৈরি হয়। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা জলীয়বাষ্প সমৃদ্ধ বাতাস দক্ষিণ-পশ্চিম দিক দিয়ে সিলেট অঞ্চলে প্রবেশ করে। এই আর্দ্র বাতাস সিলেটের উত্তর-পূর্ব দিকের পাহাড়ের সঙ্গে সংঘর্ষে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে দ্রুত উপরের দিকে উঠে যায়। এই উর্ধ্বগামী আর্দ্র বাতাস ঠান্ডা হয়ে ঘনীভূত হলে মেঘ তৈরি হয়, বিশেষ করে কিউমুলোনিম্বাস বা বজ্রমেঘ। এই প্রক্রিয়াই বজ্রঝড় ও বজ্রপাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
এছাড়া উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা শুষ্ক ও গরম বাতাসের সঙ্গে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বাতাসের সংঘর্ষও বজ্রপাতের একটি বড় কারণ। এই দুই ধরনের বাতাসের মিলনস্থল হিসেবে সিলেটসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং দেশের কিছু উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর অন্যতম কারণ খোলা জায়গায় মানুষের উপস্থিতি। কৃষক, জেলে বা মাঠে কাজ করা মানুষরা ঝড়ের সময়ও বাইরে থাকেন, ফলে ঝুঁকি বেড়ে যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, বজ্রপাতের সময় সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হলো ঘরের ভেতর থাকা। খোলা মাঠ, জলাশয় বা উঁচু গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া বিপজ্জনক।
