কলকাতায় হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশিসহ ৯ মৃত্যু

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এক শিশুসহ ৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৬ জন। নিহত এবং আহতদের বেশিরভাগ বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন।

কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ৮ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। তাদের পরিচয় এখনও জানা যায়নি। ফায়ার সার্ভিসের বরাত দিয়ে এনডিটিভি জানিয়েছে, মৃতদের মধ্যে অনেকে বাংলাদেশি নাগরিক। 

সংবাদ সংস্থা এএনআই জানিয়েছে, তারা চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসেছিলেন। এছাড়া নিহতদের মধ্যে অন্য একজনকে ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, হোটেলের তিন তলায় রাত ২টা ৭ মিনিটে আগুন লাগে। আগুন ছড়িয়ে পড়ে অন্তত চারটি ঘরে। চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ঘুম ভেঙে যায় হোটেলের বাসিন্দাদের। আগুন দ্রুত আশেপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে হোটেলের কক্ষগুলো ঘন কালো ধোঁয়ায় ভরে যায়। এতে হোটেলের বাসিন্দা আতঙ্কিত হয়ে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করেন। জীবন বাঁচাতে হুড়োহুড়ি করে বাইরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন। তবে ধোঁয়ার কারণে হোটেল থেকে বের হওয়ার সুযোগ পাচ্ছিলেন না তারা। অনেকেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। 

রাত ২টা ৭ মিনিটে ফায়ার সার্ভিসকে অগ্নিকাণ্ডের বিষয়টি জানানো হয়। খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের ৪টি ইঞ্জিন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এর পাশাপাশি একটি বিপর্যয় মোকাবিলা দলও (ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট টিম) উদ্ধার কাজে যোগ দেয়। দমকলকর্মীরা ভবনের ভেতরে আটকে পড়া মানুষদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুনে হোটেলের একাংশ পুড়ে যায়।  

প্রাথমিক তদন্তের বরাতে এনডিটিভি জানিয়েছে, হোটেলটিতে ন্যূনতম অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। এই ঘটনায় কলকাতা পুলিশ একটি মামলা করেছে। হোটেলের মালিক ও কর্মীরা পলাতক রয়েছেন। পুলিশ তাদের খুঁজছে। 

উদ্ধার অভিযানে গিয়ে ভবনটি থেকে প্রায় ৬০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোটেলের তৃতীয় তলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। একটি এয়ার কন্ডিশনার (এসি) বিস্ফোরণের কারণে এই আগুন লেগে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

দমকলকর্মীরা হোটেলের ভেতর থেকে অজ্ঞান অবস্থায় ৯ জনকে উদ্ধার করে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। হাসপাতাল সূত্রে খবর, তাদের সকলকেই মৃত অবস্থায় আনা হয়েছিল। অগ্নিকাণ্ডের সময় আহত কয়েকজনকে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ এলাকাটি ঘিরে রেখে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। গুরুতর আহত ৬ জনের চিকিৎসা চলছে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে। 

একজন পুলিশ কর্মকর্তারে বরাত দিয়ে সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, ঘন ধোঁয়ার কারণে দমকলকর্মীদের জন্য সিঁড়ি বেয়ে ওপরের তলাগুলোতে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত নয়জন মারা গেছেন। তবে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল অগ্রাধিকার ছিল আটকে পড়াদের উদ্ধার করা এবং আগুনের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা। বর্তমানে আগুন সম্পূর্ণ নেভানো সম্ভব হয়েছে।’

কলকাতার এই হোটেলে আগুনের দুদিন আগে ১৭ আগস্ট ভোরে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার তারাপীঠের ‘হোটেল বিদেশিনী’ তে আরেকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই আগুনে অন্তত আটজনের মৃত্যু এবং ১৩ জন আহত হন। ভোর সাড়ে ৪টার দিকে পাঁচতলা হোটেলের নিচতলায় আগুন লাগে যখন বেশিরভাগ বাসিন্দাই ঘুমে ছিলেন। হোটেলটি তারাপীঠ মন্দিরের কাছেই অবস্থিত। এই অগ্নিকাণ্ডে মেঘালয়ের একই পরিবারের দুই শিশুসহ পাঁচজন সদস্য মারা যান। সেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ওই দিন রাতেই হোটেলের মালিক ও তার ছেলেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সেই রেশ কাটতে না কাটতে আবার আরেকটি অগ্নিকাণ্ড ঘটলো

কলকাতার অগ্নিকাণ্ডে বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশির লেখা

বাংলাদেশি ডিজাইনার ও উদ্যোক্তা অনিক কুণ্ডু লিখেছেন, আপনার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন যারা কলকাতা ভ্রমণে এসেছে বা ডাক্তার দেখাতে কলকাতা এসেছে তাদের খোঁজ নিন। গতকাল (১৯ আগস্ট) রাত ২টায় মির্জা গালিব স্ট্রিট, নিউমার্কেট এলাকায় ফায়ার ব্রিগেডের পাশের বিল্ডিং–এ আগুন লাগে।

উল্লেখ্য, এই বিল্ডিংসহ আশেপাশে এলাকা বাংলাদেশ অধ্যুষিত (বাংলাদেশিরা কলকাতায় এলে সাধারণত এই এলাকায় বেশি থাকেন) । রাত ২টায় আগুন লাগে লবিতে ২য় ফ্লোরে। আমরা থার্ড ফ্লোরে ছিলাম। আমি, বাবা, মা ও পাশের রুমের কাপল ও তাঁদের বাচ্চা ও একটা ভাইয়া সবাই বাংলাদেশি আটকে গিয়েছিলাম।

সিঁড়িতেও আগুনের প্রচন্ড ধোঁয়া থাকায় আমরা কোনভাবে ছাদে যেতে বা নিচে নামতে পারছিলাম না। কোনমতে বাথরুমের জানালা (ভেন্টিলেটর) খুলে ফায়ার সার্ভিসে কল দিয়ে জানাই যে আমরা চারতলায় আটকে আছি, আমাদের বাঁচান। নিশ্বাস নিতে পারছি না।

ইতমধ্যে বিল্ডিং-এর কাচ, এসি ব্লাস্ট করতে থাকে। আগুন মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে আনার কিছুক্ষন আগে ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা আমাদের উদ্ধার করে নিচে নামাতে সক্ষম হয়। মৃত্যুকে খুব কাছে থেকে দেখেছি। যত দূর জানি আমার চোখের সামনে ৩টি অ্যাম্বুলেন্সে মৃত/আহত দেহ নিয়ে গেছে। এখন বিল্ডিং–এ কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না। কোন হোটেলে কেউ জায়গা দিচ্ছে না। সারা রাত বাইরে থেকে মাত্র (সকালে) অন্য একটি হোটেলে উঠলাম।

তবে অনেক মানুষ মারা গেছে। এর মাঝে পুরুষ, নারী, শিশুও আছে। অধিকাংশই বাংলাদেশী হতে পারে (বা ইন্ডিয়ান), এটা আমরা জানতে পারি নাই। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সাহায্যে আমার জিনিসপত্র একটু আগে বের করে এনে অন্য হোটেলে উঠেছি। সবাই সুস্থ আছি শারীরিকভাবে। ভগবানের অশেষ কৃপায় এ যাত্রায় বেঁচে গেছি।

বাথরুমে থাকা প্রতি ন্যানো সেকেন্ডে মনে হচ্ছিল আমরা আর বাঁচব না। সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে চিকিৎসা করাতে এসে যেন মরতে এসেছি।

সিঁড়ি ও লিফটে যেমন আগুনের স্ফুলিঙ্গ দেখেছি, তা মৃত্যুকে খুব কাছে থেকে দেখার চেয়ে কম কিছু না। সবাই সুস্থ থাকুন। প্রতিটা শহর ঢাকা, কলকাতা-যেন একটা মরণ বোমা। কোথাও যেন অগ্নিনির্বাপক কোন ব্যবস্থা নাই। ব্যবসায়ীরা শুধু টাকা কামিয়েই যাবে? মানুষ জীবনের মূল্য ঠিক কোথায়? আমাদের অনেকের-ই অনেকের সঙ্গে শেষ দেখা হয়ে গেছে। যে যার সঙ্গে পারেন ভালো ব্যবহার করুন।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *