✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে বিশ্বের শ্রমবাজারে প্রবেশ করবেন প্রায় ১২০ কোটি তরুণ। অথচ এ সময়ে সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে মাত্র ৪০ কোটি। ফলে নতুন কর্মসংস্থানের চাহিদা ও সম্ভাব্য সুযোগের মধ্যে প্রায় ৮০ কোটি ব্যবধান তৈরি হতে পারে। আগামী প্রজন্মের জন্য এটিই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা।
শুক্রবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার মূল অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি এমন সতর্কবার্তা দেন। উন্নয়নের আগামী ৫০ বছরের রূপরেখা তুলে ধরে বাঙ্গা বলেন, সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ছে, ভারী হচ্ছে ঋণের বোঝা। একই সঙ্গে জ্বালানি ও সারের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে বিশ্বের জনসংখ্যার কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন ঘটছে। ফলে উন্নয়ন অর্থায়নের প্রচলিত পদ্ধতিকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে।
অজয় বাঙ্গা বলেন, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে ১২০ কোটি তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করবেন। অথচ তাদের জন্য সম্ভাব্য চাকরির সংখ্যা হবে প্রায় ৪০ কোটি। অর্থাৎ, কর্মসংস্থানের চাহিদা ও সুযোগের মধ্যে প্রায় ৮০ কোটি ব্যবধান তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই ব্যবধানের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, এর অর্থ হতে পারে—একজন তরুণীর ডিগ্রি আছে, কিন্তু চাকরি নেই। আবার একজন তরুণের পেশাগত দক্ষতা আছে, কিন্তু কাজের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ নেই। এমন পরিস্থিতিতে একটি প্রজন্ম প্রশ্ন করবে, তাদের জন্য আদৌ কোনো সুযোগ আছে কি না।
বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট বলেন, চাকরি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি মর্যাদার বিষয়। কর্মসংস্থান একজন তরুণকে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ দেয়। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো না গেলে এর নেতিবাচক প্রভাব কোনো একটি দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। একইভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে এর সুফলও বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়বে। তার মতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি তাই শুধু কোনো একটি দেশের উন্নয়নের বিষয় নয়; বরং এটি বিশ্বের সম্মিলিত ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ।
উন্নয়ন অর্থায়নের ভবিষ্যৎ কাঠামো তুলে ধরে অজয় বাঙ্গা বলেন, সরকারি অর্থ, বেসরকারি বিনিয়োগ, দাতব্য অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে হবে। তবে সব দেশের জন্য একই ধরনের অর্থায়ন কাঠামো কার্যকর হবে না। দেশের প্রয়োজন, সক্ষমতা ও ঝুঁকির ধরন অনুযায়ী অর্থায়নের সমন্বয় করতে হবে।
তিনি বলেন, যেসব দেশে প্রয়োজন ও ঝুঁকি বেশি, সেখানে সরকারি অর্থায়ন এবং স্বল্পসুদের উন্নয়ন অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে দেশগুলো নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়ে ধীরে ধীরে উন্নয়ন সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে।
বাঙ্গার বক্তব্য অনুযায়ী, যেখানে বাজার এখনও কার্যকরভাবে পৌঁছাতে পারেনি, সেখানে সরকারি অর্থায়নের ভূমিকা থাকবে। অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবহার করতে হবে বেসরকারি পুঁজি। নতুন ধারণা ও উদ্ভাবনের প্রাথমিক ঝুঁকি নিতে পারে দাতব্য অর্থায়ন। আর প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি ডলারের কার্যকারিতা বাড়াতে হবে।
বেসরকারি খাত থেকে অর্থ সংগ্রহে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের অগ্রগতির তথ্যও তুলে ধরেন অজয় বাঙ্গা। তিনি জানান, ২০২২ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় তিন হাজার ৫০০ কোটি ডলারের বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহ করা হয়েছিল। গত অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ২০০ কোটি ডলারে। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহের পরিমাণ তিন গুণের বেশি হয়েছে।
নিজস্ব অর্থায়নের সঙ্গে এই অর্থ যুক্ত করে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের মোট অর্থায়নের পরিমাণ দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়েছে বলেও ভাষণে উল্লেখ করেন তিনি।
অজয় বাঙ্গা বলেন, নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহ প্রায় তিন গুণ হয়েছে। উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে তা চার গুণ হয়েছে। আফ্রিকাজুড়েও এই অর্থায়ন দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।
তবে তার বক্তব্যে শুধু বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরই জোর দেওয়া হয়নি; এই অর্থায়নের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে বাস্তবে কতটা বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
ভাষণের শেষাংশে অজয় বাঙ্গা বলেন, গত প্রজন্মের উন্নয়ন কাঠামো হুবহু অনুসরণ না করে আগামী প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম নতুন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
এ জন্য সরকারি অর্থায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, দাতব্য অর্থায়ন ও প্রযুক্তিকে সমন্বিতভাবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাঙ্গা বলেন, কর্মসংস্থানের ঘাটতি নিয়ে যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, সেটিই যে ভবিষ্যতের অনিবার্য বাস্তবতা হবে, তা নয়। পরিস্থিতি পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ইতোমধ্যে নতুন অর্থায়ন কাঠামোর সম্ভাবনা দেখাতে শুরু করেছে। এখন প্রয়োজন সেটিকে আরও বড় পরিসরে এবং দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে উন্নয়ন অর্থায়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য উৎপাদনশীল কাজের সুযোগ তৈরি করতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
