উত্তরায় বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ড, নিহত ৬

■ নাগরিক প্রতিবেদন ■

রাজধানীর উত্তরার ১১নং সেক্টরের বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ছয়জনে দাঁড়িয়েছে। শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) সকাল ৭টা ৫০ মিনিটের দিকে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের একটি বাড়ির দ্বিতীয় তলায় আগুনের সূত্রপাত হয় বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।

প্রথমে তিনজনের মৃত্যুর খবর দেয় ফায়ার সার্ভিস। পরে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিনজন মারা যান বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার শাহরিয়ার আলী।

এরমধ্যে তিনজন একই পরিবারের সদস্য বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ভবনটির দোতলার রান্নাঘরে বৈদ্যুতিক গোলোযোগ অথবা গ্যাস লিকেজ থেকে এই আগুনের সূত্রপাত বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।    

ফায়ার সার্ভিস জানায়, সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। চার মিনিট পর, অর্থাৎ ৭টা ৫৪ মিনিটে ফায়ার সার্ভিসে খবর পৌঁছায়। সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তরা ফায়ার স্টেশন থেকে দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয় এবং সকাল ৭টা ৫৮ মিনিটে সেখানে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে।

দীর্ঘ চেষ্টা শেষে সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। পরে সকাল ১০টার দিকে আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণ করা হয়। এই ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে বলে ফায়ার সার্ভিস নিশ্চিত করেছে।

উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ জানিয়েছে নিহতদের মধ্যে ৩ জনের নাম জানা গেছে এখন পর্যন্ত।

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার দড়িপারশী গ্রামের নিহতরা হলেন: রোদেলা (১৪)— লুবনা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড কার্ডিয়াক সেন্টারে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। রোদেলার বাবার নাম শহিদুল এবং মায়ের নাম শিউলী আক্তার। মো. হারিছ উদ্দিন (৫২)— মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি মৃত হাফিজ উদ্দিন ও সাহেরা খাতুনের ছেলে। মো. রাহাব (১৭)— মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বাবা হাফিজ উদ্দিন এবং মা রিনা।

কুমিল্লা সদর উপজেলার নুনুয়া ও দিঘীরপাড় এলাকার একই পরিবারের তিন সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে মো. রিশান (বয়স: ২ মাস ৫ দিন)— ঢাকা স্পেশালাইজড হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। তার বাবার নাম ফজলে রাব্বি রিজভী এবং মা আফরোজা আক্তার সুবর্ণা। আফরোজার (৩৭) মৃত্যু হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আর ফজলে রাব্বি (৩৮) মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। তাঁর বাবার নাম কাজী খোরশেদুল আলম এবং মায়ের নাম ফেরদৌস আরা।

ফায়ার সার্ভিসের জনসংযোগ কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, আগুন লাগার পর ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়া অন্তত ১৩ জনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঘরে বিপুল পরিমাণ আসবাব থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং হতাহতের সংখ্যা বেশি হয়।

ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা জোন-৩-এর উপসহকারী পরিচালক মো. আব্দুল মান্নান জানান, প্রাথমিকভাবে শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। আগুন দ্বিতীয় তলা থেকে তৃতীয় তলায় ছড়িয়ে পড়ে।

সকাল ৮টা ২৫ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে এবং সকাল ১০টার দিকে পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয়। আগুনের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

উত্তরা পশ্চিম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রফিক আহমেদ বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত যতটুক তথ্য তদন্তে পেয়েছি যে ভবনটির দোতলায় থাকা একটি রান্নাঘর থেকে আগুনে সূত্রপাত হয়েছে। সেটি ওই রান্নাঘরের বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে হতে পারে নয়তো গ্যাস লিকেজ থেকে হতে পারে। তবে এ বিষয়ে আমরা এখনো নিশ্চিত নই।

দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।

রফিক আহমেদ জানান, নিহতদের মধ্যে তিনজনের মরদেহ রয়েছে উত্তরা কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে, উত্তরায় অন্য আরেকটি হাসপাতালে দুজনের মরদেহ আর সর্বশেষ যে মৃত্যুর সংবাদ পাই সেই মরদহটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হয়েছে। এই ঘটনায় সর্বমোট কতজন আহত হয়েছেন তা জানতে আমাদের বিভিন্ন টিম কাজ করছে।

আফরোজার মামাতো ভাই মো. আবু সাইদ জানান, ফজলে রাব্বির বাড়ি কুমিল্লা সদর উপজেলার নানুয়া দিঘিরপাড়। তিনি ওষুধ প্রস্তুতকারক এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের কর্মরত। আর তাঁর স্ত্রী আফরোজা আক্তার স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ। তাঁদের দুই ছেলে ফাইয়াজ ও রাফসান।

তিনি জানান, স্বামী-স্ত্রী দুজনই কর্মজীবী হওয়ায় তাঁদের দুই ছেলে উত্তরাতেই নানির বাসায় থাকত। আজ শুক্রবার অফিস বন্ধের দিন হওয়ায় গতরাতেই ছোট ছেলেকে নানির বাসা থেকে মায়ের বাসায় নিয়ে আসেন। আজ সকালে ওই বাসায় আগুনের সংবাদ পান স্বজনেরা।

আফরোজার বোন আফরিন জাহান জানান, আফরোজাকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসার পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পরিবারের বাকি দুজনের মরদেহ কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। সবাই ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। শরীরে কোথাও দগ্ধ হয়নি।

জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান জানান, আফরোজাকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। তবে তাঁর শরীরে কোনো পোড়া ক্ষত নেয়। ধোয়ায় অসুস্থ হয়ে তিনি মারা গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে মৃত্যুর সংবাদ জানার সঙ্গে সঙ্গে মরদেহ আবার উত্তরা নিয়ে চলে যায়।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *