■ আদনান আরিফ সালিম ■
মধ্যপ্রাচ্যের আগুনে রুটি সেঁকার নতুন সুযোগ এসেছে ইরানের, পুরাতন সব কাহিনীকে উল্টে দিয়ে, সাল্টে নিতে চাইছে তারা তাদের নতুন হিসাব। হামাস, হিজবুল্লাহ আর হুতিদের শক্তি বেড়েছে। বাশারবিহিনী সিরিয়া থেকেও আসছে আওয়াজ। আর এটা তো প্রমানিত ইতিহাস কখনও কখনও এমন এক দরজা খুলে দেয়, যা বহুদিন ধরে বন্ধ বলে মনে হয়েছিল। ইরানের সামনে আজ যেন তেমনই এক বিরল সুযোগ এসে দাঁড়িয়েছে।
যে ভবিষ্যত ইরানের জন্য অধরা, অনিশ্চিত, কিন্তু সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ। সে কারণেই তেহরান এবার যুদ্ধের ইতি টানতে তাড়াহুড়ো করছে না। ওয়াশিংটন থেকে একের পর এক বার্তা, ট্রাম্পের মুখে প্রতি ঘণ্টায় নতুন নতুন উচ্চারণ, এমনকি মস্কোর দিকেও কূটনৈতিক প্রার্থনা। ইরান তাদের চাইলেই য়ে বের করে দেখিয়ে দিতে পারে, সব মিলিয়েও যুদ্ধবিরতির টেবিলে ইরানকে পুরোপুরি আনা যাচ্ছে না। প্রশ্ন জাগে, কেন? ট্রাম্প বলছেন, যুদ্ধ নাকি জিতে গেছেন তিনি; যে উদ্দেশ্যে হামলা, তা নাকি অর্জিত।
প্রিয় পাঠক, খেয়াল করুন… বিজয়ের সংজ্ঞা কি শুধুই শিশুদের রক্ত, নারীদের আর্তচিৎকার অসহায়ের বোবা কান্না কিংবা বিস্ফোরণের শব্দে লেখা যায়? যদি সত্যিই লক্ষ্য পূরণ হয়ে থাকে, তবে কি ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে? জনগণ কি রাস্তায় নেমে এসে ক্ষমতার পালাবদল দাবি করেছে? ইরানের পরমাণু অবকাঠামো কি সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে? তার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনভাণ্ডার কি নিশ্চিহ্ন? সর্বোপরি, যাকে ঘিরে এত আপত্তি, এত অস্বস্তি, সেই নেতৃত্বই যদি আরও দৃঢ় হয়ে ফিরে আসে, তবে বিজয়ের মুকুট কার মাথায়?
দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কেবল মিত্র আরব শাসকদের নিরাপত্তা বলয় ছিল না; এর অন্তরালে ছিল আরও বৃহত্তর এক ভূরাজনৈতিক নকশা। ইসরায়েলের কৌশলগত নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ, ইরান ও তুরস্ককে চাপের মধ্যে রাখা, রাশিয়া ও চীনের অগ্রযাত্রা সীমিত করা, এবং অবশ্যই জ্বালানি অর্থনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রভাব বিস্তার এসবই সেই অদৃশ্য মানচিত্রের রেখা। মরুভূমির বুকে গড়ে ওঠা প্রতিটি মার্কিন ঘাঁটি ছিল শুধু সামরিক স্থাপনা নয়; তা ছিল আধিপত্যের স্তম্ভ।
বাস্তবতা হলো, যুদ্ধের প্রারম্ভিক অভিঘাতের পর যে দৃশ্যপট তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা ঘটেনি। উল্টো, ইরানের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও জাতীয় মনস্তত্ত্ব যেন আরও অনমনীয় হয়ে উঠেছে। যাকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা ছিল, তাকেই ঘিরে জনসমর্থনের ঢেউ দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র আসলে যার গোমাসা হোমাসা করতে চেয়েছিল সেই উল্টো টুপকি মেরে খাল করে দিয়েছে তাদের। যে দেশটাকে ঘাড় ধরে নতজানু করার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। সে রাষ্ট্রই আজ চির উন্নত মম শির। ঘাড় তুলে তারাই বলছে শেষ সিদ্ধান্ত আমাদের।
আমার চিন্তায় এখানেই মূল প্রশ্ন: ট্রাম্প বা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের অর্জন আসলে কোথায়? যুদ্ধ তারা শুরু করেছে, কিন্তু শেষ করার ক্ষমতা কি এখনো তাদের হাতেই আছে? যুদ্ধের প্রাথমিক আঘাত হানার সামরিক সুবিধা এক জিনিস; কিন্তু যুদ্ধের রাজনৈতিক পরিণতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সেই দ্বিতীয় খেলায় বল যেন এখন ইরানের পায়ে। আর তেহরান বুঝেছে এ সুযোগ বারবার আসে না; এই গোলপোস্ট সামনে রেখে এবার শট মিস করা চলবে না। প্রতিটি কিকে গোল আদায় করতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কেবল মিত্র আরব শাসকদের নিরাপত্তা বলয় ছিল না; এর অন্তরালে ছিল আরও বৃহত্তর এক ভূরাজনৈতিক নকশা। ইসরায়েলের কৌশলগত নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ, ইরান ও তুরস্ককে চাপের মধ্যে রাখা, রাশিয়া ও চীনের অগ্রযাত্রা সীমিত করা, এবং অবশ্যই জ্বালানি অর্থনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রভাব বিস্তার এসবই সেই অদৃশ্য মানচিত্রের রেখা। মরুভূমির বুকে গড়ে ওঠা প্রতিটি মার্কিন ঘাঁটি ছিল শুধু সামরিক স্থাপনা নয়; তা ছিল আধিপত্যের স্তম্ভ।
এর বিপরীতে ইরানও তার নিজস্ব প্রভাববলয় নির্মাণ করেছিল নানাভাবে কিংবা নানা নামে। তারা লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনে হুতি, গাজায় হামাস এবং আরও নানা প্রক্সি শক্তির মধ্য দিয়ে খেলা দেখতো। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই বলয় ধাক্কা খেয়েছে, ভেঙেছে, ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। ইসরায়েলি ও মার্কিন কৌশল, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং আঞ্চলিক প্রতিরোধে ইরানের বহুস্তরীয় ক্ষমতা কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। কয়েক দশকের শ্রমে গড়া সেই নেটওয়ার্ককে হুবহু পুনর্গঠন করা প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি।
মোসাহেব আরব দেশগুলোর উলঙ্গ রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে বসানো মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের জন্য শুধু সামরিক প্রতিপক্ষ নয়। তা তার পুনরুত্থানের পথে সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক বাধা। কিন্তু এতদিন সেই ঘাঁটিগুলোতে সরাসরি আঘাত হানার পথ ছিল সংকীর্ণ; কারণ সেই আঘাতের অর্থ দাঁড়াত আরব রাষ্ট্রগুলোর ভূখণ্ডে হামলা, আর তা পুরো মুসলিম বিশ্বের একাংশকেও ইরানের বিরুদ্ধে ঠেলে দিতে পারত। তেহরান জানত, সামরিক আক্রমণের চেয়েও কখনও কখনও রাজনৈতিক বৈধতা বেশি মূল্যবান যা এবার তারা পেয়েছে।
যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা মাঝে মাঝে নৈতিক সমীকরণও বদলে দেয়। ইরান এখন মনে করছে, সাম্প্রতিক সংঘাত, বেসামরিক মৃত্যুর মর্মন্তুদ দৃশ্য, এবং গাজাকে ঘিরে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ; সব মিলিয়ে এমন এক আবহ তৈরি হয়েছে, যেখানে আরব ভূখণ্ডে মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানার প্রশ্নে আগের মতো একতরফা নিন্দা নেমে নাও আসতে পারে। আরব শাসকদের জন্যও পরিস্থিতি কঠিন: একদিকে মার্কিন মিত্রতার বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে নিজেদের জনগণের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ। এই দ্বৈত চাপে তারা যেন সত্যিই এক মাইনক্ষেত্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে।
পানিশোধনকেন্দ্র বা ওয়াটার ডেস্যালিনেশন প্ল্যান্টের প্রসঙ্গ এ কারণেই এত তাৎপর্যপূর্ণ। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর অস্তিত্ব, নগরসভ্যতা, এমনকি দৈনন্দিন জীবনও অনেকাংশে এই অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। যদি যুদ্ধ সাগরের তটরেখা থেকে সেই সুপেয় পানির জলরেখায় গিয়ে ঠেকে, তবে মরুভূমির রাজনীতিতে আগুনের চেয়েও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে পানির সংকট।
আর সেই আশঙ্কাই আরব রাষ্ট্রগুলোকে আরও বেশি অস্বস্তির ভেতর ফেলছে। তাদের অনেকেরই টুপকিতে টোল পড়ে টুকটুকে লাল, তবু দাঁত ক্যালানে হাসি ধরে রেখে মুখে। কারণ তারা জানে, একটি ক্ষেপণাস্ত্র কখনও কখনও একটি সামরিক ঘাঁটির চেয়ে বড় প্রতীকী অভিঘাত তৈরি করতে পারে। আর সেই আঘাত অভিঘাতের রসায়ন এবার সবাইকে সইতে হবে, ক্ষতিটাও বইতে হবে।
সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতনের পর ইরানের জন্য এটি নিছক আরেকটি যুদ্ধ নয়; এটি পুনর্বিন্যাসের সম্ভাব্য মুহূর্ত। যে আঞ্চলিক ক্ষমতার কাঠামো ক্ষয়ে গিয়েছিল, তাকে নতুন কৌশলে, নতুন ভাষ্যে, নতুন লড়াইয়ের মানসিকতায় পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ হয়তো এখানেই। হিজবুল্লাহ ও হুতির মতো গোষ্ঠীগুলোর নতুন নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত তেহরানকে আরও সাহস জোগাচ্ছে। তারা যদি আবারও প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে, তবে ইরান তার ক্ষয়িষ্ণু প্রভাববলয়কে নতুন রক্ত দিতে পারবে।
প্রশ্নটি তাই সহজ অথচ গভীর: ইরানের এখন যুদ্ধ থামানোর তাড়া কোথায়?
ট্রাম্পের ইরানীদের একটা বড় অংশকে ক্ষ্যাপাতে পারলেও তারা যদি মৃত্যুকেও অবধারিত নিয়তি বলে মেনে নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে তাইলে কী করার আছে?
শিশুদের রক্ত, ইরানী নারীদের হাহাকার আর খামেনির শাহাদাত মিলেমিশে এ সংঘাত এখন শুধু ভূখণ্ডের নয়, ইরানিদের হাজার বছরে তিল তিল গড়ে তোলা মনস্তত্ত্বেরও। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে তাই আজ যে আগুন জ্বলছে, তা শুধু বোমা ও প্রতিশোধের আগুন নয়; এটি ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের আগুন, ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের আগুন। যেন সুকান্ত বলতে চাইছে জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়।
লেখক: গবেষক, লেখক এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপেন স্কুলের ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক
