■ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ■
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেছেন, ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি নিহত হয়েছেন। এ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
রাতভর হামলায় ইরানের প্রভাবশালী জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানিকে ইসরায়েল লক্ষ্যবস্তু করেছে বলে মঙ্গলবার ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কান জানিয়েছে, লারিজানি ‘হত্যাচেষ্টার লক্ষ্যবস্তু’ ছিলেন। অন্যদিকে টেলিভিশন চ্যানেল এন১২ জানিয়েছে, হামলার ফলাফল ‘এখনো পর্যালোচনা করা হচ্ছে’।
সেই সঙ্গে ইরানের বাসিজ ইউনিটের কমান্ডার গোলামরেজা সোলাইমানিও নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)
এ বিষয়ে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।ইসরায়েলের সামরিক প্রধান এয়াল জামির এক বিবৃতিতে বলেছেন, রাতে ‘গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক সাফল্য অর্জিত হয়েছে’।
ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরে দশকের পর দশক ধরে সংযত ও বাস্তববাদী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত আলি লারিজানি দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইরানের কৌশল নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছেন।
১৯৫৮ সালে ইরাকের নাজাফে জন্ম নেওয়া লারিজানির পরিবারের আদি নিবাস ইরানের আমোল। ধনী এই পরিবারটি শক্তিশালী এক রাজনৈতিক-ধর্মীয় বংশ, যাকে টাইম ম্যাগাজিন একসময় ‘ইরানের কেনেডি পরিবার’ বলে আখ্যা দিয়েছিল।
তাঁর বাবা ছিলেন প্রভাবশালী ধর্মীয় পণ্ডিত। মাত্র ২০ বছর বয়সে লারিজানি ফারিদে মোতাহারিকে বিয়ে করেন, যিনি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা রুহুল্লাহ খোমেনির ঘনিষ্ঠ সহচরের কন্যা। সমসাময়িক অনেকের তুলনায় তাঁর শিক্ষাগত পটভূমি ছিল বেশি ধর্মনিরপেক্ষ। তিনি গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরে পাশ্চাত্য দর্শনে ডক্টরেট সম্পন্ন করেন, যার মূল বিষয় ছিল ইমানুয়েল কান্ট।
এরপর, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর তিনি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীতে (আইআরজিসি) যোগ দেন। পরে সরকারি দায়িত্বে আসেন, সংস্কৃতিমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেন এবং এরপর রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিংয়ের (আইআরআইবি) প্রধান হন।
রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে ২০০৫ সালে তিনি সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব ও ইরানের প্রধান পারমাণবিক আলোচক নিযুক্ত হন, তবে ২০০৭ সালে পদত্যাগ করেন। ২০০৮ সালে তিনি এমপি নির্বাচিত হন এবং পরপর তিন মেয়াদে পার্লামেন্টের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি অনুমোদন নিশ্চিত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
সর্বশেষ, ২০২৫ সালের আগস্টে লারিজানি আবারও নিরাপত্তা পরিষদের সচিব পদে ফিরে আসেন এবং ইরানের নেতৃত্বের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে পুনরায় আবির্ভূত হন।
লারিজানি ২০০৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে একজন রক্ষণশীল প্রার্থী হিসেবে লড়েছিলেন, কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে উঠতে পারেননি। একই বছর তিনি ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি ও দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রধান আলোচক হিসেবে নিয়োগ পান।
তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনেজাদের পারমাণবিক নীতির সঙ্গে দূরত্ব বাড়ায় ২০০৭ সালে লারিজানি এসব পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কোম থেকে একটি আসন জিতে ২০০৮ সালে লারিজানি ইরানের পার্লামেন্টে (মজলিস) আসেন। তিনি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পান। ফলে তাঁর প্রভাব আরও বেড়ে যায়। তিনি পারমাণবিক বিষয়েও সম্পৃক্ততা বজায় রেখে ২০১৫ সালের ইরান ও বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যকার পারমাণবিক চুক্তি ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’‑পার্লামেন্টে অনুমোদন নিশ্চিত করেন।
২০২০ সালে সংসদের স্পিকার ও পার্লামেন্ট সদস্যের পদ ছাড়ার পর লারিজানি ২০২১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে এবার তাঁকে প্রার্থিতা যাচাই করা সংস্থা গার্ডিয়ান কাউন্সিল অযোগ্য ঘোষণা করে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আবারও প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করলে তাঁকে আবার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।
গার্ডিয়ান কাউন্সিল প্রেসিডেন্ট পদে লারিজানির অযোগ্যতার কারণ প্রকাশ করেনি। তবে বিশ্লেষকেরা ২০২১ সালের পদক্ষেপটিকে কট্টরপন্থী ইব্রাহিম রাইসির পথ সুগম করার উপায় হিসেবে দেখেছেন, যিনি সেই নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন। লারিজানি ২০২৪ সালে অযোগ্য ঘোষণার সিদ্ধান্তকে ‘অস্বচ্ছ’ বলে সমালোচনা করেছিলেন।
অবশ্য ২০২৫ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান লারিজানিকে আবার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ দেন। এভাবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ এই পদে ফিরে আসেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই লারিজানির অবস্থানে অনমনীয়তা লক্ষ করা গেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে খবর আসে, লারিজানি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গে একটি সহযোগিতা চুক্তি বাতিল করেছেন। তিনি ঘোষণা দেন, সংস্থাটির প্রতিবেদনগুলো ‘আর কার্যকর নয়’।
কঠোর অবস্থান সত্ত্বেও লারিজানিকে প্রায়ই বাস্তববাদী ও ইরানি শাসনব্যবস্থার ভেতরে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যিনি সমঝোতায় আগ্রহী হতে পারেন। মূলত ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতে তাঁর সমর্থনের কারণেই এমনটি মনে করা হয়।
বর্তমান উত্তেজনা বৃদ্ধির মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে লারিজানি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে। ওমানের মধ্যস্থতায় গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত আলোচনায় তিনি উল্লেখ করেন, তেহরান ওয়াশিংটনের কাছ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পায়নি। এ সময় তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, তারা একটি ‘যুদ্ধ বাধানোর’ উদ্দেশ্যে কূটনৈতিক পদক্ষেপকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর আগে আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লারিজানি আলোচনার বিষয়ে তাঁর দেশের অবস্থানকে ‘ইতিবাচক’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। সে সময় তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পেরেছে যে সামরিক পথ কোনো টেকসই সমাধান নয়। লারিজানি বলেন, আলোচনার পথ বেছে নেওয়াই একটি যৌক্তিক পদক্ষেপ।
তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা সেই কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।
সর্বশেষ ভাষণে লারিজানি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী নেতৃত্ব নির্বাচনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, নেতাদের হত্যা করে ইরানকে অস্থিতিশীল করা যাবে ভাবলে, সেটা হবে অলীক কল্পনা।
লারিজানি স্পষ্ট করে বলেন, ‘আঞ্চলিক দেশগুলোতে হামলা চালানোর কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত যেকোনো ঘাঁটিকে আমরা লক্ষ্যবস্তু করছি।’
খামেনি আর বেঁচে নেই এবং পুরো অঞ্চল এখন এক ভয়াবহ সংকটের দ্বারপ্রান্তে। এমন পরিস্থিতিতে লারিজানি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ‘আগে কখনো দেখেনি এমন শক্তি’ দিয়ে পাল্টা জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।
মাসুদ পেজেশকিয়ান, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা,
