জঙ্গি সম্পৃক্ততা: বিমানবাহিনীর ২০ জন আটক

✍︎ বিশেষ প্রতিবেদক ✍︎

নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) আস্তানায় চট্টগ্রামের বিমানবাহিনী ঘাঁটি থেকে নিখোঁজ একজন ওয়ারেন্ট অফিসারের সন্ধান পাওয়া গেছে।

বিমানবাহিনীর অভ্যন্তরে উগ্রবাদী সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখতে বাহিনীতে শুরু হয়েছে শুদ্ধি অভিযান। নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ইউনিটের একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

গত এক সপ্তাহে বিমানবাহিনীর ২০ জনেরও বেশি সদস্যকে আটক করা হয়েছে। আটক হওয়াদের মধ্যে ওই ওয়ারেন্ট অফিসার ছাড়াও আছেন দুইজন স্কোয়াড্রন লিডার, ১০ জন জুনিয়র কমিশনড অফিসার ও বিমানসেনা এবং একজন ইমাম।

এ ঘটনার পর বিমানবাহিনীর বিভিন্ন ঘাঁটিতে সমন্বিত অভিযান চালানো হচ্ছে। বাহিনীর ভেতরে গত কয়েক মাস ধরে কোনো নিয়োগ নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল কি না তদন্তকারীরা তা খতিয়ে দেখছেন। এ ছাড়া কোনো স্পর্শকাতর তথ্য পাচার হয়েছে কি না এবং বাংলাদেশ থেকে নিয়োগকৃত ব্যক্তিদের বিদেশে জঙ্গি কার্যকলাপে পাঠানো হয়েছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মূলত চট্টগ্রামের বিএএফ জহুরুল হক ঘাঁটিতে কর্মরত ওই ওয়ারেন্ট অফিসার কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার পর থেকে তদন্ত শুরু হয়। তিনি প্রায় দুই মাস ধরে বিনা ছুটিতে নিখোঁজ ছিলেন। পরবর্তীতে টিটিপির একটি আস্তানা থেকে তাকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়। টিটিপি পাকিস্তানে শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার নামে সশস্ত্র লড়াই চালানো একটি নিষিদ্ধ জঙ্গি গোষ্ঠী।

বাংলাদেশে টিটিপির তৎপরতার বিষয়টি প্রথম সামনে আসে গত বছর। তখন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয় যে, অন্তত চারজন বাংলাদেশি টিটিপির হয়ে লড়াই করার সময় পাকিস্তানে সে দেশের বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আরও বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি পাকিস্তানে গিয়ে এই গোষ্ঠীর হয়ে যুদ্ধ করছেন।

তদন্তকারীরা জানান, আটক হওয়া ওয়ারেন্ট অফিসারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তার দাবি অনুযায়ী বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি পাকিস্তানে গিয়ে টিটিপিতে যোগ দিয়েছেন এবং সেখানে লড়াইয়ে অংশ নিয়েছেন।

এই তথ্যের ভিত্তিতে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বিএএফ ঘাঁটি জহুরুল হক, বিএএফ ঘাঁটি এ কে খন্দকার এবং বিএএফ ঘাঁটি মতিউর রহমানে অভিযান চালায়। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, কক্সবাজারের একটি ইউনিটসহ বিভিন্ন স্কোয়াড্রনের সদস্যদের সঙ্গে এই যোগসূত্র থাকতে পারে। তবে কার কতটুকু সংশ্লিষ্টতা রয়েছে তা এখনো যাচাই করা হচ্ছে।

আটক ওয়ারেন্ট অফিসার দাবি করেন, কয়েক মাস ধরে টিটিপির জন্য সদস্য সংগ্রহের কাজ চলছিল। এই প্রক্রিয়ায় বিমান বাহিনীর আরও সদস্য জড়িত থাকতে পারেন বলে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন। সূত্র জানায়, বিএএফ ঘাঁটির একটি মসজিদের ইমামকে এই চক্রের মূল রিক্রুটার বা নিয়োগকারী হিসেবে সন্দেহে আটক করা হয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন এমন অন্তত ছয়জন ওয়ারেন্ট অফিসার বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে তারা তুরস্ক, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড ও পর্তুগালে পালিয়ে গেছেন। এটি তদন্ত প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে এবং ঘটনার একটি আন্তর্জাতিক যোগসূত্র তৈরি করেছে।

ওই ওয়ারেন্ট অফিসারের তথ্যের বাইরেও তারা পলাতক কর্মকর্তাদের কিছু ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করেছেন। এসব ডিভাইস থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই অন্যদের আটক করা সম্ভব হয়েছে।

কক্সবাজারের উখিয়া এলাকায় একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের চেষ্টার ইঙ্গিত পাওয়ার পর গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সামরিক বাহিনীর স্পর্শকাতর তথ্য ফাঁসের মতো ঝুঁকির বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে।

কর্মকর্তারা এই পরিস্থিতিকে গুরুতর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা উদ্বেগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, তদন্ত এখনো চলছে এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কারও ব্যক্তিগত দায় নিশ্চিত করা যাবে না।

কর্তৃপক্ষ জানায়, বর্তমানে সকল স্থাপনায় কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

গত বছর ডিসেম্বরে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে টিটিপির হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে অন্তত চারজন বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। নিহতদের মধ্যে ফয়সাল হোসেন (২২), জুবায়ের আহমেদ (২২) এবং রতন ঢালি (২৯) এর নাম শনাক্ত করা গেছে।

পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডন পরিবারের সদস্য এবং ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, ফয়সাল ২০২৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর খাইবার পাখতুনখোয়ার কারাক জেলায় পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযানে নিহত হন।

জুবায়ের ২০২৫ সালের এপ্রিলে নিহত হন বলে ধারণা করা হয় এবং রতন ঢালির পরিণতি সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সিটিটিসির কর্মকর্তাদের মতে, প্রায় তিন থেকে চার ডজন বাংলাদেশি নিষিদ্ধ এই জঙ্গি সংগঠনের হয়ে লড়াই করতে পাকিস্তানে গেছেন।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *