✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
এক হাজার ৭১৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার চূড়ান্ত তালিকা করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। বর্তমান সরকার সেই তালিকা ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে নারাজ।
এমপিওভুক্তির গত ১৪ থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত অনলাইনে আবেদন নেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিন হাজার ৬১৫টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ছিল নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ের ৮৫৯, মাধ্যমিক পর্যায়ের এক হাজার ১৭০, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের ৬৮৭, স্নাতক (পাস) পর্যায়ে ৪৪০টি এবং স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে ৪১৪টি প্রতিষ্ঠান।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সে সময় জানিয়েছিল, ডিজিটাল সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় গ্রেডিং করে যোগ্য প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হবে। ফলে ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা আর্থিক লেনদেনের সুযোগ নেই বলেও সে সময় দাবি করা হয়।
সব রকম যাচাই শেষে বিভিন্ন ক্যাটেগরিতে এক হাজার ৭১৯টি প্রতিষ্ঠান বা স্তরকে প্রাথমিকভাবে এমপিওভুক্তির জন্য উপযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এসব প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে গত ৫ ফেব্রুয়ারি ৬৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছিল। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ৪৭১টি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বছরে ব্যয় হবে ১৮৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, ৬২৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৯২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, ১৩৫টি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১০২ কোটি ২২ লাখ টাকা, ১৪৫টি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে ১২৭ কোটি ১১ লাখ টাকা, ২৩২টি স্নাতক (সম্মান) কলেজে ১২৫ কোটি টাকা, স্নাতক (পাস) কলেজে ৩৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।
চলতি অর্থবছরে বাস্তবায়ন হলে প্রথম ধাপে সরকারের ব্যয় হতো প্রায় ১৬৭ কোটি টাকা। যদিও সংশোধিত বাজেটে ইতোমধ্যে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের চূড়ান্ত করা তালিকা কেন বাতিল হলো– এমন প্রশ্নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তালিকা প্রণয়নের সময় কয়েকশ কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। তাই তালিকাটি বিতর্কমুক্ত নয়। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভেদে ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। এমনকি শিক্ষকপ্রতি ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে বলে তথ্য মিলেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে লেনদেন অর্ধকোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এসব কাজে সাবেক এক শিক্ষা সচিবের নাম ভাঙিয়ে সে সময়ে প্রভাব খাটানো হয়।
যদিও এখন সে সময়ের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, শিক্ষকদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই যাচাই-বাছাই করে তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছিল।
এ নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকরা আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দিতেও রাজি নন। তবে তারা সভা করেই অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি করা তালিকা চূড়ান্ত অনুমোদন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মাউশির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এত অল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক আবেদন যাচাই করা নজিরবিহীন। অনেকটা রকেট গতিতে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ৫ জানুয়ারি আবেদন শেষ হয়েছে। ২৬ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কর্মদিবস ছিল মাত্র আট দিন। এই সময়ে তিন হাজার ৬১৫টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য যাচাই করে দিনে গড়ে ৪৫২টি প্রতিষ্ঠান মূল্যায়ন করা হয়েছে, যা প্রায় অসম্ভ
তিনি অভিযোগ করেন, কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আগেই সমঝোতা থাকায় তাদের আবেদন দ্রুত অনুমোদন পায়, আর যাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না, তাদের আবেদন বাদ পড়ে। আবার শিক্ষার্থী সংকটে থাকা কিছু প্রতিষ্ঠানও এমপিও তালিকায় অনায়াসে ঢুকে পড়ে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বলছে, তালিকাভুক্ত কিছু প্রতিষ্ঠানে তেমন শিক্ষার্থী পর্যন্ত নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানে পাঠদানও নামমাত্র। যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে, তার মধ্যে অনেকগুলোর অবস্থা বেহাল। তারপরও তারা এমপিওভুক্তির তালিকায় এসেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি একটি চলমান ও পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়া। প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা, অঞ্চলভিত্তিক জনসংখ্যা, প্রতিষ্ঠানের ঘনত্ব এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতেও এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
এমপিওভুক্তির আশায় থাকা হাজারো শিক্ষক-কর্মচারীর মনে এখন হতাশা ভর করেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান সরকারি স্বীকৃতি পেলেও বছরের পর বছর এমপিও সুবিধা না পাওয়ায় সেখানকার শিক্ষক-কর্মচারীরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
