ব্রাজিল ফুটবল দল : সংগ্রাম, ঐতিহ্য ও শিল্পের গল্প

✍︎ ফজলে এলাহী ✍︎

১১২ বছর আগের কথা, ১৯১৪ সালের ৮ জুন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ব্রাজিলের ফুটবল কনফেডারেশন। কাগজে-কলমে এটি ছিল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত মাত্র। কিন্তু ইতিহাসের বিচারে সেই দিনটি ছিল এমন এক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা, যার প্রভাব এক শতাব্দী পরও বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের আবেগকে নাড়া দেয়।

ফুটবল বিশ্বে বহু সফল দেশ এসেছে, বহু বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। কিন্তু ব্রাজিলের অবস্থান আলাদা। কারণ ব্রাজিল শুধু বিশ্বকাপ জেতেনি, তারা ফুটবল খেলাটিকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে।

ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাস বুঝতে হলে মাঠের বাইরের ব্রাজিলকে বুঝতে হবে। ১৮৮৮ সালে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর লক্ষ লক্ষ কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক মুক্তি পেলেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য থেকে মুক্তি পায়নি। সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর তরুণদের সামনে তখন খুব কম সুযোগ ছিল। দারিদ্র্য, অপরাধ, গ্যাং সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলা ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী।

এই সময় ফুটবল সেখানে কেবল একটি খেলা হিসেবে আসেনি; এটি হয়ে উঠেছিল বিকল্প জীবনপথ।

অনেক দেশ মাঝে মাঝে ভালো ফুটবলার তৈরি করে। কিন্তু ব্রাজিল প্রায় ধারাবাহিকভাবে বিশ্বমানের তারকা তৈরি করে যাচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে তাদের ফুটবল কাঠামো। ব্রাজিলে ফুটবল শুরু হয় রাস্তায়, বালুচরে, বস্তিতে। পরে স্টেট লিগের কঠিন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে খেলোয়াড়রা নিজেদের প্রমাণ করে। ছোটবেলা থেকেই তারা হাজারো প্রতিকূলতার মধ্যে খেলতে শেখে।ফলে একজন ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় যখন ইউরোপে যায়, তখন তার কাছে চাপ নতুন কিছু নয়। পেলে থেকে জিকো, সক্রেটিস থেকে রোমারিও, রোনালদো থেকে রোনালদিনহো, কাকা থেকে নেইমার, ভিনিসিয়ুস থেকে এনড্রিক এই ধারাবাহিকতা বের রক্তে ফুটবল মিশে যাওয়ার ফল।

যে তরুণের হাতে ছুরি থাকার কথা ছিল, তার পায়ে চলে এলো বল। যে শক্তি সহিংসতায় ব্যয় হওয়ার কথা ছিল, তা পরিণত হলো ড্রিবলিং, পাসিং ও সৃজনশীলতায়। ফলে ব্রাজিলে ফুটবল শুধু বিনোদন নয়; এটি ছিল সামাজিক পুনর্বাসনের এক শক্তিশালী মাধ্যম।

ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য “জিঙ্গা”। এটি শুধু একটি খেলার স্টাইল নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক ভাষা। কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী মার্শাল আর্ট ক্যাপোয়েরাকে রাষ্ট্র একসময় নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু সংস্কৃতি কখনো নিষিদ্ধ করা যায় না। সেই ক্যাপোয়েরার শরীরী ছন্দ, কোমরের দোল, ভারসাম্য এবং ছলনার কৌশল ধীরে ধীরে ফুটবলের ভেতরে প্রবেশ করে।ফলাফল ছিল অভূতপূর্ব।

ইউরোপীয় ফুটবল যেখানে ছিল যন্ত্রের মতো শৃঙ্খলাবদ্ধ, সেখানে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল হয়ে উঠল নৃত্যের মতো চঞ্চল । তারা বল নিয়ন্ত্রণ করত যেন একজন শিল্পী তুলি চালাচ্ছে। প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করত শক্তি দিয়ে নয়, সৌন্দর্য দিয়ে। এ কারণেই ব্রাজিলের ফুটবলকে অনেকেই “The Art of Football” বলে অভিহিত করেন।

১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল ব্রাজিলের জাতীয় স্মৃতিতে এখনও এক দুঃস্বপ্ন।

নিজেদের মাঠ মারাকানায় প্রায় দুই লাখ দর্শকের সামনে উরুগুয়ের কাছে হেরে যাওয়া শুধু একটি ম্যাচে পরাজয় ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়ার মুহূর্ত। কিন্তু এখানেই ব্রাজিলের বিশেষত্ব। অনেক দেশ এমন আঘাত থেকে ভেঙে পড়ে। ব্রাজিল সেই ব্যর্থতাকে ব্যবহার করেছিল নতুন পরিচয় নির্মাণের জন্য। সাদা জার্সি পরিত্যাগ করে তারা গ্রহণ করল হলুদ-সবুজ জার্সি, যা আজ পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত ক্রীড়া প্রতীকগুলোর একটি। এক অর্থে, ব্রাজিলের আধুনিক ফুটবল পরিচয়ের জন্ম হয়েছিল একটি পরাজয়ের ভেতর থেকে।

১৯৫৮ সালে বিশ্ব দেখল ব্রাজিলের প্রকৃত রূপ।

মাত্র ১৭ বছর বয়সী পেলে এবং অসাধারণ প্রতিভাবান গারিঞ্চা ফুটবলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেলেন। তারা প্রমাণ করলেন, ফুটবল শুধু ফলাফলের খেলা নয়; এটি সৌন্দর্যেরও খেলা। পেলের পরিপূর্ণতা এবং গারিঞ্চার অপ্রত্যাশিত সৃজনশীলতা মিলে জন্ম দিল “জোগা বোনিতো”—সুন্দর ফুটবলের দর্শন।

আজও পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে যখন কোনো শিশু আনন্দের জন্য ড্রিবল করে, তখন সে অজান্তেই পেলে-গারিঞ্চাদের ঐতিহ্য বহন করে।

অনেক দেশ মাঝে মাঝে ভালো ফুটবলার তৈরি করে। কিন্তু ব্রাজিল প্রায় ধারাবাহিকভাবে বিশ্বমানের তারকা তৈরি করে যাচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে তাদের ফুটবল কাঠামো। ব্রাজিলে ফুটবল শুরু হয় রাস্তায়, বালুচরে, বস্তিতে। পরে স্টেট লিগের কঠিন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে খেলোয়াড়রা নিজেদের প্রমাণ করে। ছোটবেলা থেকেই তারা হাজারো প্রতিকূলতার মধ্যে খেলতে শেখে।ফলে একজন ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় যখন ইউরোপে যায়, তখন তার কাছে চাপ নতুন কিছু নয়। পেলে থেকে জিকো, সক্রেটিস থেকে রোমারিও, রোনালদো থেকে রোনালদিনহো, কাকা থেকে নেইমার, ভিনিসিয়ুস থেকে এনড্রিক এই ধারাবাহিকতা বের রক্তে ফুটবল মিশে যাওয়ার ফল।

২০১৪ সালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের পরাজয় ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের আরেকটি অন্ধকার অধ্যায়। অনেকেই মনে করেছিলেন ব্রাজিলের যুগ শেষ। কিন্তু ইতিহাস বলে, ব্রাজিলের শক্তি কখনো শুধুমাত্র ট্রফিতে ছিল না।

তাদের শক্তি ছিল ফুটবলকে আনন্দ, সৃজনশীলতা ও মানবিক অভিব্যক্তির জায়গায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতায়। একটি খারাপ রাত সেই ঐতিহ্যকে মুছে দিতে পারে না।

আজকের ফুটবল আগের চেয়ে অনেক বেশি বৈজ্ঞানিক, কৌশলনির্ভর এবং শারীরিক।

কিন্তু এই যান্ত্রিক যুগেও ব্রাজিল আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ফুটবল এখনও একটি শিল্প।

যখন কোনো খেলোয়াড় অপ্রয়োজনীয় মনে হওয়া একটি ড্রিবল করে, যখন একটি নো-লুক পাস দর্শকদের বিস্মিত করে, যখন খেলার মধ্যে আনন্দের প্রকাশ ঘটে সেখানে ব্রাজিলের প্রভাব কাজ করে।

এ কারণেই ব্রাজিল শুধু একটি জাতীয় দল নয়।

ব্রাজিল হলো ফুটবলের কল্পনা, ফুটবলের কবিতা, ফুটবলের রঙ। বিশ্বকাপের ট্রফি হয়তো অন্য কেউ জিততে পারে। কিন্তু ফুটবলের সৌন্দর্য নিয়ে আলোচনা শুরু হলে ব্রাজিলকে এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। কারণ ফুটবল পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হতে পারে, কিন্তু ব্রাজিল তাকে সুন্দর হতে শিখিয়েছে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *