✍︎ ক্রীড়া প্রতিবেদক ✍︎
জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসান চট্টগ্রামে বিমানবন্দর থেকে বাসায় ফেরার পথে গতকাল রাতে চেকপোস্টে তাকে ঠেকিয়ে ও পরে মারধরে করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় নিজের পরিচয় দিলেও তাতে কর্ণপাত করেনি পুলিশ।
গতকাল রাতের এই ঘটনার বিষয়ে শনিবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও এলাকায় নিজ বাসভবনে সংবাদ সম্মেলন করেছেন নাঈম হাসান ও তার পরিবার।
সংবাদ সম্মেলনে নাঈম হাসান অভিযোগ করেন, কোনো কারণ ছাড়াই সিএনজি অটোরিকশা থেকে নামিয়ে হঠাৎ তার কলার চেপে ধরা হয় এবং থানায় নিয়ে গিয়ে সারারাত আটকে রাখা হয়।
নাঈম হাসান ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘আমি সিএনজি থেকে নামার পর আমাকে বলা হয় আরেকটি সিএনজিতে উঠতে হবে। আমি ওঠার সাথে সাথেই পুলিশ এসে আমার কলার চেপে ধরে। আচমকা এই ঘটনায় আমি খুব ভয় পেয়ে যাই। তারা সেখানে আমার ব্যাগ বা অন্য কিছু চেক না করেই আমাকে সোজা থানায় নিয়ে আসে।’
থানায় ওসির আচরণের কথা উল্লেখ করে এই ক্রিকেটার বলেন, থানায় যাওয়ার পর আমি ওনাকে (ওসি) আমার পরিচয় দিই। পরিচয় দেওয়ার পর উনি আমাকে বলেন ‘চোখ নিচে নামিয়ে কথা বল’। ঠিক ওই মুহূর্তেই ওসির মোবাইলে একটি কল আসে। ফোনে কারও সাথে কথা বলার পর ওসির সুর পুরোপুরি চেঞ্জ হয়ে যায়। তখন উনি আমাকে বলেন, ‘ভাইয়া আপনি বসেন।’ অথচ প্রথমে ওনার আচরণ ছিল অন্যরকম।
তল্লাশি প্রক্রিয়ার অনিয়ম নিয়ে নাঈম বলেন, ওরা ব্যাগ চেক করতে চায়নি। ব্যাগগুলো সারারাত ওভাবেই থানায় ছিল। আমি আসার আগে ডিসি স্যারের সামনে নিজের উদ্যোগেই আমার গ্লাভস, হেলমেট, কাপড়-চোপড় এমনকি একটা পিন থাকলেও তা বের করে ওদের দেখিয়েছি। উনারা সেটার ভিডিও করে রেখেছেন। যাতে পরবর্তীতে বলতে না পারে আমার ব্যাগ চেক করা হয়নি। সিএনজি চেক করেও তারা কিছু পায়নি।
তিনি আরও যোগ করেন, চেকিং তো দেশে অনেক হয়, আমাদেরও অনেকবার ধরেছে। কিন্তু একটা নিয়ম আছে। খারাপ উদ্দেশ্য না থাকলে উনি তো আমাকে বলতেই পারতেন যে তল্লাশি করা হবে। কিন্তু উনি ধরার আগেই গায়ে হাত তোলার চিন্তা করেছেন।
‘যখন সিএনজি অটোরিকশায় তুলে ফেলে, তখন খুব ভয় পেয়েছিলাম। তখন সেখানে জড়ো হওয়া ১০০ থেকে ১২০ জনের মতো সমর্থক ভাইয়ারা (লোকজন) না থাকলে ঘটনাটি অন্য রকম হতো। বিশেষ করে তাঁদের ধন্যবাদ দিতে চাই। পুলিশ যখন আমাকে খুলশী থানায় নিয়ে যায়, তখন তাদের অনুরোধ করি। ভাইয়ারা রাতে লালখান বাজার থেকে খুলশী থানায়ও আসেন আমার সঙ্গে। অন্য কিছু ট্রাই করতে পারেনি।’
ঘটনার রাতে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল জানিয়ে নাঈম বলেন, মোবাইল ফেরত পাওয়ার পর আমি সাথে সাথে তামিম ভাইকে (তামিম ইকবাল) কল দিই। উনি একবারে কল রিসিভ করে ওসির সাথে কথা বলেন। তামিম ভাই যখন কথা বলছিলেন, তখনো ওসি মিথ্যা কথা বলছিলেন এবং আমাকে ইশারায় চুপ থাকতে বলছিলেন। কিন্তু পরে যখন মানুষজন থানায় জড়ো হলো এবং সবাই বলল যে আমি পালানোর চেষ্টা করিনি, তখন ওনারা সুর নরম করেন। আমার যদি কোনো অন্যায় থাকত, তবেই না আমি পালাতাম!
এদিকে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ক্রিকেটার নাঈমের বাবা সাবেক কাউন্সিলর মাহবুবুল আলম পুলিশের এই ভূমিকায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ওসি তো ব্যাগ দেখেই বুঝতে পেরেছিল ও একজন খেলোয়াড়। তারপরও পরিচয় পাওয়ার পর ‘চোখ নামিয়ে কথা বল’—এ কেমন সৌজন্যতা। এখন ওসি সাক্ষাৎকার দিয়ে মিথ্যা বলছেন যে ও নাকি দৌড়ে পালাতে চেয়েছিল, তাই হেঁচকা টান লেগেছে।’
নাঈমের বাবা আরও বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি এসআই কামরুজ্জামান নামের একজন ভুল ইনফরমেশন দিয়েছিল। একজন আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড়কে নিয়ে এই ভুল তথ্য কে দিল, তা আইডেন্টিফাই করা দরকার। এর পেছনে অন্য কোনো চক্রান্ত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।’
পুলিশের বিভাগীয় ব্যবস্থার ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘শুনলাম অভিযুক্ত অফিসারকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশে তো এমন নিয়ম আমি দীর্ঘদিন দেখেছি, সাসপেন্ড করে কিছুদিন পর আবার অন্য জায়গায় বহাল বা প্রমোশন দেওয়া হয়। এটা তো কোনো বিচার হলো না। আমরা চাই এদের গ্রেফতার করে আদালতে প্রেরণ করা হোক এবং রিমান্ডে এনে অন্য কোনো নিরপেক্ষ সংস্থা দিয়ে তদন্ত করা হোক, যাতে মূল ঘটনা উদঘাটিত হয়।’
শারীরিকভাবে আঘাত পাওয়ার পাশাপাশি ক্রিকেটার নাইম প্রচণ্ড মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
প্রসঙ্গত, শুক্রবার (১২ জুন) রাতে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচ খেলে চট্টগ্রাম ফিরছিলেন নাঈম। রাতে বিমানবন্দর থেকে বাসায় ফেরার পথে পুলিশ সদস্যরা তাকে তুলে নিয়ে মারধর করে থানায় নিয়ে যান। এরপর নগরীর খুলশী থানায় গিয়েও হেনস্তার শিকার হন জাতীয় দলের এই অফস্পিনার।
অফস্পিনার নাঈম হাসান এখন পর্যন্ত ১৪টি টেস্ট ম্যাচ খেলে উইকেট নিয়েছেন ৪৮টি। ক্যারিয়ারে চারবার এক ইনিংসে পাঁচ বা তার বেশি উইকেট নেওয়ার কৃতিত্বও রয়েছে তার।
