ক্রিকেটার নাঈমকে মারধর, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার

✍︎ ক্রীড়া প্রতিবেদক ✍︎

চট্টগ্রাম নগরে নিজ বাসায় ফেরার পথে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সদস্য নাঈম হাসানকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে নামিয়ে হেনস্তা ও জোরপূর্বক থানায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।

এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী।

শনিবার (১৩ জুন) বেলা ১১টার দিকে অভিযুক্ত তিন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করে দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে অভিযুক্ত একজনকে আটক করেছে পুলিশ।

দুপুর ১২টার দিকে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী ক্রিকেটার নাঈম হাসানের চট্টগ্রাম শহরের বাসভবনে যান। তিনি নাঈম ও তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন এবং পুলিশের এমন আচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।

ক্রিকেটার নাঈমের বাসভবনে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, প্রাথমিক তদন্তে আমরা ঘটনার সত্যতা পেয়েছি। আমরা পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করতে চাই। পুলিশ সদস্যরা চরম অপেশাদার আচরণ করেছেন। বাংলাদেশ জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সিএমপি কমিশনার আরও বলেন, অভিযুক্ত তিন পুলিশ সদস্যকে ইতোমধ্যেই দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। এছাড়া ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযুক্ত একজনকে আটক করেছি। এ ঘটনায় বিভাগীয় মামলার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’ 

পারিবারিক ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার সাভারের বিকেএসপিতে প্রাইম ব্যাংকের হয়ে ম্যাচ খেলে রাত ১০টা ২০ মিনিটের ফ্লাইটে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন নাঈম। রাতে চট্টগ্রাম পৌঁছানোর পর বিমানবন্দর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বাসায় ফেরার পথে লালখান বাজার এলাকায় পৌঁছালে পুলিশের একটি গাড়ি তাঁদের বহন করা সিএনজিচালিত অটোরিকশার পথরোধ করে। অটোরিকশা থেকে নাঈমকে নামিয়ে পেটানো হয়।

স্বর্ণ চোরাকারবারি সন্দেহে নাঈমকে গাড়ি থেকে নামতে বাধ্য করা হয় এবং তার সঙ্গে অত্যন্ত অশোভন আচরণ করা হয়।

একপর্যায়ে নাঈম নিজের পরিচয় দিলেও পুলিশ সদস্যরা তা কর্ণপাত করেননি। উল্টো তাকে জোরপূর্বক থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেও দীর্ঘক্ষণ হয়রানি করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের সঙ্গে পুলিশের এমন অশোভন আচরণের খবর ছড়িয়ে পড়লে চট্টগ্রামের ক্রীড়াঙ্গনসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

সিএমপি সূত্র জানিয়েছে, পুরো ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে এবং দোষী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ক্রিকেটার নাঈমের পরিবারের সদস্যরা জানায়, সিএমপি কমিশনার নিজে বাসায় এসে দুঃখ প্রকাশ করায় এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় তারা আপাতত আশ্বস্ত। তবে তারা চান যেন তদন্তের মাধ্যমে দোষী পুলিশ সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।

খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফুর রহমান শনিবার সকালে বলেন, ‘বিমানবন্দর থেকে একটি সিএনজিতে চোরাচালানের মালামাল রয়েছে—এমন খবরে আমাদের একটি টহল টিম লালখানবাজারে একটি সিএনজি অটোরিকশা তল্লাশি করে। টহল টিমের দায়িত্বে থাকা এসআই শফিকের ভাষ্য, একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে আমাদের থানার সেকেন্ড অফিসার মনিরুল চোরাচালানের বিষয়ে তথ্য পেয়েছিল।’

ওসি বলেন, ‘নিয়মানুযায়ী এই ধরনের তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে থানার ঊর্ধ্বতনকে জানাতে হয়, অনুমতি নিতে হয়। আমার কাছ থেকে অনুমতি না নেওয়া ছাড়াই এই তল্লাশি কার্যক্রম চালানো হয়েছিল। এর মাধ্যমে তাঁরা অপরাধ করেছেন। পরে আমাদের ঊর্ধ্বতন অফিসারের উপস্থিতিতে ঘটনায় জড়িত এসআই শফিকুরসহ পুলিশের তিনজনকে থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে ক্লোজড করা হয়েছে। এ ছাড়া এই ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। সেখানে অভিযুক্তরাসহ পুলিশের সঙ্গে থাকা সোহেল নামে আরও একজনকে আসামি করা হয়েছে।’

এর আগে ক্রিকেটার নাঈম হাসান রাতে সাংবাদিকদের জানান, গাড়ি থামাতেই কয়েকজন পুলিশ পরিচয়ে চালকের কাছ থেকে গাড়ির কাগজপত্র নিয়ে নেন। এরপর তাঁকে গাড়ি থেকে নামিয়ে গলায় ধাক্কা দিয়ে পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। তখন তিনি নিজেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় দেন, পরিচয়পত্রও দেখান। তবু তাঁকে ঘটনাস্থলে থাকা খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম হাতে থাকা লাঠি দিয়ে কোমরে আঘাত করতে থাকেন। পুলিশের ওই এসআইয়ের সঙ্গে সাদাপোশাকে থাকা (পুলিশের সোর্স সোহেল) এক ব্যক্তিও হাতে থাকা পাইপ দিয়ে তাঁকে পেটান।

মারধরের সময় ঘটনাস্থলে লোকজন জড়ো হয়ে যায় জানিয়ে জাতীয় দলের এই ক্রিকেটার বলেন, ‘প্রায় ১০০ থেকে ২০০ মানুষ জড়ো হয়ে আমার ক্রিকেটার পরিচয় দিলেও তারা মারধর থামায়নি। তারা বলছিল—তুই আসামি, চুপ থাক, একটা কথাও বলবি না।’

মারধরের একপর্যায়ে তাঁকে থানায় নিয়ে যান এসআই শফিকুল। এরপর ওসির কক্ষে নেওয়া হয় তাঁকে। ওসির কক্ষেও তাঁকে হেনস্তা করা হয়েছে বলে দাবি করেন নাঈম হাসান।

জানা গেছে, মধ্যরাতে নাঈমকে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে হাজির হন তাঁর আত্মীয়স্বজন ও ক্রিকেটপ্রেমীরাও। ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবি করেন তাঁরা।

পুলিশ জানায়, শনিবার সকালে নাঈমের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় মারধর ও অপহরণ চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।

অফস্পিনার নাঈম হাসান এখন পর্যন্ত ১৪টি টেস্ট ম্যাচ খেলে উইকেট নিয়েছেন ৪৮টি। ক্যারিয়ারে চারবার এক ইনিংসে পাঁচ বা তার বেশি উইকেট নেওয়ার কৃতিত্বও রয়েছে তার।

নাঈমের সঙ্গে যা হয়েছে, কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়: তামিম

চট্টগ্রামে জাতীয় দলের স্পিনার নাঈম হাসানের ওপর পুলিশি নির্যাতনের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি তামিম ইকবাল। অনাকাঙ্ক্ষিত এই ঘটনার পর ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থার দাবিতে শক্ত অবস্থান নিয়েছে বিসিবি।

এ প্রসঙ্গে ফেসবুকে বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল তাঁর প্রতিক্রিয়ায় জানান, ‘নাঈম হাসানের সঙ্গে গত রাতে যা হয়েছে, কোনোভাবেই তা গ্রহণযোগ্য নয়। রাতে নাঈম আমাকে ফোন করার পর থেকে তাৎক্ষণিকভাবে যা যা করা দরকার, করার চেষ্টা করেছি আমি ও অন্য বোর্ড পরিচালকরা। সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় আমরা কথা বলছি, নাঈম ও তার পরিবারের সঙ্গেও নিবিড় যোগাযোগ রাখছি।’

ক্রিকেটারদের সুরক্ষায় বোর্ডের অনড় অবস্থানের কথা জানিয়ে বিসিবি সভাপতি আরও বলেন, ‘বিসিবির পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে আজকে সকালেই। এরপর আরো যা যা করণীয় আছে, সবকিছু করব আমরা। নাঈম ও সব ক্রিকেটারের পাশে আমরা আছি সবসময়।’

নাঈমের হেনস্তার প্রতিবাদ জানিয়েছেন মুশফিকুর রহিম, তাসকিন আহমেদরাও। তাসকিন নিজের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাইম হাসানের সঙ্গে পুলিশের এমন ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।’ ফেসবুকে মুশফিক লিখেছেন, ‘নাঈমের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।যা ঘটেছে, তা আমাকে ব্যথিত ও লজ্জিত করেছে। একজন নাগরিক হিসেবে, একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই। নাঈম, আমরা তোমার পাশে আছি।’

নাঈমের হেনস্তার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চেয়ে টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন দাস ফেসবুকে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘মাথা উঁচু রাখো নাঈম। তুমি একজন ভালো মানুষ। নাঈম হাসানের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। খুবই হৃদয়বিদারক এটা।’

শনিবার সকালে দেওয়া বিসিবির আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই নজিরবিহীন ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াবও পৃথক বিবৃতিতে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার দাবি তোলে।

বিসিবি সভাপতির এমন শক্ত তৎপরতার মধ্যেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাথমিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঘটনার সত্যতা পেয়ে খুলশী থানার এক উপপরিদর্শকসহ (এসআই) তিন পুলিশ সদস্যকে ইতিমধ্যে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *