✍︎ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ✍︎
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অংশ নিতে রাজধানী তেহরানে সমবেত হয়েছেন লাখ লাখ মানুষ।
শনিবার (৪ জুন) থেকে শুরু হওয়া প্রায় সপ্তাহব্যাপী এই শোকানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি নিজেদের কঠোর প্রতিরোধ ও চ্যালেঞ্জের বার্তা দিতে চাইছে দেশটির প্রশাসন।
শিয়া ঐতিহ্যের প্রতিশোধ ও ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে কালো পোশাক পরিধান করে এবং ‘রক্ত-লাল’ পতাকা হাতে নিয়ে অনুগত জনতা তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় প্রাঙ্গণে এসে ভিড় জমান। ১৯৮৯ সাল থেকে দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক ধরে ইরান শাসন করা খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনে সপরিবারে ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক ইসরায়েলি বিমান হামলায় ৮৬ বছর বয়সে নিহত হন।
তীব্র গরম এবং প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে মোসাল্লা প্রাঙ্গণে সমবেত হাজার হাজার নারী ও পুরুষকে শীতল রাখতে কৃত্রিমভাবে পানি ছিটানো হচ্ছে। কঠোর লিঙ্গ-বিভাজন মেনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে শোকাতুর জনতা বুক চাপড়ে তাদের প্রিয় নেতার প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করছেন। মূল মঞ্চের সামনে খামেনির কফিন রাখা হয়েছে, যার ওপর ঐতিহ্যবাহী কালো পাগড়ি শোভা পাচ্ছে।
একই সাথে রাখা হয়েছে হামলায় নিহত তার আরও চার পারিবারিক সদস্যের কফিন, যার মধ্যে তার মাত্র ১৪ মাস বয়সি নাতনি জাহরা মোহাম্মদী গোলপায়গানির ছোট কফিনটি বিশেষভাবে সবার দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। সমাবেশ থেকে সমবেত জনতা মুহুর্মুহু ‘আমেরিকা ধ্বংস হোক’ এবং ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগান দিয়ে চারপাশ প্রকম্পিত করে তুলছেন।
শোকানুষ্ঠানের এই বিশাল আয়োজনকে বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের সমর্থনের একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে গত জানুয়ারিতে দেশজুড়ে ঘটে যাওয়া গণবিক্ষোভ এবং তা দমনে কঠোর ব্যবস্থার পর, এই জমায়েতকে সরকার পরিচালনার বৈধতা প্রমাণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
পাঁচ সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চললেও দুই পক্ষই যেকোনো মুহূর্তে পুনরায় যুদ্ধ শুরুর হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে। তবে মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগে তেহরানের চিরচেনা যানজটপূর্ণ রাস্তাগুলো ছিল অনেকটাই ফাঁকা, এবং অনেক সাধারণ বাসিন্দা এই দীর্ঘ শোক চলাকালীন বিশৃঙ্খলা এড়াতে সাময়িকভাবে শহর ছেড়ে চলে গেছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে এখনও প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। ওই একই বিমান হামলায় তিনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। তবে শুক্রবার (৩ জুন) দেশটির শীর্ষ নেতারা বিদেশি প্রতিনিধিদের স্বাগত জানান এবং নিজেদের মধ্যে ইস্পাতকঠিন একতা প্রদর্শন করেন।
শান্তিকালীন আলোচনায় অংশ নেওয়া পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং নবনিযুক্ত রেভল্যুশনারি গার্ডসের প্রধান আহমদ ওয়াহিদি জনগণকে দলে দলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইরানের এই প্রতিশোধের কণ্ঠস্বর যেন গোটা বিশ্বের কানে পৌঁছায়।
কর্তৃপক্ষের ধারণা, কেবল রাজধানী তেহরানেই এক কোটিরও বেশি মানুষের সমাগম ঘটবে। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজার পর এটিই ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণজমায়েত হতে যাচ্ছে। কোনো ধরনের পদদলন বা দুর্ঘটনা এড়াতে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সচেতনতামূলক নির্দেশনা প্রচার করা হচ্ছে।
সূচি অনুযায়ী, তেহরানে তিন দিন কফিন রাখার পর মঙ্গলবার তা ধর্মীয় নগরী কোমে, বুধবার প্রতিবেশী দেশ ইরাকে এবং সবশেষে আগামী বৃহস্পতিবার খামেনির নিজ শহর মাশহাদে সমাহিত করা হবে।
‘যারা আমাদের ইমামকে হত্যা করেছে আমরা তাদের হত্যা করব’
সাবেক সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে শেষ বিদায় জানাতে তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মুসল্লা মসজিদ কমপ্লেক্সে জড়ো হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। গতকাল তার মরদেহ বিদেশি অতিথিদের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়। আজ শনিবার (৪ জুলাই) সাধারণ মানুষের জন্য কফিনটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।
এরপর সেখানে সাধারণ ইরানিদের ঢল নামে। তারা সেখানে সমন্বিত কণ্ঠে স্লোগান দেন। তাদের বলতে শোনা গেছে— “প্রতিশোধ প্রতিশোধ, আমরা হত্যা করব, আমরা হত্যা করব আমাদের ইমামের হত্যাকারীকে।”
এছাড়া “ডেথ টু আমেরিকা ও ডেথ টু ইসরায়েল” স্লোগানও দেন তারা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দখলদার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথ হামলা চালিয়ে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করে। এ সময় তার সঙ্গে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও প্রাণ হারান।
দীর্ঘ প্রায় চার মাস তাদের মরদেহ অজ্ঞাত স্থানে রাখা হয়েছিল। গতকাল প্রথমবারের মতো কফিনবন্দি তাদের নিথর দেহগুলো প্রকাশ্যে আনা হয়।
বাবার শেষ বিদায়ে কেন নেই মোজতবা
সাবেক সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষ বিদায়ে অংশ নিয়েছেন লাখ লাখ মানুষ। তবে এতে উপস্থিত হননি তার ছেলে ও বর্তমান সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনি।
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি অব কাতারের সহযোগী প্রফেসর পল মুসগ্রাভ সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে বলেছেন, কেন মোজতবা শেষ বিদায়ে নেই তা খুবই সহজবোধ্য।
তিনি বলেন, “ইরান ধরে নিয়েছে ইসরায়েল এই অন্তোষ্টিক্রিয়ায় নেতৃবৃন্দকে হত্যার জন্য দ্বিতীয়বারের মতো হামলা চালাতে পারে। অতীতে ইরান এমন জানাজাকে রাজনৈতিক নেতাদের হত্যার জন্য ব্যবহার করেছে।”
