খামেনির জানাজায় অংশ নেবেন শতাধিক বিশ্ব নেতা

✍︎ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ✍︎

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় শতাধিক বিশ্ব নেতা অংশ নেবেন বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরআইবি।

শুক্রবার (৩ জুলাই) থেকে শুরু হচ্ছে তার শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা। চলবে টানা সাত দিন। সবশেষে ৯ জুলাই ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শহর মাশহাদে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে। সেখানে তার বাবার কবরও রয়েছে।

৮৬ বছর বয়সে নিহত হওয়া ইরানের দ্বিতীয় ও দীর্ঘমেয়াদি এই সর্বোচ্চ নেতার মরদেহ রাখা হয়েছে রাজধানী তেহরানের ইমাম খামেনি মসজিদ কমপ্লেক্সে। এটি গ্রান্ড মোসাল্লা নামেও পরিচিত। শুক্রবার সেখানে আলী খামেনির মরদেহে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত কূটনীতিক ও রাজনীতিবিদরা।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দাফন প্রথমে মার্চ মাসে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় তা পিছিয়ে যায়। শুক্রবার তেহরানে তার শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে, যা টানা সাত দিন চলবে। এ সময় ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহরে জানাজা, শোক মিছিল এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান হবে। শুক্রবারের অনুষ্ঠানে সবচেয়ে বেশি বিদেশি নেতা উপস্থিত থাকবেন।

শনিবার ও রোববার তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় আলী খামেনি ও তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যের কফিন জনসাধারণের শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য রাখা হবে। সোমবার ও মঙ্গলবার জানাজার মিছিল ইরানের কোম শহরের দিকে যাবে। এরপর বুধবার মরদেহ ইরাকের নাজাফে নেওয়া হবে। সেখানে আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনার পর নাজাফ ও কারবালা শহরে শোক মিছিল অনুষ্ঠিত হবে।

সবশেষে শুক্রবার মরদেহ আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মাশহাদ শহরে, বিখ্যাত ইমাম রেজার (আ.) পবিত্র মাজার প্রাঙ্গনে তাকে দাফন করা হবে। মাশহাদই খামেনির জন্মস্থান।

কোন কোন দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন জানাজায়

পাকিস্তান: দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় জানায় অংশ নেবেন বলে জানিয়েছে ইসলামাবাদ। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতায় পাকিস্তান কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। ফলে গত এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি ও জুনে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। এই সমঝোতা স্মারকটি এখন যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে বৃহত্তর আলোচনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

তাজিকিস্তান: তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রাহমনও জানাজায় যোগ দেবেন।

আর্মেনিয়া: আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান এই স্মরণ অনুষ্ঠানে তার দেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন।

জর্জিয়া: দেশটির প্রেসিডেন্ট মিখাইল কাভেলাশভিলিও এই স্মরণ অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন বলে দেশটি নিশ্চিত করেছে।

কোন কোন দেশ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন সরকারি নেতাদের পাঠাচ্ছে

তুরস্ক: দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট সেভদেত ইলমাজ খামেনির জানায় অংশ নেবেন বলে নিশ্চিত করেছে আঙ্কারা।

ভারত: দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম দেশটির সরকার জানিয়েছে, আলী খামেনেইয়ের রাষ্ট্রীয় জানাজায় দেশটির প্রতিনিধিত্ব করবেন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী পবিত্র মার্গারিটা এবং বিহারের রাজ্যপাল সৈয়দ আতা হাসনাইন। এ জন্য তারা শুক্রবার ইরান সফর করবেন।

ভারতের প্রতিনিধিদলে আরও থাকবেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ এবং জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি। আতা হাসনাইন ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল ও বর্তমানে সরকারি পদে থাকা দেশের জ্যেষ্ঠতম শিয়া ব্যক্তিত্বদের একজন।

চীন: বেইজিং জানিয়েছে, জ্যেষ্ঠ চীনা আইনপ্রণেতা হে ওয়েই তেহরানে প্রয়াত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় যোগ দেবেন। তিনি চীনের সংসদ ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান।

রাশিয়া: রুশ নিরাপত্তা পরিষদের উপ-সভাপতি দিমিত্রি মেদভেদেভ শুক্রবারের অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন বলে বৃহস্পতিবার ক্রেমলিন নিশ্চিত করেছে। মেদভেদেভ রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী।

আফগানিস্তান: ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি রাষ্ট্রীয় জানাজায় যোগ দিতে বৃহস্পতিবার তেহরানে গেছেন। আফগান গণমাধ্যম জানিয়েছে, অর্থনৈতিকবিষয়ক প্রথম উপ-প্রধানমন্ত্রী আবদুল গনি বারাদারও এই রাষ্ট্রীয় জানাজায় যোগ দেবেন।

বাংলাদেশ: সরকারি বিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির সংসদ স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তেহরানে রাষ্ট্রীয় জানাজায় যোগদান করবেন।

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়ে দেশের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা হন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। তার মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সাল থেকে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। পাহলভি রাজতন্ত্রের অবসান ঘটানো ইসলামী বিপ্লবের আদর্শিক নেতা ছিলেন খোমেনি। অন্যদিকে সেই বিপ্লবের সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামো গড়ে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন খামেনি।

খামেনির মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরি হয়েছেন তার ছেলে মোজতবা খামেনি। তার শাসনামলের শুরুতেই এত বড় রাষ্ট্রীয় আয়োজন হতে যাচ্ছে। যদিও সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি এখনও প্রকাশ্যে আসেননি।

সাত দিনব্যাপী শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা

খামেনিকে শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা ৩ জুলাই তেহরানে শুরু হয়েছে। এটি ইরান ও ইরাকজুড়ে সাত দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে পালিত হবে।

   জুলাই

৪ ও ৫ জুলাই তেহরানে সর্বজনীন শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন করা হবে। সর্বসাধারণকে শেষ বিদায় জানানোর জন্য পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যের মরদেহসহ খামেনির কফিন গ্র্যান্ড মোসাল্লায় রাখা হবে। বিশাল জনসমাগমের জন্য নির্মিত গ্র্যান্ড মোসাল্লা ইরানের অন্যতম বৃহত্তম প্রার্থনাস্থল। এটি দীর্ঘদিন ধরে প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় আয়োজনের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

   জুলাই

৬ ও ৭ জুলাই তেহরানের বিভিন্ন এলাকা অতিক্রম করে রাজধানী থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত কোম শহরের উদ্দেশে বিশাল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।

কোম ইরানের শিয়া ইসলামি শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র এবং দেশটির অন্যতম পবিত্র শহর। এখানে দেশের বৃহত্তম ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অবস্থিত। খামেনিসহ হাজার হাজার আলেম এ শহরে অধ্যয়ন ও শিক্ষাদান করেছেন।

 জুলাই

ইরান ও ইরাকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৮ জুলাই নজফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনার আয়োজন করা হবে। এরপর ইরাকের নজফ ও কারবালা শহরে বড় শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।

নজফের ইমাম আলীর মাজার শিয়াদের অন্যতম পবিত্র স্থান। প্রতি বছর সেখানে লাখো তীর্থযাত্রী আসেন। এখানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর চাচাতো ভাই ও জামাতা হজরত আলী ইবনে আবি তালিবের সমাধি রয়েছে।

কারবালায় অবস্থিত ইমাম হুসাইন ও তার সৎভাই আব্বাসের মাজার শিয়া ইসলামের অন্যতম পবিত্র স্থান। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার যুদ্ধে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন এবং আব্বাস শহীদ হন। এ ঘটনাটি শিয়া ধর্মীয় ঐতিহ্য ও পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি।

 জুলাই

এরপর মরদেহটি চূড়ান্ত দাফনের জন্য ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। আগামী ৯ জুলাই মাশহাদে ইমাম রেজার মাজারে তাকে দাফন করা হবে। মাশহাদ ইরানের পবিত্রতম শহর। ইমাম রেজা শিয়া মতাবলম্বীদের কাছে অষ্টম ইমাম হিসেবে পরিচিত।

শহরটি আলি খামেনির জন্য ব্যক্তিগতভাবেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি ১৯৩৯ সালে মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন এবং জীবনের একটি বড় অংশ সেখানে কাটান। কোমে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের আগে তিনি মাশহাদের ধর্মীয় মাদ্রাসাগুলোতে অধ্যয়ন করেছিলেন।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *