পরিমার্জন হচ্ছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের ১৩৩ পাঠ্যবই

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎

আগামী শিক্ষাবর্ষে ইতিহাস, বাংলা, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়সহ বিভিন্ন বইয়ে নতুন বিষয় সংযোজন ও পুরোনো অংশ পুনর্বিন্যাস করছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। মোট ১৩৩টি পাঠ্যবইয়ের পরিমার্জনের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। আগামী মাস থেকে ছাপা শুরু হবে।

একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়াতে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে নতুন চারটি বই। আইসিটি বইয়ে প্রথমবারের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আধুনিক প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন অধ্যায় সংযোজন হচ্ছে। নবম ও দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা একটি প্রবন্ধ সংযোজন হচ্ছে। পঞ্চম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের ‘আমাদের স্মরণীয় নেতা’ অধ্যায়ে বর্তমান চার নেতার পাশাপাশি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জীবন ও অবদান যুক্ত হচ্ছে।

প্রাথমিক স্তরের মোট ৩৬টি পাঠ্যবই পরিমার্জনের কাজ শেষ পর্যায়ে। মাধ্যমিকের মোট পাঠ্যবই ৯৯টি। এর মধ্যে ৯৭টি পরিমার্জন করা হয়েছে। প্রাথমিকের পাঠ্যবই ১৬০ জন বিষয় বিশেষজ্ঞ এবং মাধ্যমিকের বইয়ের ক্ষেত্রে ২৫০ জন পরিমার্জন কাজে যুক্ত ছিলেন।  

এনসিটিবি জানিয়েছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৩০ কোটি ৮৩ লাখের বেশি পাঠ্যবই মুদ্রণ করা হবে। এর মধ্যে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য আট কোটি ২১ লাখ ৬৭ হাজার ৭৩০ কপি এবং মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য ২১ কোটি ২৭ লাখ ২৮ হাজার ৩৩২ কপি বই ছাপানো হবে। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে বই ছাপার কাজ শুরু হয়ে নভেম্বরের মাঝামাঝি শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এনসিটিবি চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, ‘এ পর্যন্ত ১৩৭টি বইয়ের মধ্যে ১৩৩টির পরিমার্জন ও ইনডিজাইন সম্পন্ন হয়েছে। অর্থাৎ বেশির ভাগ বই এখন মুদ্রণের জন্য প্রস্তুত। অবশিষ্ট চারটি বই নতুন সংযোজন হওয়ায় সেগুলোর বিষয়বস্তু ও কাঠামো চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। আশা করছি, দ্রুত এগুলোর কাজও শেষ হবে।’ 

এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, ‘এবার আমাদের মূল তিনটি অগ্রাধিকার– গুণগত মান, স্বচ্ছতা ও সময়ানুবর্তিতা। চার শতাধিক বিশেষজ্ঞ, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক, সম্পাদক ও কারিগরি বিশেষজ্ঞ বই প্রস্তুতের কাজে যুক্ত রয়েছেন। প্রতিটি বই একাধিক ধাপে পর্যালোচনা করা হয়েছে। আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা নির্ভুল, মানসম্মত ও সময়োপযোগী বই হাতে পাক।’

বাংলা বইয়ে জিয়াউর রহমানের লেখা প্রবন্ধ
এনসিটিবির শিক্ষাক্রম উইং ও সম্পাদনা শাখা থেকে জানা গেছে, পাঠ্যবই পরিমার্জনের অংশ হিসেবে নবম-দশম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য বইয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘একটি জাতির জন্ম’ ও ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ শীর্ষক দুটি রচনার আলোকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি নতুন পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। 

প্রাথমিকের পঞ্চম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের ‘আমাদের স্মরণীয় নেতা’ অধ্যায়ে বর্তমান চার নেতার পাশাপাশি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জীবন ও অবদান যুক্ত করা হচ্ছে।

তবে কথা থাকলেও শরীফ ওসমান বিন হাদিকে এ বছর অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না। জানতে চাইলে এনসিটিবির সদস্য (প্রাথমিক শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল হায়দার বলেন, ২০২৭ সালের জন্য প্রাথমিকের বইয়ের সম্পাদনার কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। শরীফ ওসমান বিন হাদির বিষয়টি এবার যুক্ত হচ্ছে না। ভবিষ্যতে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর সময় পরিকল্পনা ও বিষয়ভিত্তিক কমিটি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০২৮ সালের শিক্ষাক্রমে পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ের ‘আমরা তোমাদের ভুলব না’ অধ্যায়ে তিতুমীর, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, নূর হোসেন, আবু সাঈদ ও মীর মুগ্ধ’র পাশাপাশি শরীফ ওসমান বিন হাদিকেও অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তাভাবনা আছে। তবে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি।

এনসিটিবির সম্পাদনা শাখার কর্মকর্তারা জানান, আগামী শিক্ষাবর্ষের ইতিহাস এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে এবার মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টর, জেড ফোর্স, কে ফোর্স, তেলিয়াপাড়া বৈঠক, মুক্তিযুদ্ধের সামরিক কৌশল এবং বিভিন্ন বীর সেনানায়কের অবদান আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হচ্ছে।

একই সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে খালেদা জিয়ার ভূমিকা এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের বিস্তারিত ইতিহাস।

থাকছে ৭ মার্চের ভাষণ 
২০২৬ সালের মাধ্যমিকের বাংলা বই থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ বাদ দেওয়া হয়েছিল, ইতিহাস এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে তা আগের মতোই রাখা হয়েছে। 

আইসিটিতে এআই ও রোবটিক্স
ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত আইসিটি বইয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবটিক্স, আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি, তথ্য বিশ্লেষণ এবং প্রযুক্তির ব্যবহারিক প্রয়োগ বিষয়ে নতুন অধ্যায় যুক্ত হচ্ছে।

এনসিটিবির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতেই এই পরিবর্তন।

আগামী বছর থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে নতুন চার বই
আগামী শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য নতুন চারটি বিষয়ের চার বই যুক্ত হচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণিতে ‘খেলাধুলা’ ও ‘সংস্কৃতি’ নামে দুটি বই থাকবে। খেলাধুলা বইয়ে ফুটবল, ক্রিকেট, দাবা, ব্যাডমিন্টন, কারাতে বা ভলিবল, অ্যাথলেটিকস এবং সাঁতার– এই সাতটি খেলার মৌলিক ধারণা ও ব্যবহারিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানান এনসিটিবির গবেষণা কর্মকর্তা রুমা বেগম। 

ষষ্ঠ শ্রেণিতে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হচ্ছে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বই। আনন্দমুখর পরিবেশে শেখাকে উৎসাহিত করতে এ বই তৈরি করা হচ্ছে।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল শিক্ষা (টিভিই) বিষয়ে একটি উদ্বুদ্ধকরণ বইও যুক্ত হচ্ছে।
 

বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়; ইতিহাস, পৌরনীতি এবং বাংলার মতো বিষয়গুলো পরিমার্জনের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) চারজন অধ্যাপককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তারা হলেন– মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, ড. এস এম হাফিজুর রহমান, ড. তারিক আহসান ও ড. নূরে আলম সিদ্দিকী।

এনসিটিবির পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগস্টে মুদ্রণ শুরু হয়ে নভেম্বরের মধ্যে শেষ হবে। এর পর ডিসেম্বর থেকেই ধাপে ধাপে সারাদেশে বই বিতরণ শুরু হবে, যাতে নতুন বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।

২০২৮ সালে নতুন শিক্ষাক্রম
এনসিটিবি সূত্র জানিয়েছে, ২০২৮ সাল থেকে সম্পূর্ণ নতুন শিক্ষাক্রম চালুর প্রস্তুতি চলছে। এর মূল ভিত্তি হবে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা। বইয়ের সংখ্যা কমিয়ে ব্যবহারিক শিক্ষা, গবেষণাভিত্তিক শিখন, সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

এই শিক্ষাক্রম তৈরির ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়া, ফিনল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ অন্তত ১৬টি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, নতুন কারিকুলাম, সমন্বিত শিক্ষক নীতিমালা, প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণিকক্ষ, স্মার্ট ক্লাসরুম, ভিডিও লেসন, তাৎক্ষণিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষায় গুণগত পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, প্রাথমিকের বর্তমান শিক্ষাক্রম ২০২১ সালে প্রণীত। মাধ্যমিকের বর্তমান শিক্ষাক্রম ২০১২ সালে প্রণীত। নিয়ম অনুসারে, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে প্রতি পাঁচ বছর পরপর শিক্ষাক্রম যুগোপযোগী করার কথা। ২০২২ সালে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার মাধ্যমিকে নতুন শিক্ষাক্রম চালু করলেও অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালে ক্ষমতায় এসে তা বাতিল করে। 

১৯৭২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সাতবার শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২০১২ সালে শিক্ষাক্রমে সবচেয়ে বড় রদবদলের মাধ্যমে আসে সৃজনশীল পদ্ধতি। মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে আরও বড় পরিবর্তন আসে ২০২১ সালে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *