বৈরী আবহাওয়াতেও চলছে এইচএসসি পরীক্ষা

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎ 

বিরূপ আবহাওয়ার কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে উদ্বেগ তৈরি হলেও পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা আগামী ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত থাকার সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে।

বাংলাদেশ আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির এক বিজ্ঞপ্তিতে সোমবার এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় দেশের ৯টি সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। অতিবৃষ্টিজনিত বন্যায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কয়েকটি কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং পরীক্ষার্থীদের নিরাপদে কেন্দ্রে পৌঁছানো সম্ভব না হওয়ায় শুধু ওই বোর্ডের পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকদের মতামতের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে দেশের অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের অধিকাংশ পরীক্ষাকেন্দ্র সচল রয়েছে। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পূর্বঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা গ্রহণ অব্যাহত রাখা হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, সোমবার সকালে বিরূপ আবহাওয়ার কারণে বিশেষ করে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীদের যাতায়াতে সাময়িক ভোগান্তি সৃষ্টি হলেও স্থানীয় প্রশাসন, কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্রে পৌঁছে পরীক্ষায় অংশ নিতে সক্ষম হয়েছে।

আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির মতে, বারবার পরীক্ষা স্থগিত হলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন, ফল প্রকাশ, বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি কার্যক্রম এবং সামগ্রিক শিক্ষা ক্যালেন্ডার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি অভিন্ন প্রশ্নপত্র ব্যবস্থার কারণে একটি বোর্ডের পরিস্থিতির জন্য সব বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত রাখাও বাস্তবসম্মত নয়।

তবে কোনো এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বা পরীক্ষা গ্রহণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন বলে জানানো হয়েছে।

শিক্ষা বোর্ড শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ এবং বিরূপ আবহাওয়ার কারণে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার সময় পর্যাপ্ত সময় হাতে রেখে সতর্কতার সঙ্গে যাতায়াতের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্নভাবে পরীক্ষা সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ কাজ করে যাচ্ছে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর ফোনে কেন্দ্র পরিবর্তন, বাড়ল ৩০ মিনিট

মাত্র তিন ঘণ্টার টানা ভারী বর্ষণে কার্যত অচল হয়ে পড়ে কুমিল্লা নগরী। ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় ডুবে যায় সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকা। এরই মধ্যে কোমরসমান পানি মাড়িয়ে, এমনকি নৌকায় চড়ে এইচএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতে হয় অনেক পরীক্ষার্থীকে। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে। এরপর প্রধানমন্ত্রী সরাসরি কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের সঙ্গে ফোনে কথা বলে পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেন। তার নির্দেশনা ও পরিস্থিতি বিবেচনায় জলাবদ্ধ সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রটি পরিবর্তন করা হয়। পাশাপাশি বৈরী আবহাওয়ার কারণে দেরিতে পৌঁছানো পরীক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আহসান পারভেজ সোমবার দুপুরের পর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা টিপু জানান, সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নৌকায় করে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে যাওয়ার ভিডিও ভাইরাল হলে সেটি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে। এরপর প্রধানমন্ত্রী তাকে ফোন করে সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান।

তিনি প্রধানমন্ত্রীকে জানান, পরীক্ষার্থীদের নিরাপদে কেন্দ্রে পৌঁছানোর জন্য প্রশাসন ও সিটি করপোরেশন যৌথভাবে কাজ করছে। একই সঙ্গে জলাবদ্ধ সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্র পরিবর্তন এবং পরীক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়।

এর আগে ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত টানা বৃষ্টিতে মনোহরপুর এলাকার সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্র পুরোপুরি পানিতে তলিয়ে যায়। কেন্দ্রে প্রবেশের রাস্তা ডুবে যাওয়ায় অসংখ্য পরীক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে পারেননি। অনেককে কোমরসমান পানি মাড়িয়ে কেন্দ্রে যেতে হয়। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরে পরীক্ষার্থীদের পারাপারের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় আনা নৌকায় চড়ে অনেককে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেখা যায়। এই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় কুমিল্লায় ১০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। গত ২৪ ঘণ্টায় মোট বৃষ্টিপাত হয়েছে ১৩৮ দশমিক ২ মিলিমিটার। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, দিনভর আরও ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।

ভারী বর্ষণে নগরীর মনোহরপুর, মহিলা কলেজ রোড, বাগানবাড়ি, দক্ষিণ চর্থা, জিলা স্কুল সড়ক, পুলিশ লাইনস, রেসকোর্স, উত্তর রেসকোর্স, ঠাকুরপাড়া, বিসিক শিল্পনগরী, গোবিন্দপুর, মুরাদপুর, কান্দিরপাড়-টমছম ব্রিজ সড়ক এবং শহরতলির ছায়াবিতান এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। বহু সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। ড্রেন উপচে ময়লা-আবর্জনামিশ্রিত পানি রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।

নিচু এলাকার অসংখ্য বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ে। অনেক পরিবারকে আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় মালামাল উঁচু স্থানে সরিয়ে রাখতে হয়। অনেক এলাকায় রান্নাবান্নাও ব্যাহত হয়।

জলাবদ্ধতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে চলমান এইচএসসি পরীক্ষায়। বিভিন্ন কেন্দ্রগামী পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পানির মধ্যে হেঁটে কিংবা বিকল্প যানবাহনের সাহায্যে কেন্দ্রে যেতে হয়েছে। কেউ কেউ ভেজা কাপড়েই পরীক্ষায় অংশ নেন।

সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের পরীক্ষার্থী শাহীনা বেগম বলেন, “এমন দুর্যোগে অন্তত একদিনের জন্য পরীক্ষা স্থগিত রাখা উচিত ছিল। ভিজে কাপড়ে কেন্দ্রে যেতে হয়েছে। অনেক পরীক্ষার্থী পানিতে পড়ে গেছেন। প্রবেশপত্রও ভিজে গেছে”।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আবুল বাসার জানান, তাদের কেন্দ্রে আটটি কলেজের প্রায় দুই হাজার ১০০ পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। মাঠে পানি জমলেও পরীক্ষার কক্ষে পানি প্রবেশ করেনি। বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী বিলম্বে আসা পরীক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সময় দেওয়া হয়েছে।

কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আহসান পারভেজ বলেন, “বোর্ডের অধীন ছয় জেলাতেই ভারী বর্ষণের প্রভাব পড়েছে। কোনো পরীক্ষার্থী যেন পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়ে কেন্দ্র সচিবদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে”।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, “পরীক্ষা শুরুর আগ থেকেই আমরা মাঠে ছিলাম। পরীক্ষার্থীদের নিরাপদে কেন্দ্রে প্রবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশনের কর্মীরাও নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছেন”।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *