মিসাইল ফুরিয়ে যাওয়ার ভয়ে ইরানে হামলা স্থগিত

✍︎ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ✍︎

ইরানে টানা দুই সপ্তাহ বিমান হামলা চালানোর পর গত দুই দিন ধরে অভিযান থেকে বিরত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মূলত ইরানের পাল্টা হামলা প্রতিহত করার জন্য যে ইন্টারসেপ্টর মিসাইল রয়েছে সেটি ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে হামলা থেকে বিরত আছে মার্কিনিরা।

রোববার (২৬ জুলাই) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস।

প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার শীর্ষ নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের বৈঠকে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এরপরই ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত বড় ধরনের হামলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে হোয়াইট হাউস।

এর আগে গত শুক্রবার ট্রাম্প ইরানে বিমান হামলা আরও জোরদারের ঘোষণা দিলেও, পরবর্তী বৈঠকের পর সেই অবস্থান থেকে সরে আসেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ট্রাম্প ও তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টারাও আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে ইরানের হামলার ঝুঁকিতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি ও শরণার্থী সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

আলোচনার বিষয়ে অবগত দুই ব্যক্তি বলেছেন, গত শুক্রবার ট্রাম্প তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টা ও মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পরই ইরানকে ঘিরে তাঁর কৌশলে সর্বশেষ পরিবর্তন আসে।

কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় পেন্টাগনের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রসহ অন্যান্য প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের মজুত কমে আসার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, শুক্রবার জর্ডানে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করার সময় একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। এতে তিন মার্কিন সেনা নিহত হন। আহত হন আরও কয়েকজন।

কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ব্যক্তিগতভাবে একটি বিষয়ে সতর্ক করেছেন। সেটি হলো, ইরানের বিরুদ্ধে আবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানো হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর কাছে থাকা আকাশ প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাবে।

তবে প্রেসিডেন্টকে জেনারেল কেইন কী পরামর্শ দিয়েছেন, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তাঁর মুখপাত্র।

হোয়াইট হাউসের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক স্টিভেন চিউং বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট সব সময়ই বলে আসছেন যে তিনি কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেন। তবে ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে ‘‘সন্ত্রাসী’’ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায় বা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর হামলা অব্যাহত রাখে, তবে তিনি সব ধরনের বিকল্প উপায়ের কথা মাথায় রাখবেন।’

স্টিভেন চিউং আরও বলেন, ‘কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও বারবার সামরিক হামলার পর ইরানের জন্য আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করাটাই বুদ্ধিমত্তার কাজ হবে। না হলে কী ঘটতে পারে, তা তারা ভালোভাবেই জানে।’

প্রায় পাঁচ মাস ধরে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যে যুদ্ধ চলছে, সেটিকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে এবং বিশেষ করে কীভাবে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া যাবে—এ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দোটানায় আছেন। গত দুই সপ্তাহে সংঘাত আবারও বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করেছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও কার্যত ভেঙে পড়েছে। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের চালানো ব্যাপক হামলাও ইরানকে তার সামরিক অবস্থান থেকে পিছু হটাতে পারেনি।

টানা দুই সপ্তাহের সংঘাতের পর গতকাল শনিবার প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি লড়াই হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। তবে পরিস্থিতি এখনো উত্তেজনাপূর্ণ। কারণ, ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হুতিদের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। ইরানে টানা ১৩তম রাতের মতো হামলা চালানোর পর গতকাল রাতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আর নতুন কোনো হামলার ঘোষণা দেয়নি।

শুক্রবারের বৈঠকের আগে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, প্রয়োজন হলে মার্কিন সেনাবাহিনী আরও ব্যাপক হামলা চালাতে প্রস্তুত আছে। তবে একই সঙ্গে তিনি কূটনৈতিক সমাধানের পথও খোলা রাখার কথা বলেন।

শুক্রবার বিকেলে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘দেখুন, আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। প্রয়োজন হলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযান শুরু করতে পারি। তবে আমরা এখনো তাদের সঙ্গে আলোচনা করছি। তাই পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।’

এ মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পরই ট্রাম্প তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টা ও মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এমন এক সময় এ বৈঠক হয়েছে, যখন ইরান-নীতি নিয়ে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। কারণ, দুই দেশের নাজুক যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনায় ফেরানোর উদ্দেশ্যে করা সমঝোতা স্মারকও কার্যত অকার্যকর হয়ে গেছে।

গত এপ্রিলের শেষ দিকে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুদ্ধ চলাকালে পেন্টাগন ১ হাজার ২০০টির বেশি প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ৪০ লাখ ডলারের বেশি। প্রতিরক্ষা দপ্তরের অভ্যন্তরীণ হিসাব ও কংগ্রেসের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের এমন অস্ত্রের মজুত উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে।

ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারসহ তাঁর অনেক উপদেষ্টা মনে করেন, কম ঝুঁকিপূর্ণ আরেকটি পথ রয়েছে। সেটি হলো দীর্ঘ সময় ধরে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। তবে বর্তমানে কার্যকর কোনো আলোচনা চলছে কি না বা আলোচনা হলেও তা ইরান সরকারের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য কাটিয়ে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, সম্প্রতি আবার চালু করা যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের ফলও মিশ্র। এ অবরোধের লক্ষ্য ছিল ইরানের বন্দরে প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজগুলোর যাত্রা বাধাগ্রস্ত করা। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, জুনের মাঝামাঝি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর ইরান আবারও কিছু তেল রপ্তানি করতে (মূলত চীনে) সক্ষম হয়েছে। সেই তেলের বড় অংশ এখনো সরবরাহের পথে আছে।

মঙ্গলবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চীন ইরান থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা প্রায় ৪০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। তাঁর দাবি, এতে ইরানের তেল বিক্রির আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *