✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
রাজধানীর তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা ক্যাম্পাসে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, মারধর ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সংঘটিত সহিংসতায় উভয় পক্ষের অন্তত ৫০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।
বিকেল পৌনে ৫টার দিকে এসব ঘটনায় আহত চিকিৎসাধীন শিবির ও ছাত্রশক্তির নেতাদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের মহানগর দক্ষিণের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এ সময় কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা যৌথ মিছিল নিয়ে আসার পর এ হামলা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এর আগে গতকাল সোমবার (৩ আগস্ট) রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই অভ্যুত্থান উপলক্ষে ‘জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই’ প্রদর্শনীতে শিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর ছাত্রদলের নেতাদের হামলার অভিযোগ উঠেছে। পরে তাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
আলিয়া মাদ্রাসা
রাজধানীর বকশীবাজারে সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া (আলিয়া মাদ্রাসা) চত্বরে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় মাদ্রাসার অধ্যক্ষসহ অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন। তাঁদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
আজ মঙ্গলবার বিকেল ৪টার দিকে আলিয়া মাদ্রাসা চত্বরে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। পরে মাদ্রাসার সামনের সড়কে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
আহত ব্যক্তিরা হলেন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাহমুদ ওবায়দুল হক (৫০), মাদ্রাসার ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সানাউল্লাহ (৩০), লালবাগ থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নিছার উদ্দিন রাব্বি (২৭), ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সভাপতি শামীম মাহমুদ (৩০), সমকালের মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিক নাজমুল ইসলাম (২৬), লালবাগ ২৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের আহ্বায়ক জানে আলম (৪৮) ও মাদ্রাসার ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রুবেল হোসেন মমিন (৩০)।
আহত নিছার উদ্দিন রাব্বি অভিযোগ করেন, তিনি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নন। বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে মাদ্রাসা চত্বরে বসে থাকাকালে শিবিরের নেতা-কর্মীরা তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। এ সময় লাঠিসোঁটা দিয়ে মারধর ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়।
ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা জানান, সানাউল্লাহর দুই পা, পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত রয়েছে। রাব্বির বাম পায়ে ইটের আঘাত ও পড়ে গিয়ে বাম হাতে চোট লেগেছে। সাংবাদিক নাজমুল ইসলামের পায়ে ইটের আঘাত এবং অধ্যক্ষ মাহমুদ ওবায়দুল হকের মাথায় আঘাত রয়েছে। আহত ব্যক্তিদের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে সংঘর্ষের ঘটনায় কিল-ঘুষির আঘাতে আহত ঢাকা কলেজ শাখা ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের সহসভাপতি রাইসুল ইসলাম (২৪) ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
সকালের দিকে প্রথম উত্তেজনার সৃষ্টি হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে একটি সেমিনারে প্রবেশকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের সঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীদের ধাক্কাধাক্কি এবং পরে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মারামারির ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সেমিনারে অংশ নিতে জকসু ও ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন দাবি-সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করলে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাদের বাগবিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। পরে সেমিনার শেষে শহীদ মিনারের সামনে দুপক্ষের মধ্যে আবারও সংঘর্ষ বাধে।
এ সময় জকসু ও ছাত্রশক্তির কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হয়ে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। অন্যদিকে কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হওয়ার দাবি করেছে ছাত্রদল।
জকসু ভিপি ও শিবির নেতা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘প্রক্টোরিয়াল টিম শিক্ষার্থীদের প্রবেশে বাধা দেয়। পরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়ে শিক্ষার্থী, জকসু সদস্যদের মারধর করেন। এ সময় আমি শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে গেলে আমার জামা ছিঁড়ে টেনেহিঁচড়ে ক্যাম্পাস থেকে তারা আমাকে বের করে দেয়।’
জাতীয় ছাত্রশক্তির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি শাহিন মিয়া অভিযোগ করেন, সেমিনার শেষে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালিয়ে জকসুর ভিপি, জিএস, এজিএস ও ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখকে বেধড়ক মারধর করেছে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, ইউজিসির চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানকে ঘিরে ছাত্রশিবির ও তাদের সহযোগী সংগঠন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এতে ছাত্রদলেরও বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছে।
ঢাকা কলেজ
মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা ক্যাম্পাসে মিছিল বের করেন।
ছাত্রশিবিরের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে গ্যালারি-২-এ শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির সময় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালান। এতে শিবিরের কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হন। আহতদের মধ্যে শাখা অফিস সম্পাদক আব্দুল মালেককে মাথায় আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
অন্যদিকে শিবিরের বহিরাগত নেতা-কর্মীরা সকালে ক্যাম্পাসে জড়ো হয়ে উসকানিমূলক আচরণ করে বলে দাবি করেন ঢাকা কলেজ ছাত্রদল। ছাত্রদলের এক কর্মীকে মারধর করার জেরেই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় বলে জানায় সংগঠনটি।
ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মিল্লাদ হোসেন বলেন, ‘শিবির সুপরিকল্পিতভাবে হামলার চেষ্টা করেছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে তারা অবস্থান নিয়েছেন।’
ঘটনার পর ঢাকা কলেজের মূল ফটকের সামনে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা মিছিল শুরু করলে এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কলেজ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবস্থান নেয়।
