অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক টেস্ট জয়

✍︎ ক্রীড়া প্রতিবেদক ✍︎

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। সিরিজের প্রথম টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারাল বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এটা বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়।

এর আগে ২০১৭ সালে নিজেদের মাঠে অজিদের বিপক্ষে এই সংস্করণে জয়ের স্বাদ পেয়েছিল বাংলাদেশ। দীর্ঘ ৯ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলতে নেমেও জয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখল তারা।

জয়ের জন্য বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্যটাই ছিল মামুলি; মাত্র ৫৭ রানের। রান তাড়ায় শুরুতেই তানজিদ হাসান তামিমকে হারায় বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে ১০১ রান এনে দেওয়া এই ব্যাটার এবার ফেরেন রানের খাতা খোলার আগেই। তামিমের বিদায় অবশ্য জয়ের পথে বাধা হতে পারেনি। সাদমান ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে বাকি কাজটুকু সারেন মুমিনুল হক।

দ্বিতীয় উইকেটে সাদমানের সঙ্গে ৫৩ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়েন মুমিনুল। বিউ ওয়েবস্টারের করা ১৫তম ওভারের দ্বিতীয় বলে বাউন্ডারি মেরে জয় নিশ্চিত করেন সাবেক অধিনায়ক। ২ চারের সাহায্যে ৩০ রান করেন তিনি। ৪ বাউন্ডারিতে সাদমানের অবদান ২৫ রান।

বাংলাদেশ ডারউইন টেস্ট জিতল সাড়ে তিন দিনেই। ব্যাটিং-বোলিং দুই বিভাগেই দারুণ ক্রিকেট খেলে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস গড়ল অতিথিরা। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের দাপুটে বোলিংয়ে ১৯৮ রানে গুটিয়ে যায় প্যাট কামিন্সরা। এ স্টিভ স্মিথ (৭১) ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার আর কোনো ব্যাটারকে দাঁড়াতে দেয়নি বাংলাদেশ। ৫৫ রানে ৬ উইকেট নিয়ে সবচেয়ে সফল হাসান মাহমুদ।

জবাবে বাংলাদেশ থামে ৪২৬ রানে। তানজিদ সেঞ্চুরির (১০১) পাশাপাশি শান্ত ৮৪, মেহেদী হাসান মিরাজ ৬৫, মুমিনুল এনে দেন ৪৯ রান। প্রথম ইনিংসে ২২৮ রানের লিডই জয়ের ভীত গড়ে দেয় বাংলাদেশকে। পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে অতি মানবীয় কিছু করতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। ২৮৪ রানে অলআউট হয় তারা। ৫ উইকেট নেন মিরাজ। তানকিনের শিকার তিনটি।

ডারউইনের আকাশে তখন শুধু বাংলাদেশের পতাকা। ২৩ বছর আগে যে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গিয়ে দুই টেস্টেই বড় ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ, সেই অস্ট্রেলিয়াতেই ফিরে এবার তাদের হারিয়ে দিল তারা। এই জয় শুধু একটি টেস্ট জয় নয়। এটি ২৩ বছরের অপেক্ষার অবসান এবং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের নতুন গল্পের শুরু। সব মিলিয়ে ডারউইনে বাংলাদেশ লিখল এমন এক ইতিহাস, যার অপেক্ষায় ছিল দেশের ক্রিকেট বহু বছর।

ইতিহাস গড়লেন অলরাউন্ডার মিরাজ

মেহেদি হাসান মিরাজের টেল-এন্ডারদের সঙ্গে নিয়ে ব্যাট হাতে ৬৫ রানের দারুণ এই ইনিংসের পর বল হাতেও ছিলেন প্রাণবন্ত। রোববার চতুর্থ দিনে খেলতে নেমে বাংলাদেশি এই অলরাউন্ডার নাম লেখালেন আরেকটি ইতিহাসের পাতায়। 

অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে এখন পর্যন্ত ৪ উইকেট শিকার করেছেন মিরাজ। তার অফ-স্পিন ঘূর্ণি প্যাট কামিন্সের ব্যাটের কানা ঘেঁষে শর্ট ফিল্ডার সাদমান ইসলামের হাতে জমা পড়তেই বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ১০০তম উইকেটের মাইলফলক পূর্ণ হয়ে গেল। বাংলাদেশের প্রথম কোনো ক্রিকেটার হিসেবে টেস্টের এই মেগা টুর্নামেন্টে ১০০ উইকেট ও ১০০০ রানের ডাবল গড়ার রেকর্ড গড়লেন মিরাজ।

এর আগে এমন কীর্তি আছে কেবল বিশ্বের চার ক্রিকেটারের। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতীয় দুই তারকা রবিচন্দ্রন অশ্বিন ও রবীন্দ্র জাদেজা, অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক প্যাট কামিন্স এবং ইংল্যান্ডের ক্রিস ওকস ১০০ উইকেট এবং ১০০০ রানের ডাবল পূর্ণ করেছিলেন। এখন পর্যন্ত বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ৩২টি ম্যাচ খেলেছেন মিরাজ, যেখানে তার শিকার ১০০ উইকেট এবং ব্যাট হাতে করলেন ১৪৩৬ রান।

আইসিসির এই মেগা টুর্নামেন্টে অবশ্য প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ১০০ উইকেটের মাইলফলক আগেই পূর্ণ করেছিলেন তাইজুল ইসলাম। উইকেটের সেই মাইফলকে মিরাজ দ্বিতীয় বাংলাদেশি বোলার। চলমান টেস্টের তৃতীয় দিনে অভিজ্ঞ অস্ট্রেলিয়ান তারকা স্টিভেন স্মিথকে বল এবং ক্যাচ বানিয়ে ফিরিয়েছিলেন মিরাজ। আর আজ একে একে তুলে নিলেন অ্যালেক্স ক্যারি, ব্যু ওয়েবস্টার ও কামিন্সের উইকেট।

আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্যারিয়ারে বাংলাদেশি এই অলরাউন্ডার এখন পর্যন্ত ৫৯ ম্যাচ খেলেছেন। যেখানে ৩.০৮ ইকোনমিতে মিরাজের শিকার ২২৩ উইকেট। ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছেন ১৪ বার এবং ম্যাচে ১০ উইকেট তিনবার। আর ব্যাট হাতে ২৪.১৭ গড়ে এই টেলএন্ডার ব্যাটারের রান ২২৯৬।

হারের কারণ ব্যাখ্যা করলেন কামিন্স

হারের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কামিন্সের চোখে ম্যাচের মোড় ঘুরে যায় প্রথম দিনেই। ‘সম্ভবত প্রথম দিন থেকেই। আমার মনে হয়েছে আমাদের প্রস্তুতি একদম ঠিকঠাক ছিল, সত্যি বলতে সেটা দারুণ ছিল। তাই প্রস্তুতি নিয়ে কোনো অজুহাত নেই। তারা খুব ভালো খেলেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম দিনের উইকেটে শুরুতে কিছুটা সহায়তা ছিল বলে আমার মনে হয়েছে। তবে অবশ্যই আমাদের আরও কিছুক্ষণ ব্যাট করার উপায় খুঁজে বের করতে হতো। এরপর বল হাতেও আমরা তেমনভাবে চাপ তৈরি করতে পারিনি। তবে তারা সত্যিই খুব ভালো খেলেছে।’

দ্বিতীয় ইনিংসে গ্রিনের ১০৪ রানের ইনিংস অস্ট্রেলিয়াকে বড় বিপদ থেকে কিছুটা রক্ষা করলেও তাকে যথেষ্ট সঙ্গ দিতে পারেনি অন্য ব্যাটাররা। কামিন্স বলেন, ‘গ্রিন দেখিয়েছে সে কতটা ভালো। তার সঙ্গে আমাদের আরও দু-একজনকে টিকে থাকতে হতো।’

অন্যদিকে বাংলাদেশের সাফল্যের বড় কারণ ছিল বোলারদের ধৈর্য ও পরিকল্পনা। দুই ইনিংস মিলিয়ে ৯ উইকেট নেওয়া হাসান মাহমুদ এবং দ্বিতীয় ইনিংসে পাঁচ উইকেট পাওয়া মেহেদী হাসান মিরাজ অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংকে বারবার চাপে ফেলেছেন।

বাংলাদেশের এই শৃঙ্খলাবদ্ধ পারফরম্যান্সের স্বীকৃতিও দিয়েছেন কামিন্স। ‘তারা করেছে। আমার মনে হয়, সব বিভাগেই তারা আমাদের পুরোপুরি ছাড়িয়ে গেছে। তারা খুব ধৈর্যশীল এবং বেশ শৃঙ্খলাবদ্ধ ছিল। আর আমরা একবার পিছিয়ে পড়ার পর সেখান থেকে ফিরে আসাটা সত্যিই কঠিন হয়ে গিয়েছিল।’

এমন হারের পর দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যাপারে আশাবাদী অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক। দ্বিতীয় টেস্টে নিজেদের ভুল শুধরে শক্তভাবে ফেরার লক্ষ্যই এখন তার দলের সামনে।

ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ে টাইগারদের প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদেরই হারিয়ে প্রথমবারের মতো ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজ জয়ের সূচনা করায় বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

রোববার (১৬ আগস্ট) ডারউইনে সিরিজের প্রথম টেস্টে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে এক স্মরণীয় জয় তুলে নিয়েছে টাইগাররা। দীর্ঘ ২৩ বছর পর দেশটির মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমেই এই অনন্য সাফল্য অর্জন করল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।

টাইগাররা যখন এই ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করে, তখন কিশোরগঞ্জ সফরে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। খেলা শেষ হওয়ার পরপরই তিনি বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে ভিডিও কলে যুক্ত হন এবং জয়ের জন্য পুরো দলকে সরাসরি অভিনন্দন জানান। এ সময় তিনি দেশবাসীর পক্ষ থেকেও দলের কাছে শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন।

অভিনন্দন বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তাদেরই মাটিতে বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক জয় দেশের ক্রিকেটের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। খেলোয়াড়দের দৃঢ় মনোবল, আত্মবিশ্বাস ও চমৎকার দলগত প্রচেষ্টার ফলেই এই অসাধারণ সাফল্য অর্জিত হয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী বিজয়ী দলের খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে শুভকামনা জানান। সেই সঙ্গে আশা প্রকাশ করেন, সিরিজের পরবর্তী টেস্টেও একই ধরনের পারফর্ম বজায় রেখে প্রথমবারের মতো সিরিজ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করবে বাংলাদেশ।

সংক্ষিপ্ত স্কোর: 

অস্ট্রেলিয়া: ১৯৮ ও ২৮৪ (গ্রিন ১০৪, স্মিথ ৪৪, লাবুশেন ৩১, ক্যারি ৩০, স্টার্ক ১৮, লায়ন ১৫; মিরাজ ৫/৬৬, হাসান ৩/৫৬, তাসকিন ১/৬৬, তাইজুল ১/৫১, ইবাদত ০/৩৮)। 

বাংলাদেশ: ৪২৬ ও ১/৫৭ (মুমিনুল ৩০, সাদমান ২৫, তানজিদ ০; হ্যাজলউড ১/৫, স্টার্ক ০/১৫, লায়ন ০/২৩)। 

ফল: বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী। 

ম্যাচসেরা: হাসান মাহমুদ। 

সিরিজ: দুই ম্যাচের সিরিজে ১–০ ব্যবধানে এগিয়ে বাংলাদেশ।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *