দেশের মাটিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়

✍︎ ক্রীড়া প্রতিবেদক ✍︎ 

প্রথমবারের মত ঘরের মাঠে ঐতিহাসিক টেস্টে পাকিস্তানকে ১০৪ রানে হারিয়েছে বাংলাদেশ। ২৬৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তান দ্বিতীয় ইনিংসে অলআউট হয়েছে মাত্র ১৬৩ রানে।

মিরপুর টেস্টে মুখোমুখি হবার আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৫টি টেস্ট খেলেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে মাত্র দুটি ম্যাচে জয়ের দেখা পায় টাইগাররা। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের জেতা ওই ২টি ম্যাচই ছিল পাকিস্তানের মাটিতে। এবার প্রথমবারের মত ঘরের মাঠে টেস্টে পাকিস্তানকে হারাল বাংলাদেশ। এতে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল নাজমুল হাসান শান্তর দল। সব মিলিয়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে তারা জিতল টানা তিনটি টেস্টে।

২৬৮ রানের বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ইনিংসের শুরুতেই হোঁচট খায় পাকিস্তান। প্রথম ওভারেই ইমাম-উল-হককে (২) কট-বিহাইন্ডের ফাঁদে ফেলে জয়ের ভিত গড়ে দেন তাসকিন আহমেদ। সেই ধাক্কা সামলে দ্বিতীয় উইকেটে আজান আওয়াইস ও আব্দুল্লাহ ফজল ৫৪ রানের জুটি গড়ে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন। তবে থিতু হয়ে বসা আজানকে (১৫) প্রলুব্ধ করে বোল্ডের স্বাদ দেন মেহেদী হাসান মিরাজ।

প্রথম ইনিংসের মতো দ্বিতীয় ইনিংসেও ব্যর্থ হয়েছেন পাকিস্তান অধিনায়ক শান মাসুদ। মাত্র ২ রান করে তিনি নাহিদ রানার গতির কাছে পরাস্ত হন। এর মাঝে এক প্রান্ত ধরে রেখে লড়াকু ফিফটি তুলে নেন ফজল। ৩১ ওভারে ৩ উইকেটে ১১৬ রান তুলে পাকিস্তান চা-বিরতিতে যায়। তখনো তাদের জয়ের জন্য ১৫২ রান প্রয়োজন ছিল। বিরতি থেকে ফিরেই আম্পায়ার্স কলে বেঁচে যাওয়া ফজলকে (৬৬) এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলে সবচেয়ে বড় বাধাটি সরিয়ে দেন স্পিনার তাইজুল ইসলাম। ফজল বিদায় নিতেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপ। পরের ওভারেই তাসকিন আহমেদ স্লিপে সাদমানের ক্যাচ বানিয়ে বিদায় করেন সালমান আলীকে (২৬)। 

ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট ছিল পঞ্চম দিনের শেষ সেশন। যেখানে পাকিস্তানের সব আশা শেষ করে দেন নাহিদ রানা। তার বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন সৌদ শাকিল (১৫)। এরপর ১৪৭ কিলোমিটার গতির এক ‘ম্যাজিক’ ইন-সুইঙ্গারে রিজওয়ানকে বোল্ড করেন তিনি। এরপর একে একে হাসান আলী ও নোমান আলী দ্রুত বিদায় নিলে বাংলাদেশের জয় কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

শেষ পর্যন্ত শাহিন শাহ আফ্রিদিকে ফিরিয়ে পাকিস্তানের দ্বিতীয় ইনিংসের ইতি টানেন নাহিদ। ৫ রানে অপরাজিত থাকেন মোহাম্মদ আব্বাস। ৪০ রানে পাঁচ উইকেট নেন নাহিদ। টেস্টে দ্বিতীয়বার তিনি নিলেন পাঁচ উইকেট। তার আগের সেরা ছিল ৬১ রানে পাঁচ উইকেট। দ্বিতীয় ইনিংসে তাইজুল ও তাসকিন নিয়েছেন দুটি করে উইকেট। মিরাজ নিয়েছেন ১ উইকেট।

এর আগে, প্রথম টেস্টের চতুর্থ দিন শেষে দ্বিতীয় ইনিংসে ৩ উইকেটে ১৫২ রান করেছিল বাংলাদেশ। ৭ উইকেট হাতে নিয়ে ১৭৯ রানে এগিয়ে ছিল টাইগাররা। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ৫৮ ও মুশফিকুর রহিম ১৬ রানে অপরাজিত ছিলেন। পঞ্চম দিন শান্ত ৮৭, মুশফিক ২২, লিটন দাস ১১, মেহেদি হাসান মিরাজ ২৪, তাইজুল ইসলাম ৩, তাসকিন আহমেদ ১১ রানে আউট হন। ৪ রানে অপরাজিত থাকেন এবাদত হোসেন। এ ছাড়া আগের দিন মাহমুদুল হাসান জয় ৫, সাদমান ইসলাম ১০ ও মুমিনুল হক ৫৬ রানে আউট হন।

১১ টেস্টের ক্যারিয়ারে নাহিদ রানার সেরা বোলিং। আগের সেরা ৫/৬১, ২০২৪ সালে কিংস্টনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে।
• টেস্টের চতুর্থ ইনিংসে বাংলাদেশের প্রথম পেসার হিসেবে ৫ উইকেট পেলেন নাহিদ রানা। আগের সেরা তাসকিন আহমেদের (৪/৩৭), ২০২৩ সালে আফগানিস্তানের বিপক্ষে।
• টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের কোনো পেসারের সেরা বোলিং। আগের সেরা হাসান মাহমুদের (৫/৪৩), ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে দ্বিতীয় টেস্টে।
• বাংলাদেশ জিতেছে, এমন টেস্টে কোনো পেসারের দ্বিতীয় সেরা বোলিং। সেরা ইবাদত হোসেনের (৬/৪৬), ২০২২ সালে মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে।
• ঘরের মাঠে বাংলাদেশের পেসারদের দ্বিতীয় সেরা বোলিং। সেরা শাহাদাত হোসেনের (৬/২৭), ২০০৮ সালে মিরপুরেই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের পেসাররা ইনিংসে ৫ উইকেট পেয়েছেন এই দুবারই।

পাকিস্তানের হাসান আলি ও নোমান আলি ২টি করে উইকেট নেন। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ৪১৩ ও পাকিস্তান ৩৮৬ রান করেছিল। ২৭ রানের লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং শুরু করা বাংলাদেশ ২৪০ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করলে পাকিস্তানের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৬৮ রান।

এর আগে প্রথম সেশনে ১ উইকেট নেওয়ার পর দ্বিতীয় সেশনে আরও ২ উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে বাংলাদেশ। চা-বিরতিতে যাওয়ার সময় ৩১ ওভারে পাকিস্তানের রান ৩ উইকেটে ১১৬। ৬৬ রানে অপরাজিত ছিলেন আব্দুল্লাহ ফজল। তাকে যোগ্য সঙ্গ দেন সালমান আলী আঘা (২১*)। চতুর্থ উইকেটে এই দুজনে অবিচ্ছিন্ন ৪৮ রানের জুটি গড়ে পাকিস্তানকে জয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। জয়ের জন‍্য তৃতীয় ও শেষ সেশনে ৭ উইকেট চাই স্বাগতিকদের। অন্যদিকে জয়ের জন‍্য শেষ সেশনে পাকিস্তানের দরকার ১৫২ রান।

তৃতীয়বার টেস্টের দুই ইনিংসেই ৮০ ছাড়ালেন নাজমুল হাসান শান্ত। বাংলাদেশের আরও কারও দুবার নেই এই কীর্তি।
• বাংলাদেশ জিতেছে, এমন টেস্টে অধিনায়কদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রান এখন নাজমুলের (৫২০)। পেছনে পড়েছেন মুশফিকুর রহিম (৪৫৮)।
• মাত্র ১৩ রানের জন্যই টেস্ট ইতিহাসে চতুর্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে তৃতীয়বার জোড়া সেঞ্চুরির কীর্তি ছুঁতে পারেননি।

টাইগারদের প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন

দেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচ জেতায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

আজ মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এই অভিনন্দন জানান।

অভিনন্দন বার্তায় প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ঢাকার মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্টে ১০৪ রানের জয় পান টাইগাররা। তাঁদের আন্তরিক অভিনন্দন।

এর আগে, পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের সর্বশেষ দুটি টেস্ট জয় এসেছিল পাকিস্তানের মাটিতে। এবার প্রথমবারের মতো দেশের মাটিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট জয়ের স্বাদ পেল বাংলাদেশ। এ ছাড়া পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা তৃতীয় টেস্ট জয়ের কৃতিত্বও অর্জন করলেন টাইগাররা।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *