✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট আবারও তীব্র হয়ে উঠেছে লোডশেডিং। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় লোডশেডিংয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, আজ বিকেল ৫টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৪৬৯ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১২ হাজার ৯৫২ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫১৭ মেগাওয়াট। সন্ধ্যা ৬টায় ১৬ হাজার ৩৮৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৩৬২ মেগাওয়াট; ঘাটতি ৩ হাজার ২৭ মেগাওয়াট। সন্ধ্যা ৭টায় ১৭ হাজার ৫৪১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ৫৩১ মেগাওয়াট; ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ১০ মেগাওয়াট। রাত সাড়ে ৭টায় চাহিদা ১৭ হাজার ৫৫১ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ নেমে আসে ১৫ হাজার ১৯ মেগাওয়াটে। তখন ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৫৩২ মেগাওয়াট।
দিনের শুরু থেকেই বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি ছিল। সকাল ও দুপুরে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম থাকায় রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েক দফা লোডশেডিং হয়েছে। কোথাও এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর আবার চলে গেছে, আবার কোথাও নির্ধারিত সময়ের বাইরেও সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে।
পেট্রোবাংলার শনিবার রাত ৮টার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে ২১৯ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে ১৬১ কোটি ২০ লাখ এবং এলএনজি থেকে এসেছে ৫৮ কোটি ঘনফুট। কয়েক দিন আগেও এলএনজি থেকে ৭৫ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। ফলে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এদিন সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৮টা পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণকাজের জন্য সামিটের এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ ছিল। এতে দিনের বড় একটি অংশে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হয়। এ সময় এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে প্রায় ৫৫ থেকে ৫৭ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়। রাতে সামিটের টার্মিনাল চালু হওয়ায় সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
তবে নতুন এলএনজি কার্গো আনা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা কম। আগামী ১ ও ৪ সেপ্টেম্বর দুটি কার্গো পৌঁছানোর নিশ্চয়তা পাওয়া গেলেও এর আগে নির্ধারিত কয়েকটি কার্গো না আসায় গ্যাস সরবরাহে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
সরকারি হিসাবে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। তবে খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত চাহিদা ৫০০ থেকে ৫৫০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ করা হয় প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান বড়ই থেকে যাচ্ছে।
গ্যাসের পাশাপাশি কয়লার সংকটও বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ সৃষ্টি করছে। মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে। কয়লা সংকটে আদানির কেন্দ্র থেকেও ৫০০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রেও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। তবে বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে কেন্দ্রটি পুরোপুরি বন্ধ রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
ঘাটতি সামাল দিতে পিডিবি তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল না থাকায় সব কেন্দ্র চালানো যাচ্ছে না। ফলে গ্যাস, কয়লা ও তেল-তিন জ্বালানির সংকটই বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাতেও গ্যাসের স্বল্প চাপের অভিযোগ রয়েছে। ভোরে সামান্য গ্যাস মিললেও সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাপ কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন বাসিন্দারা। অনেকে বাধ্য হয়ে এলপিজি ব্যবহার করছেন। এতে বাড়ছে সংসারের খরচ।
শিল্পাঞ্চলেও সংকটের প্রভাব প্রকট। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও দিনের বড় একটি অংশে কারখানা চালানো যাচ্ছে না। এর সঙ্গে লোডশেডিং যোগ হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানকে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং সময়মতো রপ্তানি পণ্য সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
গ্যাসের চাপ কম থাকায় সিএনজি স্টেশনগুলোতেও ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। অনেক স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। গ্যাসের সংকটের কারণে জ্বালানি নিতে চালকদের অতিরিক্ত সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো কঠিন। এর সঙ্গে গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। উৎপাদন ও চাহিদার ব্যবধান দ্রুত কমানো না গেলে আগামী দিনগুলোতে লোডশেডিং আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পাহাড়ি ঢলে নেপালের বিস্তীর্ণ অঞ্চল লন্ডভন্ড হওয়ার পর দেশটি থেকে ভারতীয় গ্রিড হয়ে আসা ৩৮ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ কম থাকায় এই দুই উৎস থেকেও কমেছে বিদ্যুতের জোগান। ফলে মাত্র ১৫ হাজার মেগাওয়াটের চাহিদা পূরণ করতে গিয়েও ঘণ্টায় আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
এদিকে গ্রাম ও শহরে বিদ্যুতের সমবণ্টন শুরু হওয়ার পর জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিদ্যুতের আসা-যাওয়া কিছুটা কমে এসেছে।
তবে বিপত্তি শুরু হয়েছে শহরাঞ্চলে। দিনে দুই থেকে তিন বার আবার কোথাও চারবারও বিদ্যুৎ যাচ্ছে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে। ফলে লোডশেডিং এখন মানুষের নিত্যদিনের ভোগান্তির অংশ হিসেবে স্থায়ী রূপ লাভ করেছে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, দুটি এলএনজি টার্মিনাল সচল হলেও নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী এলএনজি কার্গো পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে কিছুটা মধ্যম সক্ষমতায় টার্মিনালগুলো চালু রাখা হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টায় দুটি এফএসআরইউ থেকে মোট ৭২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়েছে, যেখানে মোট সক্ষমতা ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ওই সময় এলএনজিসহ মোট সরবরাহ ছিল ২৩৪০ মিলিয়ন ঘনফুট, যেখানে সংকট শুরুর আগে গড় সরবরাহ ছিল ২৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
পিডিবির সদস্য উৎপাদন জহুরুল ইসলাম জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নেপালের কিছু অংশে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। নেপালের বিদ্যুৎ ভারতের গ্রিড ব্যবহার করে বাংলাদেশে আসছিল। এখন নেপাল অন্য একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ভারতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দিতে চাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়া গেলেই সরবরাহ শুরু হবে।
