✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
পেট্রল, অকটেন, ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। রোববার রাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। রোববার মধ্যরাত থেকে নতুন এই দাম কার্যকর হবে।
নতুন ঘোষিত মূল্য অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি হবে ১৩৫ টাকায়, যা ১১৫ টাকা ছিল। প্রতি লিটার কেরোসিনের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫৫ টাকা, যা ছিল ১৩৫ টাকা। প্রতি লিটার পেট্রলের নতুন দাম ১৬০ টাকা, যা ১৪০ টাকা ছিল। প্রতি লিটার অকটেন ১৬৫ টাকায় বিক্রি হবে, যা ১৪৫ টাকা ছিল।
মূল্যবৃদ্ধির ব্যাখ্যায় মন্ত্রণালয় জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে গত মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্য ও ফ্রেইট চার্জ বেড়েছে, যা এখনো অব্যাহত আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও সরকার জনস্বার্থে দেশে মূল্যবৃদ্ধি করেনি। ফলে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
বর্তমানে ডিজেলের মূল্য ভারতে (কলকাতা) ১৩৪ দশমিক ৭৬ টাকা, মিয়ানমারে ১৬৪ দশমিক ৮৩ টাকা, নেপালে ১৬১ দশমিক ২৪ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ দশমিক ৪২ টাকা, থাইল্যান্ডে ১৫১ দশমিক ২২ টাকা, ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০ দশমিক ৭১ টাকা, ফিলিপাইনে ১৬৮ দশমিক ৫৩ টাকা, পাকিস্তানে ১৮৫ দশমিক ৪৮ টাকা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪৪ দশমিক ৭৯ টাকা।
মন্ত্রণালয় বলেছে, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনুযায়ী ডিজেলে বিপিসির লিটারপ্রতি লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা। সে হিসাবে দৈনিক লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। চলতি ধারা অব্যাহত থাকলে শুধু ডিজেলে বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হবে।
জ্বালানি বিভাগ বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ও ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এখনো অব্যাহত আছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেলেও সরকার জনস্বার্থে দেশে মূল্যবৃদ্ধি করেনি। ফলে গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
বিপিসির হিসাবে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ৪ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের এপ্রিলে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে এপ্রিলে আমদানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৯৪ শতাংশ। মে মাসে ২০২৫ সালের ৪ হাজার ১৮২ কোটি টাকার বিপরীতে চলতি বছর ব্যয় হয়েছে ১৩ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা, যা প্রায় ২২২ শতাংশ বেশি। আগস্টে ব্যয় হয়েছে ৭ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা, যেখানে গত বছর একই মাসে ছিল ২ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা। বৃদ্ধি প্রায় ১৭৭ শতাংশ।
এই বাড়তি ব্যয়ের বড় চাপ পড়েছে ডিজেলে। বিপিসির হিসাবে, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় প্রতি লিটার ডিজেলে ৯০ টাকার বেশি লোকসান হচ্ছে। এতে দৈনিক লোকসান দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৩০ থেকে ১৩৫ কোটি টাকা। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বিপিসি নিজস্ব তহবিল থেকে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে। এর মধ্যে এপ্রিলেই লোকসান ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি এবং জুনে ৬ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরে লোকসান ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।
আমদানি ব্যয়ের পাশাপাশি শুল্কও বিপিসির খরচ বাড়াচ্ছে। আগে ট্যারিফ মূল্যের ভিত্তিতে শুল্ক নেওয়া হলেও এখন ইনভয়েস মূল্যের ভিত্তিতে তা নির্ধারণ করা হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি পর্যায়ে শুল্কও বাড়ছে। প্রতি লিটার তেলে শুল্ক ফেব্রুয়ারিতে ১৮ টাকা ৩৬ পয়সা থেকে মার্চে ৩৮ টাকা ৬৪ পয়সা, এপ্রিলে ৩৮ টাকা ৯০ পয়সা এবং আগস্টে ৩২ টাকা ৪৪ পয়সায় ওঠে। ফলে শুল্কসহ প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে বিপিসির ব্যয় এখন প্রায় ২০৫ টাকা।
তেল আমদানির অর্থ জোগাতে চলতি বছর বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তুলেছে বিপিসি। অথচ নিয়ম অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সমন্বয় করে অন্তত দুই মাসের তেল আমদানির অর্থ সংস্থাটির হিসাবে থাকার কথা। সে হিসাবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা থাকার কথা হলেও বর্তমানে রয়েছে ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা।
এর সঙ্গে সামনে রয়েছে আরও কয়েকটি বড় ব্যয়। ডিসেম্বরের মধ্যে এলপিজি প্ল্যান্টের জন্য জমি অধিগ্রহণে ৫২৪ কোটি টাকা, এসপিএম প্রকল্পের ঋণের কিস্তিতে ৬৯০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য প্রকল্পে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
চলতি বছরের শুরুতে জ্বালানি তেলের দাম দুই দফায় কমেছিল। ফেব্রুয়ারিতে ডিজেল ১০০, কেরোসিন ১১২, পেট্রল ১১৬ ও অকটেন ১২০ টাকা হয়। মার্চে দাম অপরিবর্তিত ছিল।
এপ্রিলে বড় ধরনের সমন্বয়ে ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বা ১৫ শতাংশ, কেরোসিন ১৮ টাকা বা ১৬ দশমিক ০৭ শতাংশ, পেট্রল ১৯ টাকা বা ১৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং অকটেন ২০ টাকা বা ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ বাড়ে।
জুনে কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনে আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। এ বৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ৩ দশমিক ৮৫, ৩ দশমিক ৭০ ও ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এরপর জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দাম অপরিবর্তিত ছিল।
