লোডশেডিং: তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন বাড়ছে

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎

লোডশেডিং কমিয়ে আনতে তেলভিত্তিক (ফার্নেস ওয়েল) বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। এসব কেন্দ্র থেকে মোট চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। 

কেন্দ্রগুলো থেকে এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করার জন্য প্রয়োজনীয় আরও ১৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) চাহিদা অনুযায়ী ৬ হাজার কোটি টাকা সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া হয়েছে। 

বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ৫৪টি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ৬ হাজার ৪০৯ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদন সক্ষমতা হচ্ছে ৫ হাজার ৬৪১ মেগাওয়াট এবং ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ৭৬৮ মেগাওয়াট। এটি দেশের মোট স্থাপিত সক্ষমতার প্রায় ২২.২৫%। তবে বর্তমানে জ্বালানি সংকটের কারণে সব তেলভিত্তিক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না। 

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের (এনএলডিসি) বেসরকারি এইচএফও বা ফার্নেস অয়েলভিত্তিক ৩৯টি কেন্দ্র ও ইউনিটের বর্তমান সক্ষমতা প্রায় ৪ হাজার ৩২৮ মেগাওয়াট। গত ২৩ আগস্ট সন্ধ্যার সময় সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে চালু থাকা ৩৬টি কেন্দ্র থেকে প্রায় ২ হাজার ৯১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছিল। এরপর উৎপাদন কমতে থাকে। ২৯ আগস্ট সন্ধ্যায় তা নেমে আসে প্রায় ২ হাজার ৫৭০ মেগাওয়াটে। সরকারের চাহিদা অনুযায়ী চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের লক্ষ্যমাত্রার জন্য আরও প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। সক্ষমতা থাকায় সরকার চাইলে আরও আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে প্রস্তুতি আছে বলে জানায় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিপ্পা)। 

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, লোডশেডিং কমানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি) ছয় হাজার কোটি টাকা সুদমুক্ত ঋণ দিয়েছে সরকার। এই অর্থ দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য ফার্নেস অয়েল কেনা হবে। গত রোববার অর্থ বিভাগের অনুমোদনের পর এ অর্থ বিপিডিবিকে ছাড় করা হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের পরিচালন ঋণ (অপারেটিং লোন) খাত থেকে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সরকারি স্মারকে বলা হয়েছে, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দৈনিক গড়ে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে জ্বালানি কেনায় এই অর্থ ব্যবহার করা হবে। ঋণটির বিপরীতে কোনো সুদ দিতে হবে না। বিদ্যুৎ খাতের প্রকৃত ক্ষতির বিপরীতে সরকার এই অর্থ সমন্বয় করবে। আগামী ২০২৭ সালের মার্চ থেকে ঋণ পরিশোধ শুরু করার কথা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্পে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিশেষ করে এলএনজি আমদানিতে দেরির কারণে গ্যাসের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে তেলভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে শিল্পে সরবরাহ বাড়ানোর মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা করছে সরকার। সরকারের সর্বশেষ এই সিদ্ধান্তে একদিকে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়বে, অন্যদিকে গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় শিল্প খাতে কিছুটা স্বস্তি ফিরবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর গত ২১ আগস্ট বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গ্যাস সরিয়ে শিল্প-কারখানায় সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের সরবরাহ সর্বোচ্চ ১১০ মিলিয়ন ঘনফুট কমিয়ে তা ৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হচ্ছে। আগে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দৈনিক প্রায় ৯৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। মূলত শিল্পের গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। 

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, বিপিডিবির চাহিদা অনুযায়ী র্ফানেস ওয়েল সরবরাহ করা হচ্ছে। বর্তমানে সাপ্লাই চেইন ঠিক রয়েছে। প্রতিটি কার্গো সময়মতো আসছে। নাম প্রকাশ না করে ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এই মুহূর্তে (গতকাল সোমবার সন্ধ্যা) একটি কার্গো থেকে ফার্নেস ওয়েল আনলোড হচ্ছে। সুতরাং আমরা চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে সক্ষম হব। 

এদিকে কয়েক দিন ধরে সারা দেশে লাগামহীন লোডশেডিং চলছে। আগে রাজধানীতে তুলনামূলক কম লোডশেডিং হলেও এখন নিয়ম করেই হচ্ছে লোডশেডিং। সারা দিনে কয়েকবার এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং হচ্ছে রাজধানীজুড়ে। পাওয়ার গ্রিডের গতকাল দুপুর ১২টার তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ১৪৬ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন ছিল ১৩ হাজার ৪৫ মেগাওয়াট। এই সময় সারা দেশে লোডশেডিং ছিল তিন হাজার ১০১ মেগাওয়াট। 

তেলের দাম অপরিবর্তিত রেখে সেপ্টেম্বর মাসে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে সেপ্টেম্বর মাসে জ্বালানি তেলের সর্বশেষ নির্ধারিত খুচরা মূল্যই বহাল থাকবে। গতকাল সোমবার বিকালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সেপ্টেম্বরজুড়ে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫, অকটেন ১৪৫ এবং পেট্রোল ১৪০ টাকায় বিক্রি হবে। সর্বশেষ নির্ধারিত এ মূল্য আজ ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *