রসায়নে নোবেল পেলেন দুই বিজ্ঞানী

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎  

চলতি বছর রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফরাসি বিজ্ঞানী অঁরি কাগান (Henri Kagan) এবং জাপানের বিজ্ঞানী কেনসো সোআই( Kenso Soai)। ‘অপ্রতিসম জৈব সংশ্লেষণে নন-লিনিয়ার ইফেক্ট ও অটোক্যাটালাইসিস আবিষ্কারের’ স্বীকৃতি হিসেবে দুই গবেষককে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

ওষুধ উৎপাদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যেসব রসায়নবিদ বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার নকশা নিয়ে কাজ করেন, তাঁদের কাছে এই আবিষ্কারের গুরুত্ব অপরিসীম।

বাংলাদেশ সময় বুধবার বিকাল ৩টা ৪৫ মিনিটে সুইডেনের স্টকহোম থেকে এ বছরের রসায়নে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্স। 

রসায়নে নোবেল কমিটির প্রধান হাইনার লিংকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, কীভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হোমোকাইরালিটির উদ্ভব হয়- তা শত বছর ধরে রহস্য হয়ে ছিল। অঁরি কাগান ও কেনসো সোআই সেই রাসায়নিক রহস্যের সমাধান করেছেন। তাঁদের উদ্ভাবিত রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলো অভাবনীয়।

অঁরি কাগান বর্তমানে ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি প্যারিস-সুদ-এর সঙ্গে যুক্ত আছেন। অন্যদিকে কেনসো সোআই টোকিও ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সে কাজ করছেন। ১৯০১ সালের পর থেকে ১১৭ বার রসায়নে নোবেল দেওয়া হয়েছে, পেয়েছেন ১৯৮ ব্যক্তি। দুইবার পেয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের ফ্রেডরিক স্যাঙ্গার ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যারি শার্পলেস। 

দুই বিজ্ঞানীর আবিষ্কারটির বিষয়ে নিজেদের ওয়েবসাইটে একটি ব্যাখ্যা প্রকাশ করেছে নোবেল কর্তৃপক্ষ।

রসায়নবিদদের প্রায়ই জীবের মৌলিক অণুগুলো নিয়ে বেশ কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়। ধরুন, আপনি একজন তালা-চাবি প্রস্তুতকারক। গ্রাহকের ফরমায়েশ অনুযায়ী চাবি বানান। সমস্যা হলো, একটি চাবির নকশা তৈরি ও সেটি কাঠামোতে রূপ দেওয়ার সময় একই রকম আরেকটি প্রতিবিম্ব বা রূপ তৈরি হয়। এটি হলো মিরর ইমেজ বা দর্পণ প্রতিবিম্ব।

দুই চাবির মধ্যে কেবল আসলটিই তালার ভেতর ঠিকভাবে বসবে। কিন্তু একইরকম নকশা হওয়ায় কোনটি আসল চাবি তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যায়। রসায়নবিদরা যখন নতুন ওষুধ তৈরি করেন, তখন তাদেরকে ঠিক একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়।

অনেক ওষুধের অণুর দুটি ভিন্ন রূপ থাকে। সেগুলো চাবি তৈরির মতোই মিরর ইমেজ সমস্যা তৈরি করে। ওষুধের দুই অণুর যেটি আসল বা মৌলিক সেটিই কেবল মানুষের রোগ সারায়। অন্যটি শরীরের ভেতর কোনো কাজে লাগে না এবং অনেক সময় ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

এই দুই অণুর বিষয়টি জীবের মৌলিক রসায়নের সঙ্গে যুক্ত। রসায়নবিদদের ভাষায় জীবন হলো ‘হোমোকাইরাল’। গ্রিক এই পরিভাষাটির অর্থ ‘একই রকম’ বা ‘হাত’। মানুষের দুই হাতের মতো সব অ্যামিনো অ্যাসিডেরও দুটি রূপ আছে। কীভাবে ‘হোমোকাইরালিটি’ উদ্ভব হয়, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করেছেন রসায়নবিদরা। নোবেলজয়ী দুই বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই ও হেনরি কাগান সেই জটিল ধাঁধার সমাধান বের করেছেন।

১৯৮৬ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী অঁরি কাগান দেখান, রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সামান্য একটি পার্থক্যকে অনেক বড় করা সম্ভব। অনুঘটকের দুই ধরনের অণুর অনুপাত সামান্য বদলালেও উৎপাদিত অণুর অনুপাত অনেক বেশি বদলে যেতে পারে। এই ঘটনাকে বলা হয় অরৈখিক প্রভাব।

এরপর জাপানি বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই খুঁজতে থাকলেন এমন একটি বিক্রিয়া, যেখানে তৈরি হওয়া অণুই আবার নিজের অণু তৈরিতে সাহায্য করবে। ১৯৯৫ সালে তিনি এমন একটি বিক্রিয়া পেলেন। শুরুতে এক ধরনের অণু অন্যটির চেয়ে মাত্র ২ শতাংশ বেশি ছিল। কিন্তু শেষে সেটিই ৮৭ শতাংশ হয়ে গেল।

সোয়াই এখানেও থামেননি। ২০০৩ সালে তিনি আরও চমকপ্রদ একটি বিক্রিয়া দেখালেন। শুরুতে কোনো কাইরাল অণু ছিল না। কিন্তু দৈবক্রমে একটি রূপ সামান্য বেশি তৈরি হওয়ার পর সেটিই নিজের তৈরিকে ত্বরান্বিত করতে লাগল। একসময় উৎপাদিত অণুর ৯৯.৯৯ শতাংশ পর্যন্ত একই রূপের হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, শুরুতে সামান্য এক পার্থক্য—তারপর সেই পার্থক্যই নিজেকে বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত প্রায় পুরো বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

এই আবিষ্কার জীবনের শুরু নিয়ে নতুন প্রশ্নের দরজা খুলে দিয়েছে। জীবনের আদিম রাসায়নেও কি এমন কোনো ছোট্ট পক্ষপাত কাজ করেছিল? এর উত্তর এখনো জানা নেই।

তবে কাগান ও সোআই দেখিয়েছেন, রাসায়নের জগতে সামান্য একটি পার্থক্যও সময়ের সঙ্গে বিশাল হয়ে উঠতে পারে।

আর এর ব্যবহার শুধু জীবনের রহস্য বোঝার মধ্যে বা রসায়নের বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ নয়। ওষুধ শিল্প থেকে শুরু করে নিত্যদিনের সুগন্ধি, প্রসাধন, কৃষি রাসায়নিক এবং আধুনিক ম্যাটেরিয়াল টেকনোলজি—সবক্ষেত্রেই উচ্চমানের বিশুদ্ধ অণু উৎপাদনে তাঁদের দেখানো নীতিগুলো দৈনন্দিন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার সাহিত্যে ও শুক্রবার শান্তিতে পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা হবে। অর্থনীতিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হবে ১৩ অক্টোবর।

পুরস্কারের অংশ হিসেবে একটি করে ডিপ্লোমা, স্বর্ণপদক এবং প্রায় ১২ লাখ ডলারের চেক দেওয়া হয়। কোনো বিভাগে একাধিক বিজয়ী থাকলে পুরস্কারের অর্থ ভাগাভাগি করে নেন।

শুরুতে নোবেল বিজয়ীদের প্রায় দেড় লাখ ক্রোনা দেওয়া হতো। বাড়তে বাড়তে ১৯৮১ সালে তা ১০ লাখ ক্রোনা হয়। এরপর পুরস্কারের আর্থিক মূল্য দ্রুত বাড়ানো হয়। ২০০১ সালে প্রথমবারের মতো এর পরিমাণ ১ কোটি ক্রোনা হয়।

সর্বশেষ এ বছরের জানুয়ারি মাসে বাড়ানো হয় নোবেল পুরস্কারের আর্থিক সম্মানী। এ বছরের নোবেল পুরস্কার বিজয়ীরা মোট ১ কোটি ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা (৯ লাখ ৮৬ হাজার ডলার) পাবেন, যা আগের চেয়ে ১০ লাখ ক্রোনা বেশি। নোবেল ফাউন্ডেশনের তহবিলের উন্নতি হওয়ায় এ বছর পুরস্কারের আর্থিক সম্মানী বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ফাউন্ডেশনের তহবিলে টান পড়ায় ২০১২ সালে পুরস্কারের অর্থমূল্য এক কোটি ক্রোনা থেকে কমিয়ে ৯০ লাখ করা হয়। এরপর ২০১৭ সালে তা বাড়িয়ে ৯০ লাখ এবং ২০২০ সালে ফের এক কোটিতে উন্নীত করা হয়।

গত এক দশকে ইউরোর বিপরীতে প্রায় ৩০ শতাংশ দর হারিয়েছে সুইডিশ ক্রোনা। ফলে পুরস্কারের অর্থমূল্য ১০ লাখ ক্রোনা বাড়ানো হলেও সুইডেনের বাইরে তা ততটা বাড়বে না।

২০১৩ সালে আর্থিক সম্মানী কমিয়ে ৮০ লাখ ক্রোনা করা হয়। তখনো যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রায় এই পুরস্কারের পরিমাণ দাঁড়াত ১২ লাখ ডলার। সেটা বেড়ে ১ কোটি ১০ লাখ ক্রোনা হলেও বিনিময় হারের খেলায় ২০২৪ সালে তার পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ লাখ ডলারের কম। মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় নিলে নোবেল পুরস্কারের আর্থিক মূল্যমান খুব একটা বাড়েনি।

বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ক্রোনার মূল্যমান দাঁড়ায় সাড়ে ১২ কোটি টাকার বেশি। 

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *