স্থিতিশীল অর্থনীতির মডেলের জন্য অর্থনীতিতে যৌথভাবে নোবেল

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎

চলতি বছর অর্থনীতিতে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট ই হল (Robert E. Hall) ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইকেল উডফোর্ড (Michael Woodford)।

সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় ব্যষ্টিক অর্থনীতির ভূমিকা নিয়ে গবেষণার করার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁরা এ পুরস্কার পেয়েছেন।

অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার কমিটির প্রধান জন হাসলার বলেন, পুরস্কার বিজয়ীদের কাজ একটি শক্তিশালী তাত্ত্বিক ভিত্তি এনে দিয়েছে। এর ওপর নির্ভর করে তৈরি মডেলগুলো এখন বিভিন্ন দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবহার করছে।

হাসলার আরও বলেন, জ্বালানি সংকট কিংবা মানুষের ভোগের ক্ষেত্রে হঠাৎ পরিবর্তন আসতে পারে। তখন এই মডেলগুলো দিয়ে অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সহজ হবে।

ব্যক্তিপর্যায়ের বা ব্যাষ্টিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত কীভাবে সামগ্রিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে এবং সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কীভাবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারে—এ বিষয়ে গবেষণা ও নতুন তত্ত্বের জন্য ২০২৬ সালে অর্থনীতি ক্যাটাগরিতে নোবেলের জন্য মনোনীতি করা হয়েছে এ দুই মার্কিন অর্থনীতিবিদ-অধ্যাপককে। সোমবার রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস এ ঘোষণা দিয়েছে।

‘সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ব্যাষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি’ (মাইক্রে-ইকোনমিক ফাউন্ডেশন অব মাক্রো-ইকোনমিক স্ট্যাবিলাইজেশন) শীর্ষক গবেষণায় বিশেষ অবদানের জন্য নোবেলজয়ী হিসেবে রবার্ট হল এবং মাইকেল উডফোর্ডের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।

“তাদের গবেষণা ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করেছে যে কীভাবে পরিবার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং কর্মীদের সিদ্ধান্তগুলো মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে; এর ফলে অর্থনীতিবিদরা এমন সব কৌশল বা হাতিয়ার পেয়েছেন যার মাধ্যমে বোঝা সম্ভব যে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কীভাবে অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলা করতে পারে”, বলা হয়েছে রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের ঘোষণায়।

তাদের কাজের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অর্থনীতির একটি মৌলিক বিষয়—কীভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষের ব্যক্তিগত আর্থিক সিদ্ধান্তগুলো সম্মিলিতভাবে পুরো অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে, তা বোঝা।

সামষ্টিক (ম্যাক্রো-ইকোনোমিক্স) অর্থনীতি মুদ্রাস্ফীতি, কর্মসংস্থান, সুদের হার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মতো বৃহৎ পরিসরের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে। অন্যদিকে, ব্যষ্টিক অর্থনীতি (মাইক্রো-ইকোনোমিক্স) ব্যক্তি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যয়, সঞ্চয়, কর্মী নিয়োগ এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার ওপর আলোকপাত করে।

এই দুটি ক্ষেত্রকে সংযুক্ত করার মাধ্যমে অর্থনীতিবিদরা আরও গভীরভাবে বুঝতে পারেন কেন অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেয়, কেন পণ্যের দাম বাড়ে এবং কীভাবে মুদ্রানীতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

তাদের কাজের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অর্থনীতির একটি মৌলিক বিষয়—কীভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষের ব্যক্তিগত আর্থিক সিদ্ধান্তগুলো সম্মিলিতভাবে পুরো অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে, তা বোঝা।

সামষ্টিক (ম্যাক্রো-ইকোনোমিক্স) অর্থনীতি মুদ্রাস্ফীতি, কর্মসংস্থান, সুদের হার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মতো বৃহৎ পরিসরের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে। অন্যদিকে, ব্যষ্টিক অর্থনীতি (মাইক্রো-ইকোনোমিক্স) ব্যক্তি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যয়, সঞ্চয়, কর্মী নিয়োগ এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার ওপর আলোকপাত করে।

এই দুটি ক্ষেত্রকে সংযুক্ত করার মাধ্যমে অর্থনীতিবিদরা আরও গভীরভাবে বুঝতে পারেন কেন অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেয়, কেন পণ্যের দাম বাড়ে এবং কীভাবে মুদ্রানীতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

১৯৪৩ সালে জন্মগ্রহণকারী রবার্ট ই হল স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এমেরিটাস অধ্যাপক এবং হুভার ইনস্টিটিউটের একজন সিনিয়র ফেলো। তার গবেষণার মূল বিষয়বস্তু ছিল কর্মসংস্থান, মুদ্রাস্ফীতি, ভোক্তাদের ব্যয় এবং অর্থনৈতিক উত্থান-পতন।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চক্র (ইকোনমিক সাইকেলস) পরিমাপের ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি ‘ন্যাশনাল ব্যুরো অফ ইকোনমিক রিসার্চ’-এর ‘বিজনেস সাইকেল ডেটিং কমিটি’-র চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন; এই কমিটিই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মন্দা ও প্রবৃদ্ধির পর্যায়গুলোর সময়কাল নির্ধারণ করে থাকে।

১৯৫৫ সালে জন্মগ্রহণকারী মাইকেল উডফোর্ড কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল ইকোনমি বা রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক এবং আধুনিক মুদ্রানীতি বিষয়ক অর্থনীতির অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব।

সুদের হার, মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যকার সম্পর্ক সম্পর্কে অর্থনীতিবিদদের ধারণাকে তার গবেষণা উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করেছে।

উডফোর্ড বিশেষ করে নয়া কেইনসীয় অর্থনীতিতে (নিউ কেইনসিয়ান ইকোনমিক্স)তার অবদানের জন্য পরিচিত; মুদ্রানীতি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই কাঠামোটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ২০০৩ সালে প্রকাশিত তার প্রভাবশালী বই ‘ইন্টারেস্ট অ্যান্ড প্রাইসেস: ফাউন্ডেশনস অফ আ থিওরি অফ মনিটারি পলিসি’ কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কীভাবে মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে স্থিতিশীল রাখতে পারে, তা বোঝার তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরিতে সহায়তা করেছে।

উডফোর্ডের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘প্রত্যাশা’ এবং যোগাযোগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক আচরণকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা।

উদাহরণস্বরূপ, যখন কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইঙ্গিত দেয় যে সুদের হার দীর্ঘ সময় ধরে কম থাকবে, তখন পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো নতুন নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণের আগেই তাদের ব্যয় ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে। ‘ফরোয়ার্ড গাইডেন্স’ নামে পরিচিত এই পদ্ধতিটি ২০০৮ সালের বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকটের পর মুদ্রানীতি প্রণয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়; সে সময় সুদের হার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করার উপায় খুঁজছিল।

একাডেমি কর্তৃক স্বীকৃত এই গবেষণায় অর্থনৈতিক নীতির মূল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে: যেমন—অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেকারত্ব না বাড়িয়ে কীভাবে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়, মন্দার সময় কীভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সহায়তা করা যায় এবং কীভাবে এমন নীতি প্রণয়ন করা যায় যা আর্থিক ও অর্থনৈতিক ধাক্কার তীব্রতা কমাতে পারে।

১৯৬৯ সালে অর্থনীতিতে প্রথম নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত অর্থনীতিতে নোবেলজয়ীদের অধিকাংশই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। মাত্র তিনজন নারী এ পর্যন্ত এ পুরস্কার পেয়েছেন। সবশেষ ২০২৩ সালে পুরস্কার পান ক্লডিয়া গোল্ডিন। যুক্তরাষ্ট্রে সময়ের সঙ্গে মজুরি ও কর্মসংস্থানে নারী-পুরুষের পার্থক্য কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে গবেষণার জন্য তাঁকে পুরস্কৃত করা হয়।

২০২৫ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনজন অর্থনীতিবিদ—জোয়েল মোকির, ফিলিপ আগিয়োঁ এবং পিটার হাউইট।

নোবেল পুরস্কারের অংশ হিসেবে একটি করে ডিপ্লোমা, স্বর্ণপদক এবং প্রায় ১২ লাখ ডলারের চেক দেওয়া হয়। কোনো বিভাগে একাধিক বিজয়ী থাকলে পুরস্কারের অর্থ ভাগাভাগি করে নেন।

শুরুতে নোবেল বিজয়ীদের প্রায় দেড় লাখ ক্রোনা দেওয়া হতো। বাড়তে বাড়তে ১৯৮১ সালে তা ১০ লাখ ক্রোনা হয়। এরপর পুরস্কারের আর্থিক মূল্য দ্রুত বাড়ানো হয়। ২০০১ সালে প্রথমবারের মতো এর পরিমাণ ১ কোটি ক্রোনা হয়।

সর্বশেষ এ বছরের জানুয়ারি মাসে বাড়ানো হয় নোবেল পুরস্কারের আর্থিক সম্মানী। এ বছরের নোবেল পুরস্কার বিজয়ীরা মোট ১ কোটি ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা (৯ লাখ ৮৬ হাজার ডলার) পাবেন, যা আগের চেয়ে ১০ লাখ ক্রোনা বেশি। নোবেল ফাউন্ডেশনের তহবিলের উন্নতি হওয়ায় এ বছর পুরস্কারের আর্থিক সম্মানী বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ফাউন্ডেশনের তহবিলে টান পড়ায় ২০১২ সালে পুরস্কারের অর্থমূল্য এক কোটি ক্রোনা থেকে কমিয়ে ৯০ লাখ করা হয়। এরপর ২০১৭ সালে তা বাড়িয়ে ৯০ লাখ এবং ২০২০ সালে ফের এক কোটিতে উন্নীত করা হয়।

গত এক দশকে ইউরোর বিপরীতে প্রায় ৩০ শতাংশ দর হারিয়েছে সুইডিশ ক্রোনা। ফলে পুরস্কারের অর্থমূল্য ১০ লাখ ক্রোনা বাড়ানো হলেও সুইডেনের বাইরে তা ততটা বাড়বে না।

২০১৩ সালে আর্থিক সম্মানী কমিয়ে ৮০ লাখ ক্রোনা করা হয়। তখনো যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রায় এই পুরস্কারের পরিমাণ দাঁড়াত ১২ লাখ ডলার। সেটা বেড়ে ১ কোটি ১০ লাখ ক্রোনা হলেও বিনিময় হারের খেলায় ২০২৪ সালে তার পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ লাখ ডলারের কম। মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় নিলে নোবেল পুরস্কারের আর্থিক মূল্যমান খুব একটা বাড়েনি।

বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ক্রোনার মূল্যমান দাঁড়ায় সাড়ে ১২ কোটি টাকার বেশি। 

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *