✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশি বন্দী রয়েছেন। দেশটিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে রায়ের অনুলিপি চেয়ে সৌদি সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ।
দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল এবং কী কারণে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য পায়নি ঢাকা।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদি আরবের রিয়াদে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় নিহত বাংলাদেশি কর্মী মো. শাহেদ আহম্মেদের মরদেহ গ্রহণ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে কথা বলেছে বাংলাদেশ। দেশটির সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে রায়ের অনুলিপি চাওয়া হয়েছে।সেটি পাওয়া গেলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
সৌদি সরকার বিভিন্ন সময়ে দণ্ডিত ও কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের তালিকা পাঠায় উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, ওই দুই বাংলাদেশির নাম তালিকায় রয়েছে কি না, তা যাচাই করছে সরকার।
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায় রয়েছে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে যাদের শিরশ্ছেদ করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ঘটনা ঘটেছিল ২০২৩ সালে। তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালন করেছে। পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে এবং বর্তমান সরকারের ছয় মাসের সময়কালেও এ বিষয়ে কোনো তথ্য জানানো হয়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শামা ওবায়েদ বলেন, ২০২৩ সালে ঘটনা ঘটে থাকলে তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব পালন করেছে এবং এখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। বর্তমান সরকার যখনই এ বিষয়ে কোনো তথ্য জানতে পারবে, তখনই বাংলাদেশি নাগরিকদের রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
তিনি বলেন, সৌদি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় সমস্যার সমাধান করতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়ে সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, প্রতিটি দেশের নিজস্ব বিচারব্যবস্থা রয়েছে। অন্য দেশের বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করা বাংলাদেশের উদ্দেশ্য নয়। তবে বিদেশে কোনো বাংলাদেশি দণ্ডিত হলে, বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা জরুরি। এ ধরনের ঘটনায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো একসঙ্গে কাজ করে। সাজা মওকুফের সুযোগ থাকলে কূটনৈতিক চ্যানেলে সে বিষয়েও আলোচনা করা হয়।
গত ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় নিহত হন বাংলাদেশি কর্মী মো. শাহেদ আহম্মেদ। শুক্রবার সকালে তার মরদেহ ঢাকায় পৌঁছায়। পরে মরদেহ ও সরকারের আর্থিক সহায়তা তার স্ত্রী কহিনুর আক্তার কাকলীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
শাহেদের বাড়ি বগুড়ার শাহজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামে। তার বাবা মো. রফিকুল ইসলাম এবং মা শাহেরা বেগম। তিনি সৌদি আরবের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জেদ্দা প্রকল্পে প্লাম্বার হিসেবে কাজ করতেন। ছুটি শেষে রিয়াদ হয়ে কর্মস্থলে ফেরার পথে বিমানবন্দরে অবস্থানকালে হামলার শিকার হন তিনি।
ওই হামলায় আরেক বাংলাদেশি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার বদরপুর গ্রামের মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরিও নিহত হন। হামলায় আহত হন আরও কয়েকজন বাংলাদেশি। তবে আহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রকাশিত তথ্যে পার্থক্য রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগের তথ্য অনুযায়ী, আহত হন ২৪ জন।
শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, সৌদি আরবে ৪০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কাজ করেন। ফলে দেশটিতে যুদ্ধ বা অন্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বাংলাদেশি কর্মীদের হতাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। গত ছয় মাসে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে নিহত ১১ বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। শাহেদ তাদের মধ্যে সর্বশেষ।
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, গত এক মাসে সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে শাহেদের মরদেহ দেশে এসেছে। অন্যদের মরদেহও দ্রুত ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে যেন আর কোনো বাংলাদেশিকে এভাবে প্রাণ হারাতে না হয়, সে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বাংলাদেশে আটকে পড়া প্রবাসী কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো ও নবায়নের বিষয়েও সৌদি আরবের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশন থেকে প্রবাসীরা যথাযথ সহায়তা পান না—এমন অভিযোগের বিষয়ে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, প্রতিটি মিশনে শ্রমকল্যাণ উইং রয়েছে। প্রবাসীরা সাধারণত এসব উইংয়ে অভিযোগ জানান এবং সেখানে প্রবাসীকল্যাণ বা শ্রম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কাজ করেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রবাসীদের সহায়তা করা মিশন ও সরকারের দায়িত্ব। কোনো মিশনের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ পাওয়া গেলে তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশন থেকে প্রবাসীরা যথাযথ সহায়তা পান না, এমন অভিযোগের বিষয়ে শামা ওবায়েদ ইসলাম এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, বিদেশে বাংলাদেশের প্রতিটি মিশনে শ্রমকল্যাণ উইং রয়েছে। প্রবাসী কর্মীরা সাধারণত সেখানে তাঁদের অভিযোগ জানান। এসব উইংয়ে প্রবাসীকল্যাণ বা শ্রম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কাজ করেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রবাসীদের সহায়তা করা মিশন ও সরকারের দায়িত্ব। কোথাও মিশনের গাফিলতি থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
