টুপটুপ রিসোর্টে আগুন: ১০ দিন পর স্কুলশিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার

✍︎ কক্সবাজার প্রতিনিধি ✍︎

কক্সবাজারের টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিখোঁজ স্কুলশিক্ষিকা নাসরিন আক্তার মুক্তার (২৭) মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার দিকে রিসোর্টটির ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহটি উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের সদস্যরা।

পুলিশ জানায়, ১০ জনের মরদেহের ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত হলেও নিখোঁজ স্কুলশিক্ষিকা নাসরিন আক্তার মুক্তার (২৭) ডিএনএ নমুনার সঙ্গে উদ্ধার হওয়া কোনো মরদেহের নমুনার মিল পাওয়া যায়নি। ফলে মঙ্গলবার সকাল থেকে নিখোঁজ মুক্তার সন্ধানে রিসোর্ট এলাকায় আবারও তল্লাশি শুরু করে পুলিশ।

নিহত নাসরিন আক্তার মুক্তা আশুলিয়ার ‘স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুল’-এর শিক্ষিকা ছিলেন। ঘটনার সময় তিনি দুই বান্ধবীকে নিয়ে রিসোর্টে ছিলেন। তাঁর বান্ধবীরা রিসোর্ট থেকে বের হতে পারলেও মুক্তার পারেননি।

এর আগে, মুক্তার স্বামী ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি বাদল হোসেন জানান, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত রিসোর্টটিতে ফয়সালের স্ত্রীসহ তিন বান্ধবী উঠেছিলেন ও সেখানে তারা অবস্থান করছিলেন। সকালে তার দুই বান্ধবী কক্ষ থেকে কিছু সময় আগেই বাইরে বের হয়েছিলেন। তবে ওই সময় কক্ষে থাকা নাসরিন আক্তার ভেতরে আটকা পড়েন। কিন্তু তারও কোনো হদিস মিলেনি এখনও। সোমবার পুলিশসহ প্রশাসনের অনেকের কাছে গেলেও বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিখোঁজ স্কুলশিক্ষিকা নাসরিন আকতার মুক্তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মরদেহটি কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।

উল্লেখ্য, গত ১৭ অক্টোবর সকালে উখিয়ার পাটুয়ারটেকে মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন তিনতলা টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আগুনের পর ঘটনাস্থল থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। শুরুতে নিখোঁজের তালিকায় ছিলেন ১১ জন। পরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে উদ্ধার হওয়া ১০ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। ডিএনএ পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকার শ্যামলী এলাকার একই পরিবারের মোহাম্মদ নাহিদুর রহমান (৪১), তার স্ত্রী আফসানা মতিন (৩৬) এবং তাদের দুই মেয়ে রোজাইনা ইনায়া (৯) ও মুনাইনা ইহানা (৬)।

এ ছাড়া ঢাকার বনশ্রী ও খিলগাঁও এলাকার আরেক পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের মধ্যে মৌলিহা মেহজাবিন আলভী (১৯), লায়লা জাহান নাবিলা (২৫), ইসরাত জাহান মালিহা (২৭), ফারিয়া কবির (৩৩), ফারিয়ার ছয় বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ ফাইজান নূর এবং ফারিয়ার ভাই মোহাম্মদ নাফিস তেহামী (২৪) রয়েছেন।

নাফিস তেহামি, যিনি ‘জেরিফ’ নামেও পরিচিত ছিলেন, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। মৌলিতা মেহজাবিন আলভি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে ‘পপুলেশন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ সায়েন্সেস’ বিষয়ে পড়াশোনা করতেন এবং লায়লা জাহান নাবিলা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি) পুড়ে যাওয়া মৃতদেহগুলোর ডিএনএ পরীক্ষা করে এবং আত্মীয়দের নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করেছে।

এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। মামলায় রিসোর্টের মালিক মোহাম্মদ তানভীর সুলতান মিয়াকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।

ঘটনার পর থেকেই তানভীর পলাতক রয়েছেন। রিসোর্টের আরেক মালিক নেওয়াজ মোর্শেদও আত্মগোপনে আছেন বলে জানা গেছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত কেবল সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ঘটনায় পর একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় লোকজনের দেওয়া তথ্য মতে, বিকট একটি বিস্ফোরণের শব্দের পর আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুনের সূত্রপাত হওয়ার পর রিসোর্টটিতে অবস্থান নেওয়া কয়েকজন পর্যটককে বের হতে দেখা যায়। এরপরই রিসোর্টটিতে থাকা অন্তত ৫ জন কর্মীকে ২টি কুকুর এবং ৪টি বিড়ালকে সঙ্গে নিয়ে বের হয়ে দ্রুত পালিয়ে যেতে দেখেছেন।

এ ঘটনায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহানকে প্রধান করে ৭ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এখনও তদন্ত প্রতিবেদনটি দাখিল করা হয়নি।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *