✍︎ কক্সবাজার প্রতিনিধি ✍︎
কক্সবাজারের উখিয়ায় টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির মালিক তানভীর সুলতান মিয়াকে প্রধান আসামি করে মামলা করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে তানভীর সুলতান মিয়া, তার ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়াজ মোরশেদ এবং প্রতিষ্ঠানটির রেস্টুরেন্ট ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনসহ ৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে অপর এক আসামির নাম প্রকাশ করেনি পুলিশ। তাদের মধ্যে মোহাম্মদ সুমনকে ঘটনার দিন সন্ধ্যায় গ্রেফতার করা হয়েছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান।
তিনি জানান, পুলিশ বাদী হয়ে মামলাটি রুজু করেছে এবং ইতোমধ্যে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে, অধিকতর তদন্তের পর বিস্তারিত বলা যাবে।
এর আগে শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে।
উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে বলে জানিয়েছেন ওসি আতিকুর রহমান। পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ডিএনএ টেস্টের পর লাশ হস্তান্তর
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় উদ্ধার হওয়া ১০টি মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার পর সেগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার।
তিনি বলেন, উদ্ধার হওয়া মরদেহ, নিখোঁজ ব্যক্তি ও পরিচয় শনাক্তের বিষয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে।পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। উদ্ধার করা মরদেহগুলো কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে।
কক্সবাজারে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার জন্য কক্সবাজারের বিভিন্ন হাসপাতালে নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনে ঢাকা থেকে সিআইডির বিশেষজ্ঞ দল এনে কক্সবাজারেই ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে।
অনিরাপদ ঘোষণার পরও চালু ছিল টুপটুপ রিসোর্ট
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, সকালে রিসোর্টটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। অল্প সময়ের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে কাঠের তৈরি ভবনের বিভিন্ন অংশে। রিসোর্টটির নিচতলায় রেস্তোরাঁ এবং ওপরের দুই তলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা আগুনের সময় কয়েকটি বিকট শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন। রিসোর্টের পাশে থাকা একটি কনফেকশনারি দোকানও অগ্নিকাণ্ডে আংশিক পুড়ে গেছে।
দোকানের মালিক স্থানীয় বাসিন্দা গিয়াসউদ্দিন জানান, ‘ঘুমে ছিলাম, স্ত্রী আগুনের খবর পেয়ে আমাকে ডেকে দিলে দৌড়ে এসে দেখি পাশের রিসোর্ট পুড়ছে। বড় ক্ষতি না হলেও আমার দোকানের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ রিসোর্টটিতে আগুন কীভাবে লেগেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান বলেন, প্রাথমিকভাবে রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র ছিল না
অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ জানিয়েছেন, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র ছিল না। গত জুনে পরিদর্শনের পর স্থাপনাটিকে অনিরাপদ উল্লেখ করে সতর্কতামূলক নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।
তিনি জানান, তিনতলা কাঠের ভবনটির নিচতলায় রেস্তোরাঁ এবং ওপরের দুই তলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ও অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের স্থাপনা পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ।
পলাতক মালিক
নিয়মের তোয়াক্কা না করে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) এর অনুমোদন ছাড়াই দুই বছর ধরে রিসোর্ট পরিচালনা করে আসছিলেন মালিক চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর বাসিন্দা তানভীর আহমেদ। ঘটনার পর থেকেই তিনি পলাতক রয়েছেন এবং তার প্রতিষ্ঠান থেকেও দুর্ঘটনার পর আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
কউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার জসিম উদ্দিন জানান, প্রতিষ্ঠানটির কোনো বৈধ অনুমোদন ছিল না। এ ব্যাপারে নোটিশ দেওয়া হলেও মালিক কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটি না সরিয়ে অবৈধভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল।
তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি
অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান জানান, তদন্তে আগুনের সূত্রপাত, প্রাণহানির কারণ, রিসোর্টের অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা এবং জরুরি অবস্থায় পর্যটকদের বের হওয়ার সুযোগ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
