তাহসিফ হত্যা মামলায় গ্রেফতার দীপ ৪ দিনের রিমান্ডে

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলায় গ্রেফতার আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। 

শনিবার (৩১ অক্টোবর) বিকেলে শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস এ আদেশ দেন। 

এদিন দুপুর সোয়া ২টার দিকে দীপকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে নৌ পুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন তাকে সাত দিনের রিমান্ডে চেয়ে আবেদন করেন।

আবেদনে বলা হয়, নিহত কে এম তাহসিফ সাউরি বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি তুরাগ থানার ১৮ নম্বর সেক্টরের একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। গত ২৭ অক্টোবর আনুমানিক সন্ধ্যা ৬টায় আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ তাকে ডেকে বাইরে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। 

পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টায় জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এর মাধ্যমে পুলিশ জানতে পারে, উত্তরখান থানাধীন রাজাবাড়ী ঘাট সংলগ্ন তুরাগ নদীতে একটি অজ্ঞাত মরদেহ ভাসছে। পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে সুরতহাল করার সময় নিহতের ট্রাউজারের পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে তার পরিচয় শনাক্ত করে।

পরে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, ঘটনার দিন নিহত সাউরিকে নিয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানাধীন মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিল আসামি দীপ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দীপ স্বীকার করে যে, নিহত সাউরি তার সিনিয়র বড় ভাই ছিলেন। 

প্রাথমিক তদন্তে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আসামি দীপের সরাসরি জড়িত থাকার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। মামলার তদন্তের স্বার্থে এবং আসামি

যেসব কারণে রিমান্ড চাওয়া হয়

১. হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল রহস্য ও মোটিভ (কারণ) উদ্ঘাটন করার জন্য।

২. এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অজ্ঞাতনামা অন্যান্য আসামিদের শনাক্ত ও তাদের গ্রেপ্তার করার জন্য।

৩. হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ও মামলার প্রয়োজনীয় অন্যান্য আলামত উদ্ধার করার জন্য।

৪. নিহত সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির ব্যবহৃত ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করার লক্ষ্যে।
 
৫. হত্যাকাণ্ডের মূল স্থান বা এটি কোথায় সংঘটিত হয়েছিল, তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার জন্য।

শুনানিকালে তাকে এজলাসে তোলা হয়। রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুল হক দিদার রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। পরে আদালত তার রিমান্ডের এ আদেশ দেন।

গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় জুনিয়র বন্ধু দীপের ডাকে বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন তাহসিফ। পরদিন বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। 

তাহসিফ সাউরির বাসার সিটিসিভি ফুটেজ ও তার পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর জুনিয়র বন্ধু দীপের ফোনেই সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটের দিকে বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। এরপর দীর্ঘক্ষণ নিজের মোটরসাইকেল স্টার্ট দেয়ার চেষ্টা করেন। ওই মোটরসাইকেল নিয়েই দীপের সঙ্গে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক করবী-১৪ ভবনের কম্পাউন্ড ছাড়েন দু’জনে। আরেক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ৮টা ৫৪ মিনিটের দিকে উত্তরার কুকরুকু রেস্টুরেন্টে বসে দীপকে নিয়ে খাবার খাচ্ছেন তাহসিফ। সেখানে বসেই নিজের বান্ধবী তাবাসসুমকে ফোন করে দেখা করার কথা বলেন তিনি। কুকরুকু রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার পর তাবাসসুমের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। এরপর আরেক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ১০টা ১৭ মিনিটের দিকে বান্ধবীকে নিজের মোটরসাইকেলের পেছনে বসিয়ে সোনারগাঁ জনপথের পাশের ‘নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে’র সামনে আসেন তাহসিফ। তখনও তাদের সঙ্গে আলাদা মোটরসাইকেলে ছিলেন দীপ।

এরপর ভবনের সামনের রাস্তায় দুইটি মোটরসাইকেল পার্ক করে প্রথমে তাহসিফ তার বান্ধবীকে নিয়ে ভবনের লিফটের সামনে যান। ওই সময় মোটরসাইকেল থেকে নেমে দীপ ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাকা একজনের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের পাশে কালো টি-শার্ট ও কালো প্যান্ট পরা আরও একজন যুবক দাঁড়িয়ে ছিলেন। ওই সময়ে দীপের আসতে সময় লাগছে দেখে লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তাহসিফ সামনের দিকে এগিয়ে আসেন। তাহসিফকে দেখে প্রথম লোকটিকে রাস্তার পাশে রেখেই কালো টি-শার্ট পরা লোকটিকে সঙ্গে নিয়ে দীপ ভবনের সিঁড়ি দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপর তাহসিফ, তার বান্ধবী ও দীপ তিনজনে লিফটে চেপে নেস্ট বারে প্রবেশ করেন। আর কালো টি-শার্ট পরা লোকটি লিফটির সামনে অপেক্ষায় থাকেন।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, লিফটে প্রবেশের সময়ে তাহসিফ ও তার বান্ধবীর মুখে কিছু না থাকলেও দীপ হেলমেট পরে তার মুখ ঢেকে বারে প্রবেশ করেন। ঘণ্টাখানেকেরও বেশি সময় বারে থাকার পর ঠিক রাত ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে তারা বার থেকে বের হন। ওই সময়েও তাহসিফ ও তার বান্ধবী মোটরসাইকেলে ওঠে দীপের জন্য নিচে অপেক্ষা করতে থাকেন। পরে তিনজনে মোটরসাইকেলে চেপে উল্টো রাস্তা দিয়ে সামনে চলে যান। ওই নেস্ট বার থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরের টঙ্গী মাজার বস্তির রাস্তার একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ঠিক ১২টা ১৭ সেকেন্ডের দিকে তিনটি মোটরসাইকেলে দীপসহ মোট ৬ জন মাজার বস্তির দিকে প্রবেশ করছেন। আর তাদের পেছন পেছন আসা চার নম্বর মোটরসাইকেলটি ঘুরিয়ে উল্টো দিকে চলে যায়।

এর ঠিক ৩৯ মিনিট পর ১২টা ৩৯ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডে ওই একই রাস্তা দিয়ে তাহসিফ একা মোটরসাইকেল চালিয়ে মাজার বস্তিতে প্রবেশ করেন। এরপর আরেক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, মাজার গেটের সামনে দিয়ে রাত ১টার দিকে সামনের সারিতে তাহসিফ এক যুবকের সঙ্গে আর ঠিক তার পেছনে দীপ আরও তিন যুবকের সঙ্গে হেঁটে তুরাগ পাড়ের মাঠে প্রবেশ করছেন। ওই সময়ে রাস্তার পাশের দোকান থেকে বের হয়ে রাস্তা দিয়ে যাওয়া দুই যুবককে ডাক দিয়ে তাহসিফ বলেন- ভাই কেমন আছো? কথা বলা ওই দুই যুবকও তখন তাদের সঙ্গে যোগ দেন। তখন তারা মোট ৭ জন ওই তুরাগ তীরের মাঠে প্রবেশ করেন। আরেক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে হাতে হেলমেট নিয়ে মাঠ থেকে বের হয়ে রাস্তা দিয়ে একা হেঁটে আসছেন দীপ। তার কোমরে কালো রংয়ের একটা ব্যাগ।

দীপ কিছু দূর এগিয়ে যাওয়ার পর পাশের রাস্তা থেকে দীপের পেছন পেছন একটা সিএনজি অটোরিকশা আসতে দেখা যায়। ওই সিএনজি অটোরিকশার পেছন পেছন ওই একই রাস্তা দিয়ে দীপের পেছনে আরও দুই যুবক আসে। আর তাদের পেছনে ছিলেন এক নারী। এরপর মাজার বস্তির মোড়ের ওই একই সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, রাত ১টা ২৯ মিনিটের দিকে দীপ ওই রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছেন। আর দ্বীপের পেছন পেছন আসা মোট তিনজন যুবক ও দুইজন নারী রাস্তার মোড়ের উপর দাঁড়িয়ে। তাদের কেউ ফোন করে কথা বলছে। বারবার তারা মাঠের দিকে তাকিয়ে নিজেদের মধ্যে কিছু বলাবলি করছিল আর ফোন ঘাঁটছিল। সিসিটিভি ফুটেজে এতটুকু বোঝা যায়, সেখানে কিছু একটা ঘটেছে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *