✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরি নিখোঁজ হওয়ার আগে তার সঙ্গে প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় কাটিয়েছেন কনিষ্ঠ বন্ধু দ্বীপ।
গত ২৭ অক্টোবর (মঙ্গলবার) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তাহসিফের বাসায় যান তিনি। রাত ১২টার কিছু আগে-পরে ওই বাসার নিচ থেকে তারা একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নেন। এই সময়ের মধ্যে দুজনে মিলে মোটরসাইকেল মেরামত করান এবং একটি রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খান।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে এসব কথা জানান দ্বীপ। তিনি বলেন, ‘তাহসিফ ভাই বয়সে আমার চেয়ে ২-৩ বছরের বড় হলেও আমরা দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দুজনের মোটরসাইকেলের মডেল একই। বাইকে সমস্যা দেখা দেওয়ায় কীভাবে ঠিক করা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ নিতে আমাকে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প এলাকার বাসায় ডেকেছিলেন। আমি গিয়ে তাকে বিষয়টি দেখিয়ে বুঝিয়ে দিই।’
তিনি জানান, বাসা থেকে বের হওয়ার আগে দুজনে একটি ওয়ার্কশপে গিয়ে মোটরসাইকেল ঠিক করেন। এরপর এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার শেষ করে তাহসিফকে আবার তার বাসার নিচে রেখে দ্বীপ নিজের বাসা মোহাম্মদপুরের উদ্দেশে রওনা হন।
যদিও তাহসিফের বাবা আজ দুপুরে সাংবাদিকদের বলেছেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দ্বীপের সঙ্গে দেখা করতে বের হওয়ার পর আর বাসায় ফেরেননি তাহসিফ।
মঙ্গলবার রাত ১২টা পর্যন্ত একসঙ্গে থাকার কথা জানালেও তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে তার কাছে বিশেষ কোনো তথ্য নেই বলে দাবি করেন দ্বীপ। তিনি তাহসিফের ময়নাতদন্তের সময় হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বাসা থেকে বের হওয়ার আগে ভবনের নিচের গ্যারেজে এক ব্যক্তির সঙ্গে হাত মেলান তাহসিফ। এরপর তারা পৃথক দুটি মোটরসাইকেলে করে সেখান থেকে বেরিয়ে যান। নিহতের পরিবার ওই ব্যক্তিকে দ্বীপ হিসেবে শনাক্ত করেছে। পরিবারের দাবি, দ্বীপের ডাকেই সেদিন বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ।
ছেলেকে হত্যার সন্দেহ বাবার
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম সন্দেহ করছেন তাহসিফকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ঘটনার দিন তাহসিফ সারাদিন তার মায়ের সঙ্গে ছিলেন এবং মা-বাবার জন্য কেনাকাটা করেছেন। সন্ধ্যার দিকে দ্বীপ তাঁকে ডাকতে এলে মাকে বলে নিচে যান তাহসিফ। এরপর বারবার ফোন করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। পরে রাত ১টার পর তাহসিফ মাকে বার্তা দিয়ে জানান যে তিনি বাসায় ফিরছেন। কিন্তু এরপর আর তার খোঁজ পাওয়া যায়নি।
ছেলের কোনো শত্রু ছিল না জানিয়ে তিনি বলেন, তাহসিফ অত্যন্ত ভদ্র ও সামাজিক ছিলেন। বিমানবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়ার কারণে কিছুটা খারাপ লাগা থাকলেও তা নিয়ে বড় সমস্যা ছিল না। বিমানবাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার হতে তাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছিল, তিনি উড্ডয়নেও দক্ষ ছিলেন। তাই তাঁ পক্ষে আত্মহত্যা করা সম্ভব নয় বলে বিশ্বাস বাবার। মামলার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, দাফন ও জানাজার কাজ শেষ করার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এছাড়া রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, ওই এলাকায় তাহসিফ কখনো যেতেন না, সেখানে কীভাবে মরদেহ গেল তা বোধগম্য নয়।
প্রাণ সংশয়ের আশঙ্কা করেছিলেন তাহসিফ সাউরি
প্রাণ সংশয়ের আশঙ্কা করেছিলেন কে এম তাহসিফ সাউরি; সেকথা এক প্রতিবেশীকে বলেছিলেন তিনি।
বিমানবাহিনীর সাবেক এই ফ্লাইট লেফটেন্যান্টের মরদেহ উদ্ধারের পরদিন নানা আলোচনার মধ্যে আজ বৃহস্পতিবার এই তথ্য প্রকাশ করলেন তার প্রতিবেশী সৈয়দ গোলাম মাহমুদ নামে এক ব্যক্তি।
ঢাকার উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরে একটি ফ্ল্যাটে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন তাহসিফ। বৃহস্পতিবার বিকালে ১৮ নম্বর সেক্টরের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তার জানাজার পর কথা হয় মধ্যবয়সী গোলাম মাহমুদের।
তিনি বলেন, তাহসিফ আতঙ্কিত অবস্থায় ছিলেন এবং এ বছরের শুরুতে নির্বাচনের আগে একদিন ঘণ্টাখানেকের আলাপে জীবন বিপন্ন অবস্থায় থাকার কথা বলেছিলেন।
কী বলেছিলেন- জানতে চাইলে গোলাম মাহমুদ বলেন, ‘তাহসিফ বলেছিল- আই অ্যাম ইন এ গান পয়েন্ট (আই অ্যাম অ্যাট গান পয়েন্ট)। ভেরি ডেঞ্জার পয়েন্টের মধ্যে আমি আছি।’
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পলায়নের ভিডিওর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতায় নাম এসেছিল তাহসিফের। এরপর বিমানবাহিনী থেকে অবসর নিতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। তবে তার দাবি, ওই ভিডিওর সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা ছিল না।
তাহসিফ গত জুলাই মাসে দ্য রশিদ শো নামের এক পডকাস্টে অংশ নিয়ে বলেছিলেন, কোনো ধরনের হেনস্তার শিকার হবেন না, এই শর্তে বিমানবাহিনী ছাড়তে রাজি হয়েছিলেন তিনি। তবে তারপরও তাকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছিল।
তাহসিফকে ‘স্মার্ট’ এক যুবক হিসেবেই দেখতেন গোলাম মাহমুদ। প্রতিবেশী অন্যরাও একই চোখে দেখত তাকে।
তাহসিফদের ভবনের পাশের ভবনের বাসিন্দা একজন বলেন, ‘তাহসিফ খুবই নম্র-ভদ্র ছিল, বন্ধুসুলভ ছিল, সবার সাথেই মিশত। আমার ছোট ছেলের সাথে ফুটবল খেলত।’
জানাজা শেষে উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে যখন তাহসিফকে দাফন করা হয়, তখন স্থানীয়দের মধ্যে ছিল স্বজন হারানোর শোক।
জানাজায় অংশ নেওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টির কার্যনির্বাহী সদস্য ফরহাদ সোহেল বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে কারা আছে? রাষ্ট্রীয় কোনো হাত আছে, নাকি ভারতের ‘র’-এর কোনো হাত আছে? এই জিনিসগুলো অবশ্যই জনগণের সামনে আনা উচিত।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে বিমানে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি ছিল বিশ্ব জুড়ে আলোচিত। তবে ওই ঘটনার কেবল একটি ভিডিও পাওয়া যায়, যেখানে তাকে একটি হেলিকপ্টারে চড়তে দেখা যাচ্ছিল। ওই হেলিকপ্টারে করে কুর্মিটোলায় যাওয়ার পর সামরিক বাহিনীর একটি বিমানে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাকে।
এ বছরের ২১ জুলাই প্রচারিত পডকাস্টে তাহসিফ এসবকে অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, ‘আমি জানি না, তাদের উদ্দেশ্য কী? প্রতিবেদনে ক্লিয়ারলি লিখেছে যে, আমি ভিডিওটা ছড়িয়েছি। আমি যে শুট করেছি, এটাও কিন্তু তারা বলেনি। বলেছে, যে … ভিডিওটি করেছে এবং আমি ভিডিওটি নাকি ছড়িয়ে দিয়েছি।
‘আমি যদি ভিডিওটা করেও থাকি বা ছড়িয়েও থাকি, হোয়াট ইজ দা প্রুফ দে হ্যাভিং—আমি এটা জিজ্ঞেস করতে চাই। আর এটাও হতে পারে যে, এজন্যই আমি আজকে হয়তো এয়ারফোর্সে নেই।’
নৌ-পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ৯৯৯-এ কল পেয়ে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে ভাসমান মরদেহটি উদ্ধার করেন। উদ্ধারের সময় পরনে ছিল সাদা পাজামা ও কালো জামা। হাতঘড়ি ও পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
এর আগে তাহসিফের বাবা তুরাগ থানায় খোঁজ নিলে পুলিশ প্রথমে তথ্য দিতে পারেনি, পরে বিকেল সোয়া ৫টার দিকে ফোন করে মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করে। বৃহস্পতিবার সকালে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মুস্তাফিজুর রহমান সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন এবং নিহতের খালাতো ভাই জহির হাসান মরদেহ শনাক্ত করেন। সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়, তাহসিফের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে তার নাক দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল এবং পেট ফোলা ছিল। বুক, পিঠ ও দুই পা স্বাভাবিক ছিল।
বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটার দিকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর বিকেলে স্বজনরা মরদেহ নিয়ে উত্তরার উদ্দেশে রওনা হন। বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জানাজা শেষে ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাহসিফ সৌরিকে দাফন করা হয়। দাফনের সময় স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
