✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের গুলশানের দুটি ফ্ল্যাটে আদালতের নির্দেশে মালামালের তালিকা (ইনভেনটরি) করতে গিয়ে একের পর এক বিলাসবহুল সামগ্রীর সন্ধান পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে চারটি রোলেক্স ঘড়ি, যার একটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২১ লাখ টাকা। প্রাথমিক হিসাবে চারটি ঘড়ির সম্মিলিত মূল্য এক কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে।
অভিযানে ফ্ল্যাট থেকে ৩০০টির বেশি কোট, ৫৩২টির বেশি টাই, ৮টি ঘড়ির বক্স (এর মধ্যে রোলেক্সের ৪টি), ৩ সেট মুক্তার (পার্ল) গয়না, ৪টি ঝাড়বাতি, একটি বেড, একটি সোফা এবং প্রায় ১০০টি কামিজ উদ্ধার করা হয়েছে বলে দুদক জানিয়েছে।
রোববার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে গুলশান-২-এর ৬৬ নম্বর সড়কের একই ভবনে থাকা এ-৭ ও বি-৭ নম্বরের দুটি ফ্ল্যাটে ইনভেনটরির কাজ শুরু হয়। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, স্থানীয় পুলিশ ও দুদকের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তালাবদ্ধ ফ্ল্যাট খুলে ভেতরের মালামাল, আসবাব, নথিপত্র ও মূল্যবান সামগ্রীর তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
দুদকের উপপরিচালক মো. মশিউর রহমান বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ফ্ল্যাট দুটি রিসিভারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া ও ভেতরে থাকা সব সম্পদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। আগামীকাল সোমবারও এ কার্যক্রম চলবে। এরপর আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বিস্তারিত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হবে।
ইনভেনটরির সময় উদ্ধার হওয়া চারটি রোলেক্স ঘড়ির মধ্যে একটি ‘Rolex Cellini Date’ মডেলের। ১৮ ক্যারেট হোয়াইট গোল্ডের তৈরি এই ঘড়ির ওয়ারেন্টি কার্ডও পাওয়া গেছে। সেখানে উল্লেখ রয়েছে, ২০১৯ সালের ২৪ জানুয়ারি লন্ডনের বিখ্যাত ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ‘Harrods’ থেকে এটি কেনা হয়েছিল। কার্ডে মালিক হিসেবে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর নাম, মডেল নম্বর ও সিরিয়াল নম্বরও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক ঘড়ির বাজারে একই মডেলের ব্যবহৃত ঘড়ির দাম ১৩ থেকে ১৭ হাজার মার্কিন ডলারের মধ্যে। নতুন অবস্থায় এর মূল্য প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ ডলার। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় এর দাম প্রায় ২১ লাখ টাকা।
দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘড়ির পাশাপাশি আরও বিপুল পরিমাণ বিলাসবহুল সামগ্রীর তালিকা করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ৫৩২টি টাই, প্রায় ৩০০টি কোট, শতাধিক কামিজ ও বিভিন্ন মূল্যবান ব্যবহার্য সামগ্রীর তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া মার্সিডিজ বেঞ্জসহ আটটি বিলাসবহুল গাড়ির চাবিও উদ্ধার হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, ফ্ল্যাট থেকে কিছু মূল্যবান সামগ্রী আগেই সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তা যাচাই করতে উদ্ধার হওয়া আলামত ও নথিপত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দুদক সূত্র জানায়, গুলশানের প্রায় সাড়ে সাত হাজার বর্গফুট আয়তনের দুটি ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য প্রায় ১৮ কোটি টাকা। আদালতের আদেশে ফ্ল্যাট দুটি ক্রোক হওয়ার পর এর তত্ত্বাবধান ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটকে। ইনভেনটরি শেষ হলে ফ্ল্যাট দুটি আনুষ্ঠানিকভাবে রিসিভারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
এর আগে ২ জুলাই দুদকের পরিচালককে (সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট) রিসিভার নিয়োগ দিয়ে আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই আদেশের ধারাবাহিকতায় আজ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ফ্ল্যাট দুটি খুলে এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার ও বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। পরে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করা হয়।
গত ২ জুলাই দুদক উপ-পরিচালক মশিউর রহমানের সই করা চিঠির সূত্রে জানা যায়, আদালতের আদেশে আজ সাইফুজ্জামানের গুলশানের ২টি ফ্ল্যাটের সঠিক নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা, তদারকি এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিয়ন্ত্রণে নেবে দুদক।
ওই চিঠিতে বলা হয়, সাবেক ভূমিমন্ত্রী এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নামীয় সম্পদ ঢাকার গুলশানস্থ রোড নং-৬৬, ব্লক-নর্থওয়েস্ট (বি), প্লট নং-১১, ফ্ল্যাট নং-এ-৭, আয়তন ৩৭৪৭ বর্গফুট এবং (২) ঢাকার গুলশানস্থ রোড নং-৬৬, ব্লক-নর্থওয়েস্ট (বি), প্লট নং-১১, ফ্ল্যাট নং-বি-৭, আয়তন-৩৮৩২ বর্গফুট বিশিষ্ট ফ্ল্যাট ২টির সঠিক নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা, তদারকি এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রিসিভার হিসেবে দুদক পরিচালককে (সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট) নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে।
ফ্ল্যাটে রিসিভারের প্রবেশ এবং মালামালের ইনভেন্টরি করার সময় দায়িত্ব পালনের জন্য গুলশান রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নিলয় রহমানকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে ২৬ ফেব্রুয়ারি সাইফুজ্জামান চৌধুরীর (জাবেদ) নামে যুক্তরাজ্যে থাকা ৫১৮টি ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট ক্রোকের নির্দেশ দেন আদালত। আর ১৩ জানুয়ারি সাইফুজ্জামানের আরব আমিরাতসহ আট দেশে থাকা বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে তার নামে থাকা দুটি কোম্পানিতে করা বিনিয়োগ অবরুদ্ধেরও আদেশ দেওয়া হয়েছে। এসব সম্পদ ও বিনিয়োগের মোট পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৩২০ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং ২০১৯ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত একই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
গত ২০২৪ সালের ৮ জুলাই আদালতের আদেশে গুলশান এলাকায় পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের জব্দ হওয়া চারটি ফ্ল্যাটের তালা খুলে ফ্ল্যাটগুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে দুদক। এবার নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হলো সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের দশটি ফ্ল্যাট।
