✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
মডেল ও অভিনেত্রী স্নিগ্ধা চৌধুরীকে বিয়ের জন্য চাপ দিয়ে ব্যর্থ হয়ে টানা দু’ঘণ্টা নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে।
এ সময় অভিনেত্রী স্নিগ্ধা চৌধুরীর সঙ্গে থাকা মডেল কো-অর্ডিনেটর ইমনকেও শারীরিক নির্যাতন ও তার পায়ের নখ তুলে ফেলার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
এই নায়িকার অভিযোগ, তাকে গত ২৪ জুলাই (শুক্রবার) রাত ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত টানা দু’ঘন্টা হাত ও পা বেঁধে পেটানো, কুসুম গরম কফি গায়ে ঢেলে দেওয়া, অশ্রাব্য ভাষায় গালমন্দ ও সব শেষে কফিতে নেশাজাত/বিষাক্ত দ্রবণ মিশিয়ে পান করিয়েছেন ভূমি দস্যূতায় অভিযুক্ত আশিয়ান গ্রুপের আলোচিত ব্যবসায়ী নজরুল। তিনি এসময় আরও দাবি করেন, তার সঙ্গে থাকা মডেল কো-অর্ডিনেটর ইমনকেও নির্যাতন করেন নজরুলের অনুচররা। তুলে ফেলে পায়ের নখ।
ঘটনার বর্ণানা দিতে গিয়ে স্নিগ্ধা চৌধুরী বলেন, বছর খানেক আগের পরিচিত ইমন নামের একজন কো-অর্ডিনেটরের ফোনের মাধ্যমে এক বছরের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন চিত্রের মডেল হওয়ার অফার করা হয় তাকে। এ সময় ইমন জানায়, ২০ লাখ টাকার এই কাজে সে স্নিগ্ধা চৌধুরীকে দেবে ১৭ লাখ। তবে ডিল ফাইনাল বা চুক্তি করতে যেতে হবে সেই কোম্পানিতে।
এ কথার সূত্র ধরে স্নিগ্ধা চৌধুরীকে নিয়ে ২৪ জুলাই রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ স্নিগ্ধা চৌধুরীর বুকিং করা উবারে চড়ে রাজধানীর ৩০০ ফিটের পাশের আশিয়ান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছান তারা। স্নিগ্ধা চৌধুরী জানান, পৌঁছেই খটকা লাগে তার। তিনি ইমনকে প্রশ্ন করেন, ‘করিডরে ফিংগার প্রিন্ট কেন?’ জবাবে ইমন জানায়, ‘যেহেতু মালিক ভেতরে; তাই হয়তো বাড়তি নিরাপত্তা।’ ভেতরে ঢোকার পর দেখা মেলে সেখানে বসে আছেন আশিয়ান গ্রুপ ও আশিয়ান ল্যান্ডস ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া। আশপাশে আছেন তার বিশ্বস্ত অনুচর পলাশ, পিএস মিয়ামিসহ বেশ কয়েকজন।
শুরুতেই সামান্য আলাপচারিতার মাঝেই আসে চা, নাস্তা, কফি, খেজুর বিস্কুট- বলছিলেন ইশরাত। এরপর হঠাৎ করেই নজরুল হুঙ্কার দিয়ে উঠেন। ইসরাতকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘তোরে কত বছর ধইরা খুঁজতাছি। আমি তোরে দুই বার বিয়া করছি। তোর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া না?’ স্নিগ্ধা চৌধুরীর দাবি, আশিয়ানের চেয়ারম্যান তাকে জেবা তাকিয়া উল্লেখ করে বলেন, ‘ফকিন্নি, তুই আমার কোটি কোটি টাকা খাইছস। এই ইমনরে লইয়া তোর মিরপুরের বাড়ির লাইগগা ৩০ লাখ টেকা দিয়া পর্দা কিনা দিসি।’ জবাবে স্নিগ্ধা জানান, তার বাড়ি উত্তরবঙ্গে।
এ সময় নজরুল আবার বলেন, ‘তুই আমার লগে ফাউল করছস। কতদিন কত জাইগা থোন তোরে আমি ধইরা আনসি। তুই আমার থেইকা টেকা লইয়া তোর বিদেশে থাকা নাগররে দিছত। তোর আমারে আবার বিয়া করতে হইব।’ এই কথা বলেই ব্ল্যাঙ্ক স্ট্যাম্প সামনে ফেলেন নজরুল। হাতে তুলে নেন তলোয়ার সদৃশ্য ধারাল অস্ত্র। মুহূর্তে পালটে যায় স্নিগ্ধা চৌধুরীর চেনা জগৎ। সোশ্যাল মিডিয়ার সিনেমাটিক চরিত্র এপস্টেইন চরিত্র যেন তারই সামনে উপস্থিত। নিজের আতঙ্কিত মুহূর্তের কথা এভাবেই ব্যক্ত করেন তিনি।
স্নিগ্ধা চৌধুরী বলেন, ‘এ সময় আমি কি করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমি যতবারই বলছিলাম আমি তাকিয়া না, ততবারই ক্ষেপে যাচ্ছিলেন নজরুল। আমার সঙ্গে থাকা ইমন ইশারায় আমাকে তাকিয়ার অভিনয় করতে বলেন। সাদা দলিলে সই করে টিভিসির চুক্তির টাকা নিয়ে বেরিয়ে যেতে বলেন। এমন পরিস্থিতিতে আমি বাধ্য হয়েই অন্য একটা ভুয়া নাম সই করে দেই বাঁচার জন্য।’
তবে সই করেও শেষ রক্ষা হয়নি। নজরুল এ সময় বাসর রাত করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন- দাবি ভুক্তভোগি স্নিগ্ধা চৌধুরী। রুম থেকে সবাইকে বের করে দিয়ে স্নিগ্ধা চৌধুরীকে বেড টাইপ সোফায় গিয়ে বসতে তলোয়ার উচিয়ে নির্দেশ দেন নজরুল। তাকে তলোয়ার উঁচিয়ে হত্যার হুমকি দিয়ে বাধ্য করে সোফায় বসতে। এরপর রশি বের করে বলেন, ‘রশি দেখছস? এটা দিয়ে ফাঁসি দেয়। বহু বড় বড় লোককে এটা দিয়ে ফাঁসি দিসি।’ বলেই স্নিগ্ধা চৌধুরীর আইফোন নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। এ সময় মোটা রশি দিয়ে প্রথমে স্নিগ্ধা চৌধুরীর পা বাঁধে নজরুল। রশি শক্ত করে বাধায় ইসরাত নজরুলকে বলেন, ‘আমার রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।’ এতে আবারও উত্তেজিত হয়ে ইসরাতের ডান গালে চড় কষান নজরুল। সোফায় চেপে ধরে বেঁধে ফেলেন হাত। ওপরে উঠে চেপে ধরেন গলা। সোফায় শোয়া অবস্থায় সে দুটো লাঠি নিয়ে আসেন, স্নিগ্ধা চৌধুরীর দু পায়ের পাতায় মোটা লাঠি দিয়ে লাগাতার মোট ১৪ বার আঘাত করেন তিনি। চুল ধরে বসিয়ে ঘাড়ের স্পাইনাল কর্ডের ওপরের অংশে ৫ থেকে ৭ বার সজোরে আঘাত করে বলে দাবি ইশরাতের। আঘাত করা হয় উঁরু, পিঠ, হাতসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে।
নির্যাতনের এ পর্যায়ে উপস্থিত হন নজরুলের নারী পিএস মিয়ামি। নজরুল সেসময় খানিকটা শান্ত হয়ে কফি অর্ডার করলে হাত বাঁধা স্নিগ্ধা চৌধুরী আপত্তি জানান। তখন নজরুলের নির্দেশে স্নিগ্ধা চৌধুরীর হাতে কুসুম গরম কফি ঢেলে দেয় মিয়ামি। পরে সেটি পান করতে বাধ্য করা হয় যাতে মেশানো ছিল নেশাজাত দ্রব্য।
কী করে পালালেন স্নিগ্ধা চৌধুরী? তিনি জানান, এক পর্যায়ে নজরুল হয়তো বুঝতে পারেন সে প্রকৃত জেবা তাকিয়া নন। তখন খুলে দেওয়া হয় হাত-পায়ের বাঁধন। তখন ফিঙ্গার প্রিন্ট দেওয়া দরজা খোলা পেয়ে দ্রুত দরজা টপকে নজরুলের রুম থেকে বেরিয়ে সামনের বারান্দার দিকে দৌঁড় দেন তিনি। তারপর সেই বারান্দা থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ে পৌঁছে যান ৩০০ ফিট রোডে। সেখানে পার্শ্ব রাস্তায় চলাচলকারী একটি চলন্ত অটো থামিয়ে সেটাতে উঠে বসেন। এভাবেই প্রাণে রক্ষা পান বলে জানিয়েছেন স্নিগ্ধা চৌধুরী। দুদিন আগের এই বর্বরতার হাত থেকে বেঁচে ফেরা স্নিগ্ধা চৌধুরীর পুরো শরীর জুড়ে আঘাতের চিহ্ন। ঘরে পৌঁছেই সে অচেতন হয়ে পড়ে বলে দাবি তার পরিবারের সদস্যদের।
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত আশিয়ান গ্রুপের মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানায়, এ সকল অভিযোগ মিথ্যা। পরবর্তীতে স্নিগ্ধা চৌধুরীর লোকেশন ট্র্যাকিং এর কথা বলা হলে তিনি বলেন, আমি তাকে ৪ বছর আগে চিনতাম। তখন তাকে বলা হয় আপনি তো তাকে জেবা তাকিয়া ভেবে মেরেছেন? সে তো জেবা তাকিয়া না, তখন সে আগামীকাল সকালে দেখা করার কথা বলে লাইন কেটে দেন।
এ ঘটনায় মডেল ও অভিনেত্রী স্নিগ্ধা চৌধুরী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে রোববার (২৬ জুলাই) রাতে খিলক্ষেত থানায় মামলা দায়ের করেছেন।
