✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
চলতি বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডার অ্যান কারসন (Anne Carson)। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় বিকাল প্রায় ৫টার দিকে এ নোবেলজয়ীর নাম ঘোষণা করে সুইডিশ অ্যাকাডেমি।
গত বছর এই পুরস্কার পেয়েছিলেন হাঙ্গেরিয়ান লেখক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই।
সমসাময়িক সাহিত্যে প্রাচীন ঐতিহ্যকে নতুন করে ফুটিয়ে তোলা এবং তার উদ্ভাবনী ও বৈচিত্র্যময় লেখার আধুনিক সাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করায় তাকে এ বছর নোবেল দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সুইডিশ অ্যাকাডেমি।
অ্যান কারসন ১৯৫০ সালে কানাডার টরেন্টোতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮১ সালে তিনি ক্লাসিকসের ওপর তার ডক্টরিয়াল থিসিস ‘ওদি এত আমো এরগো সাম’ প্রকাশ করেন এবং নিজের পুরো ক্যারিয়ারজুড়ে কবিতা লেখা, অনুবাদ করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন।
চার দশকের বেশি সময় ধরে সাহিত্যের চেনা ছক ভেঙে নিজের মতো করে লিখে চলেছেন এই কানাডীয় লেখক। ২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারও উঠেছে তাঁর হাতে।
কারসনের বিশেষত্ব কেবল তাঁর লেখার ধরনে নয়। তাঁর লেখা পড়লে মনে হয়, চিন্তা করাটাও একটা সাহিত্যিক কাজ হতে পারে। গবেষণা আর সৃজনশীল লেখা যে আলাদা দুটো জগৎ নয়, বরং পাশাপাশি হাঁটতে পারে, সেটাই তিনি বারবার দেখিয়েছেন।
তাঁর লেখায় তথ্য আছে, আবার কল্পনাও আছে। আছে ইতিহাস, আছে কবিতা, আছে ব্যক্তিগত অনুভূতি। সব মিলিয়ে তাঁর বই যেন একই সঙ্গে সাহিত্য ও শিল্পের সমাবেশ।
প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য কারসনের লেখার বড় একটি অংশজুড়ে আছে। তবে পুরোনো লেখকদের তিনি কেবল গবেষণার বিষয় হিসেবে দেখেন না। বরং তাঁদের জীবনকে জানার চেষ্টা করেন।
স্যাফো, সিমোনিদিস, সফোক্লিস কিংবা ইউরিপিদিস, হাজার হাজার বছর আগের এসব লেখকের কথা তিনি আজকের মানুষের জীবন ও অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন।
প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, শোক, একাকিত্ব, বিচ্ছেদ কিংবা মৃত্যু, মানুষের এসব অনুভূতি তো আর পুরোনো হয় না। তাই প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের শব্দও কারসনের লেখায় নতুন করে কথা বলেছে।
তাঁর কাছে প্রাচীন সাহিত্য কোনো জাদুঘরে তুলে রাখা পুরোনো জিনিস নয়। বরং এমন এক জগৎ, যেখান থেকে আজও নতুন নতুন অর্থ বের করা যায়।
কারসনের লেখায় একটি বিষয় বারবার ফিরে আসে, দূরত্ব। দুজন মানুষের মধ্যে দূরত্ব, এক ভাষা থেকে আরেক ভাষার দূরত্ব, জীবিত ও মৃতের দূরত্ব, কিংবা যা জানা যায়, আর যা কখনোই পুরোপুরি জানা সম্ভব নয়, এসব নিয়েই তিনি ভাবেন।
তাঁর কাছে ভালোবাসা মানেই কাউকে পাওয়া নয়। বরং কখনো কখনো না-পাওয়াটাও ভালোবাসার বড় অংশ। মানুষের জীবনের যে শূন্যতাগুলো থাকে, আমরা সাধারণত সেগুলোকে এড়িয়ে যাই, কারসন সেখানেই কলম ধরেছেন। এই কারণেই তাঁর লেখায় না পাওয়া, নীরবতা ও শূন্যতার এত গুরুত্ব।
খণ্ডিত লেখা, কোলাজ, হঠাৎ থেমে যাওয়া; এসব তাঁর কাছে নিছক স্টাইল নয়। এগুলোর মাধ্যমে তিনি স্মৃতি, ভালোবাসা, হারানো কিংবা আকাঙ্ক্ষার মতো জটিল বিষয়কে তুলে ধরতে চান।
ইরোস দ্য বিটারসুইট (১৯৮৬), অটোবায়োগ্রাফি অব রেড (১৯৯৮), দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড (২০০১), নক্স (২০১০) ও ফ্লোট (২০১৬); এসব বইয়ে তিনি বারবার দেখিয়েছেন, কবিতা বা বই দেখতে ঠিক কেমন হতে হবে, তার কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নেই।
তাঁর কাছে লেখার ধরন কেবল সাজসজ্জা নয়। কী বলা হচ্ছে, আর কীভাবে বলা হচ্ছে, দুটোই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
কারসনের লেখায় একদিকে আছে বুদ্ধিবৃত্তিক দোলাচাল, অন্যদিকে আছে আবেগের গভীরতা। তিনি কঠিন বিষয় নিয়ে লেখেন, কিন্তু কেবল জ্ঞান বিতরণের জন্য নয়। বরং পাঠককে ভাবানোর জন্য, ভাবনার জগতে নেওয়ার জন্য। তাঁর লেখা কখনো মজার, কখনো বিষণ্ন, কখনো একটু আবেগে ভাসানো।
তরুণ লেখক ও গবেষকদের ওপরও তাঁর প্রভাব পড়েছে। অনেকেই এখন সাহিত্য সমালোচনা, অনুবাদ, কবিতা ও সৃজনশীল লেখার সীমানা আলাদা করে দেখছেন না।
কারসনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই, সাহিত্যে সব প্রশ্নের উত্তর থাকতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। বরং কখনো কখনো ভালো সাহিত্য এমন প্রশ্নই তৈরি করে, যার উত্তর খুঁজতে পাঠককে বই বন্ধ করার পরও ভাবতে হয়।
সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার এমন লেখকদেরই স্বীকৃতি দেয়, যাঁরা সাহিত্যের সম্ভাবনাকে একটু হলেও বড় করে দেন। অ্যান কারসন সেই কাজটি করেছেন নিজের মতো করে।
কবিতা ও গবেষণা, প্রাচীন ও আধুনিক সময়, চিন্তা ও অনুভূতি, সবকিছুর মাঝখানে তিনি তৈরি করেছেন নিজের এক অদ্ভুত সাহিত্য ভুবন। সেখানে ভাষা কেবল লেখার মাধ্যম নয়; ভাষা নিজেই হয়ে ওঠে ভাবনার খোরাক।
সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা শুরুর পর এ পর্যন্ত এই পুরস্কার পেয়েছেন ১২৩ জন। এর মধ্যে নারী সাহিত্যিক ১৯ জন।
শুক্রবার শান্তিতে পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা হবে। অর্থনীতিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হবে ১৩ অক্টোবর।
পুরস্কারের অংশ হিসেবে একটি করে ডিপ্লোমা, স্বর্ণপদক এবং প্রায় ১২ লাখ ডলারের চেক দেওয়া হয়। কোনো বিভাগে একাধিক বিজয়ী থাকলে পুরস্কারের অর্থ ভাগাভাগি করে নেন।
শুরুতে নোবেল বিজয়ীদের প্রায় দেড় লাখ ক্রোনা দেওয়া হতো। বাড়তে বাড়তে ১৯৮১ সালে তা ১০ লাখ ক্রোনা হয়। এরপর পুরস্কারের আর্থিক মূল্য দ্রুত বাড়ানো হয়। ২০০১ সালে প্রথমবারের মতো এর পরিমাণ ১ কোটি ক্রোনা হয়।
সর্বশেষ এ বছরের জানুয়ারি মাসে বাড়ানো হয় নোবেল পুরস্কারের আর্থিক সম্মানী। এ বছরের নোবেল পুরস্কার বিজয়ীরা মোট ১ কোটি ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা (৯ লাখ ৮৬ হাজার ডলার) পাবেন, যা আগের চেয়ে ১০ লাখ ক্রোনা বেশি। নোবেল ফাউন্ডেশনের তহবিলের উন্নতি হওয়ায় এ বছর পুরস্কারের আর্থিক সম্মানী বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ফাউন্ডেশনের তহবিলে টান পড়ায় ২০১২ সালে পুরস্কারের অর্থমূল্য এক কোটি ক্রোনা থেকে কমিয়ে ৯০ লাখ করা হয়। এরপর ২০১৭ সালে তা বাড়িয়ে ৯০ লাখ এবং ২০২০ সালে ফের এক কোটিতে উন্নীত করা হয়।
গত এক দশকে ইউরোর বিপরীতে প্রায় ৩০ শতাংশ দর হারিয়েছে সুইডিশ ক্রোনা। ফলে পুরস্কারের অর্থমূল্য ১০ লাখ ক্রোনা বাড়ানো হলেও সুইডেনের বাইরে তা ততটা বাড়বে না।
২০১৩ সালে আর্থিক সম্মানী কমিয়ে ৮০ লাখ ক্রোনা করা হয়। তখনো যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রায় এই পুরস্কারের পরিমাণ দাঁড়াত ১২ লাখ ডলার। সেটা বেড়ে ১ কোটি ১০ লাখ ক্রোনা হলেও বিনিময় হারের খেলায় ২০২৪ সালে তার পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ লাখ ডলারের কম। মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় নিলে নোবেল পুরস্কারের আর্থিক মূল্যমান খুব একটা বাড়েনি।
বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ক্রোনার মূল্যমান দাঁড়ায় সাড়ে ১২ কোটি টাকার বেশি।
