অজ্ঞাত নম্বর থেকে অপ্রতিমের বাবা-মাকে হুমকি

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডের কয়েক সপ্তাহ পার না হতেই অজ্ঞাত নম্বর থেকে একের পর এক ফোন করে অকথ্য ভাষায় গালাগাল, বিভিন্ন হুমকি ও অশোভন আচরণের অভিযোগ উঠেছে। এতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন অপ্রতিমের বাবা-মা।

এ ঘটনায় শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাতে অপ্রতিমের বাবা কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ও অপ্রতিম হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রাজিব আহমেদ।

তিনি বলেন, সাইবার বুলিং এবং বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন করে অশোভন আচরণের অভিযোগে অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার থানায় একটি সাধারণ ডায়রি করেছেন। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

এসব ঘটনায় নিরাপত্তা শঙ্কায় শুক্রবার থেকে মোবাইল নম্বর বন্ধ রেখেছেন অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম।

অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, প্রথমে বিভিন্ন ফেসবুক পেজ থেকে অপ্রতিম ও আমাদের জড়িয়ে নানা ধরনের অপপ্রচার চালানো হয়েছে। একইসঙ্গে আমাদের দুইজনের মোবাইল নম্বরে অজ্ঞাত কয়েকটি নম্বর থেকে ফোন করে কে বা কারা গালাগাল, হুমকি ও অশোভন আচরণ করছে। এতে আমরা দুইজনই চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। এ ঘটনায় শুক্রবার কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় একটি সাধারণ ডায়রি করেছি।

অপ্রতিমের পরিবারসূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার রাতে একটি নম্বর থেকে অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়াকে কল দেওয়া হয়। কল রিসিভ করার পর অজ্ঞাত ব্যক্তির পরিচয় জানতে চান তিনি। পরিচয় দেওয়ার পর অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করেন ওই ব্যক্তি। পরবর্তীতে কল কেটে দেওয়ার পর অন্য আরও কয়েকটি নম্বর থেকে একাধিকবার কল দিতে থাকেন ওই ব্যক্তি। পরে নম্বরগুলো ব্লক করে দেওয়া হয়।

ড. নাহিদা বেগম বলেন, আমি স্থানীয় কোটবাড়ী সালমানপুরের মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলাম। এতে তারা আমার পরিবারকে টার্গেট করে থাকতে পারে। তাছাড়া ঘাতকরা কিশোর হিসাবে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে এসে আবারও খুনখারাবিতে জড়িয়ে পড়তে পারে। আমি আশঙ্কা করছি ভবিষ্যতে তারা আমাকে এবং আমার স্বামীকে পরবর্তী টার্গেটে পরিণত করতে পারে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে ড. নাহিদা বেগম বলেন, সন্তানকে চার দেওয়ালের বন্দিদশায় নয় বরং পৃথিবীর আলো-বাতাসে একজন আত্মনির্ভরশীল মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেই মুক্তমনের বিকাশই যে কাল হয়ে দাঁড়াবে, তা কখনো ভাবতে পারিনি। অপ্রতিমকে প্রচলিত ধারণার চিকিৎসক কিংবা প্রকৌশলী বানানোর পরিকল্পনাও ছিল না। আমার চাওয়া ছিল ছেলে যেন দেশ-বিদেশ ঘুরে বিশ্বকে নিজের মতো করে উপলব্ধি করতে শেখে এবং নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে পারে। তাকে ফটোগ্রাফি, সাইক্লিং ও সাঁতার শেখানো হয়েছিল, দেওয়া হয়েছিল কারাতের প্রশিক্ষণও। এমনকি এক বছর নাচও শিখেছিল সে, যার স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে ঘরে এখনো তার ব্যবহৃত হারমোনিয়ামটি রয়েছে।

এই শিক্ষিকা আরও বলেন, আমি চেয়েছিলাম আমার ছেলে প্রত্যেকটা কাজে সেলফ ডিপেন্ডেন্ট হবে। সে মানুষকে খুব দ্রুত আপন করে নিতে পারত। বয়সের ব্যবধান বা সিনিয়র-জুনিয়র বিচার করত না। সন্তান প্রতিপালন পদ্ধতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা আমার ভুল হতে পারে।’ অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সন্তানকে স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি সে কার সঙ্গে চলাফেরা করছে এবং কোথায় যাচ্ছে, এসব বিষয়েও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।

প্রসঙ্গত, গত ১৮ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) বিকেলে কুমিল্লা কোটবাড়ি এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান সে। শুক্রবার বিকেলে মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে গিয়ে আর বাসায় ফেরেনি। পরে তার বাবা ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি নিখোঁজের জিডি করেন। নিখোঁজের পরদিন শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ গেটের পাশে লালমাই পাহাড়ঘেঁষা সানন্দা গ্রামের ঝোপ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। 

অপ্রতিম কুমিল্লা কোটবাড়ি এলাকায় বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী। অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোনটি নেওয়ার জন্যই তাকে হত্যা করা হয়েছে। কিলিং মিশনে অংশ নেন চারজন। সবাইকে শনাক্ত করে আটক করেছে পুলিশ। পরে অপ্রতিমের বাবার দায়ের করা মামলায় তাদের গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে তোলা হলে সিয়াম ছাড়া বাকী তিনজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *