আ.লীগের ‘নাশকতা ঠেকাতে’ ৬ জেলায় সেনা মোতায়েন

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেন্দ্র করে নাশকতা রোধে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ঢাকাসহ ছয় জেলায় সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা, গাজীপুর , নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ ও চট্টগ্রাম জেলায় সেনা মোতায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং অন্যান্য সংস্থাকে সহযোগিতা করতে এক সপ্তাহের জন্য ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ মোতাবেক সেনা মোতায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব কে এম ইয়াসির আরাফাত সোমবার সেনাবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার বরাবর লেখা এক চিঠিতে ছয় জেলায় সেনা মোতায়নের অনুরোধ জানান।

সেখানে বলা হয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন সংগঠন কর্তৃক দেশের বিভিন্ন স্থানে বেআইনি মিছিল, শোডাউন ও অন্যান্য কর্মসূচির মাধ্যমে নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন জেলার সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার পাশাপাশি জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।

এমতাবস্থায়, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকা, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকা, গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকা, নারায়ণগঞ্জ জেলা, গোপালগঞ্জ জেলা এবং ফরিদপুর জেলার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং জনগণের জানমালের সুরক্ষার লক্ষ্যে ২২ জুন হতে ৩০ জুন পর্যন্ত ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনাসদস্য মোতায়েনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

এর আগে, রাজধানীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে সামনে রেখে ১৮ হাজার পুলিশ মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। ২৩ জুন সম্ভাব্য যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুরো ঢাকাজুড়ে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ডিএমপি জানিয়েছে, নিরাপত্তা নিশ্চিতে ১৮ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মাঠে দায়িত্ব পালন করবেন। শুধু মাঠপর্যায়ের ফোর্স নয়, ডিএমপি কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সরেজমিনে নিরাপত্তা কার্যক্রম তদারকি করবেন।

রোববার (২১ জুন) ডিএমপি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে রাজধানীর ২০০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিশেষ পিকেট ও চেকপোস্ট ডিউটি থাকবে। একই সঙ্গে মহানগরের প্রবেশমুখগুলোতে কড়া নজরদারি ও তল্লাশি জোরদার করা হবে, যাতে কোনো বহিরাগত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে।

যে কোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় মহানগরের বিভিন্ন পয়েন্টে ১৫টি কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) প্রস্তুত রাখা হবে। এ ছাড়া ঢাকার চারটি প্রধান কন্ট্রোল রুমে পর্যাপ্ত রিজার্ভ ফোর্স স্ট্যান্ডবাই থাকবে, যাতে প্রয়োজনে তাৎক্ষণিকভাবে মোতায়েন করা যায়।

নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে নিয়মিত পুলিশের পাশাপাশি মাঠে থাকবে ডিএমপির বিশেষায়িত ইউনিটগুলোও। গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে। পাশাপাশি সম্ভাব্য নাশকতা বা ষড়যন্ত্র ঠেকাতে সাদা পোশাকে স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) ও ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্স ডিভিশন (আইএডি) গোয়েন্দা নজরদারি চালাবে।

গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ৬ জেলায় সেনা মোতায়েন

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি, সরকার সবসময় তৎপর আছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অপতৎপরতা লক্ষ্য করায় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ৬ জেলায় সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

সোমবার (২২ জুন) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অফিস কক্ষের সামনে এসব কথা বলেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আগের তুলনায় বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো আছে। সভা-সমাবেশ করা বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক অধিকার, এতে গণতন্ত্র বিকশিত হচ্ছে।

মন্ত্রী বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি; কিন্তু আমাদের সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ মাফিয়া বাহিনী আওয়ামী লীগের কিছু অপতৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন জেলায় আমরা দেখেছি তারা মিছিল-মিটিং করার মতো কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এতে মনে হয়েছে, তারা অস্থিরতা তৈরির পাঁয়তারা করলেও করতে পারে।

তিনি বলেন, এজন্য আমাদের সব বাহিনীকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছি, যা সবসময় থাকে। তার বাইরে আমরা আজ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত আমাদের সেনা সদস্যদের এনে আইন অনুসারে বেসামরিক ক্ষমতা দিয়েছি, যাতে যেকোনো রকম অপতৎপরতার সুরাহা করা যায়; এ জন্যই এটা করা হয়েছে।

তবে সেনা মোতায়েনে পুলিশ বাহিনীর ওপর আস্থাহীনতার কোনো বিষয় নেই বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা সবসময় প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কখনো বিজিবি বা কখনো সেনাবাহিনীকে নিয়ে আসি। প্রায় দেড় বছর মাঠে থাকার পর গত ১৫ জুন সেনাবাহিনীকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা নির্বাচিত সরকার আসার পর যথাশিগগির সম্ভব তাদের মাঠ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের পরিস্থিতির কোনো সম্পর্ক নেই। যেসব জেলায় অপতৎপরতার চেষ্টা করা হয়েছে, সেসব জেলায় সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে কোনো কোনো মহল অপতৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘সেজন্য সতর্ক থাকার অংশ হিসেবে আমরা সেনা মোতায়েন করেছি।’

নারায়ণগঞ্জের এক এমপির ছেলেকে গ্রেফতার করার পর আবার ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাকে কেন গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, এমন প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনের চোখে সবাই সমান। কোনো এমপির ছেলের বিশেষাধিকার নেই। তার বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে বিভিন্ন অভিযোগ ছিল। এ কারণে জিজ্ঞাসাবাদ করে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সঙ্গে বৈঠক হয়েছে; সেখানে কি এক হিন্দু নারীর আলাদা প্রদেশ চাওয়া নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা নিয়ে তাদের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। সেখানে ওই নারীর প্রসঙ্গও এসেছে। এটা তার স্লিপ অব টাং (মুখের ভুল) হতে পারে। তাকে যেন সেই বার্তাটি দেওয়া হয়। বক্তৃতা দেওয়ার সময় অতিউৎসাহী হয়ে অনেকে অনেক কথা বলে ফেলে।’

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে তল্লাশি, আটক ১০

কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে (২৩ জুন) কেন্দ্র করে রাজধানীজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা ও নজরদারি জোরদার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সড়কে ২০০ চেকপোস্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত ১৮ হাজার সদস্য সন্দেহভাজনদের তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। এতে কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।

গতকাল রোববার (২১ জুন) রাত ১১টা থেকে সোমবার (২২ জুন) দুপুর পর্যন্ত দুটি বাস, একটি মাইক্রোবাসসহ সন্দেহভাজন ১০ জনকে আটক করা হয়েছে।

ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১৮ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। রাজধানীর দুই শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্পটে বিশেষ তল্লাশিচৌকি বা চেকপোস্ট স্থাপন করে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। গণপরিবহন, মোটরসাইকেল ও সন্দেহভাজন পথচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

নিয়মিত পুলিশের পাশাপাশি মাঠে সক্রিয় রয়েছে গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এবং কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। এ ছাড়া সাদাপোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি চালাচ্ছে স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি)। যেকোনো ধরনের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজধানীর বিভিন্ন স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্টে ১৫টি কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) এবং চারটি প্রধান কন্ট্রোল রুমে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

আজ সকাল থেকে রাজধানীর, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, ধোলাইপাড়, গাবতলী, উত্তরাসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশমুখগুলোয় পুলিশের বিশেষ চেকপোস্ট দেখা গেছে। এ ছাড়া ধানমন্ডি, গুলশান, কাকরাইল, বিজয় সরণি ছাড়াও বেশ কয়েকটি স্থানে পুলিশকে সতর্কাবস্থায় চেকপোস্ট বসিয়ে মোটরসাইকেল ও বিভিন্ন ব্যক্তিগত গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি করতে দেখা গেছে।

গতকাল রোববার রাত ১১টা থেকে শুরু হওয়া পুলিশের এই বিশেষ সতর্কতামূলক কার্যক্রমে সোমবার দুপুর ২টা পর্যন্ত দুটি বাস, একটি মাইক্রোবাসসহ সন্দেহভাজন ১০ জনকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের ধানমন্ডি থানায় রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. নিয়াজ আহমেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ যাতে তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে কোনো ধরনের নাশকতা ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে, এ জন্য ডিএমপি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। এখন পর্যন্ত দুটি বাস, একটি মাইক্রোবাসসহ সন্দেহভাজন ১০ জনকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের ধানমন্ডি থানা পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সংগঠনগুলোর (যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ অন্যান্য সংগঠন) শীর্ষ নেতারা পলাতক, কারাবন্দি কিংবা অনেকে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।

২০২৫ সালের ১২ মে এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সব রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। চলতি বছরের এপ্রিলে সংসদে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী পাস হলেও আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ আদেশ বহাল রাখা হয়।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *